অন্ধকার ঐ চতুষ্কোণের গহ্বরে নড়াচড়ার আভাস এবার অত্যন্ত স্পষ্ট। কালো দস্তানা পরা একটা হাত আস্তে আস্তে এসে বন্দুকের তলায় থামলো।
উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল ক্যাপ্টেন সেন্ডার, ঐ যে! দেওয়ালের দিকে ছুটে আসছে। এইবার লাফিয়ে পড়ল বলে।
ঠিক সেই মুহূর্তে স্নাইপারস্কোপের লেন্সের মধ্যে দিয়ে ট্রিগার -এর মুখটা বন্ড দেখতে পেল–সেই সুকুমার ডৌল, সেই সোনালি চুলের ঢেউ। সেই পরিচিত মুখ। গুলি ছুড়ল বাঁচবে না। চট করে স্কু ঘোরাতে লাগল বন্ড। আর সাব মেশিনগানের নলের মুখ থেকে হলদে একটা আলোর শিখরে ঝলক উঠতেই বন্দুকের ঘোড়া টিপে দিল।
তিনশ গজ দূরে বুলেটটা গিয়ে পড়ল। মেয়েটার বাঁ হাতে হয়ত লেগে থাকতে পারে।
ক্যাপ্টেন সেডার তখন চিৎকার করে উঠেছেন, পার হয়ে গেছে!
তৎক্ষণাৎ বন্ডের কঠিন স্বর শোনা গেল, হেঁট হও, নিচু হও। বলতে বলতে এক ঝটকায় বিছানা থেকে গড়িয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল। ওদিকে একটা জানলা থেকে একটা তীব্র সার্চলাইটের চোখ দপ করে জ্বলে উঠে। রাস্তার ওপর আলো বুলিয়ে ওদের বাড়ির দেওয়াল বেয়ে ওদের ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে তারপর বন্দুকের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে জানলার মধ্যে দিয়ে একঝাক বুলেট পর্দাটাকে ঝাঁঝরা করে দিয়ে দেওয়ালের গায়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
সেই শব্দের মধ্যেও বন্ডের কানে এল ওপেল গাড়িটা প্রাণপনে ছুটে চলে যাচ্ছে রাস্তা ধরে, তার পেছনে অর্কেস্ট্রার মৃদু গুঞ্জন। দুটো শব্দের উদ্দেশ্য একই। ট্রিগার -এর গুলির আওয়াজ ঢাকা দেবার ফন্দি।
অর্কেস্ট্রার পুরো দলটাই KGB-র মেয়ে। বন্ডের গুলিতে মেয়েটি কি চোট পেয়েছে। যদি অর্কেস্ট্রার দলের সঙ্গে ও বেরিয়ে গিয়ে থাকে তবে ওকে আর দেখতে পাবার আশা নেই। ওদের জানলাগুলো এখন মৃত্যু ফাঁদ। বন্ডের চিন্তাটাকে মূর্ত করে তোলার জন্যই যেন সেই মুহূর্তে একটা বুলেট এসে লাগল উল্টেপড়া উইঞ্চেস্টারের গায়ে। ঝাঁঝরা হয়ে। যাওয়া দরজার মধ্যে দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে দু জনে রান্নাঘরে ঢুকল। ক্যাপ্টেন সেন্ডারের নিষ্প্রভ চোখ দুটোতে বিকারের রুগির মত অস্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য। তার গলায় কিছুটা নালিশ, কিছুটা অস্বস্তি। কেন যে লোকটাকে খতম করলে না, স্টেশনের বন কর্তা তার একটা লিখিত কৈফিয়ৎ চান কিন্তু। একেবারে শেষ মুহূর্তে যে তুমি তাগটা সরিয়ে নিয়েছিলে সেটা আমি লক্ষ্য করেছি। ট্রিগার -কে একটা গুলি ছোড়বার সময়ও দিয়েছ। 272-র কপাল জোর বলতে হবে, ঠিক সেই সময় ছুটতে শুরু করেছে।
জেমস বন্ড সোজা ক্যাপ্টেন সেন্ডারের দিকে তাকাল।
ট্রিগার স্ত্রীলোক। তাতে কি? KGB-তে অজস্র মেয়ে গুপ্তচর আছে, মেয়ে বন্দুকবাজও আছে। এতে আশ্চর্য হবার কি হল? কি রকম দেখতে বলত?
সোনালি চুল। অর্কেস্ট্রার দলের চেলোর বাক্স নিয়ে যায় যে মেয়েটি, সেই। চেলোর বাক্সর মধ্যেই হয়ত বন্দুকটা ছিল।
ওহ্! তাই বল। যাকে দেখে হামলে উঠেছিল, সেই মেয়েটি?
ঠিক ধরেছেন।
নিচে একটা গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। দু বার বেল বেজে উঠল, সেন্ডার বললেন, চল যাওয়া যাক। আমাদের জন্য আর্মার্ড কার পাঠিয়ে দিয়েছে। বন্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, রিপোর্টের ব্যাপারে দুঃখিত, কর্তব্য না করে উপায় নেই বোঝ তো। যাই একেবারে মেরে ফেলাই উচিত ছিল তোমার।
বন্ড উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ তার কেমন যেন মনে হল, এই ছোট ঘরটাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না, যেখানে বসে গত তিনটে দিন দূর থেকে একতরফা ভালবেসে গেছে অজানা গুপ্তচরকে। নিজের পেশার সঙ্গে যার বৃত্তির কোন তফাৎ নেই। বড় বেচারি ঐ মেয়েটি, ঐ শয়তানিটা! কি মুস্কিলেই না পড়বে! কাজটা ভণ্ডুল করেছে বলে নিশ্চয় কোর্ট মার্শাল হবে। KGB হয়ত তাড়িয়ে দেবে। অন্তত, প্রাণে বোধ হয় মারবে না, বন্ড যেমন পারেনি। বন্ড বলে উঠল, ঠিক আছে। খুব বেশি যদি হয়, আমার ০০ নম্বরটা না হয় খোয়াব। স্টেশনের বড় কর্তাকে বোল তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। মেয়েটি আর কখনও গুলি ছুঁড়বে না। গুলি ছোড়বার মত মনের জোর আর পাবে না তো বটেই। বাঁ হাতটা যাবে হয়ত। প্রাণ পাখি ওর ডানা ঝাপটাচ্ছে এখন। আমার হিসেবে ওইটাই যথেষ্ট। চল যাওয়া যাক।
অন হার ম্যাজেস্টিস্ সিক্রেট সার্ভিস (পার্ট ১)
অন হার ম্যাজেস্টিস্ সিক্রেট সার্ভিস — জেমস বন্ড
সমুদ্রতীর ও কয়েকজন মানুষ
এই সময়টা হল সেপ্টেম্বর মাস। কিন্তু গরম যেন কিছুতেই চলে যেতে চাইছে না।
হোটেলের বিভিন্ন জায়গায় পরিষ্কার লনের স্যলভিয়া, অ্যালিসাম ও লোবেলিয়া ফুলের সাজানো তিন রঙের ঝাড় শোভা পাচ্ছে। ঠিক তার পিছনেই পাঁচ মাইল লম্বা ফাঁকা জায়গা, অসংখ্য পতাকায় উজ্জ্বল ও রঙীন হয়ে উঠেছে। এখানেই উত্তর ফ্রান্সের দীর্ঘতম সমুদ্রতট। দেখা গেল সারিবদ্ধ সৈন্যদলের মতন দাঁড়িয়ে আছে অজস্র তাঁবু। কাছেই অলিম্পিকের মাতান সুইমিংপুলের চারপাশের লাউডস্পীকারগুলি থেকে অ্যাকর্ডিয়ানে শোনা গেল চমৎকার ওয়ালস নাচের সুর। মাঝে মধ্যে আবার বাজনার শব্দকে ছাপিয়ে একজন ঘোষকের উচ্চ কণ্ঠস্বর সবাইকে জানাচ্ছে সাত বছর বয়সের শ্রীমান ফিলিপ বার্নার্ড তার মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কুমারী ইয়োল্যান্ড ল্যফেভর ভিতরে ঢোকার দরজায় ঘড়িটির নিচে তার বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছেন। বা মাদাম ডুফুর্সকে ফোনে কে যেন ডাকছেন মনে হল। সমুদ্রতীর থেকে উঠে এসে ক্রীড়ারত অসংখ্য শিশুর বিভিন্ন স্তরের হাসির আর এক ব্যায়াম শিক্ষকের হুইসলের তীব্র শব্দ।
