তারা সবাই হেসে উঠল, ঠিক বলেছেন ক্যাপ্টেন। বন্ড একান্ত প্রীতির সঙ্গে তাকাল আমেরিকানটির দিকে। আজ পর্যন্ত অনেক অ্যাডভেঞ্চার লিটার তার সঙ্গী হয়েছে। গম্ভীর গলায় বলল, বেঁচে থাক ফেলিকস। এ নিয়ে অনেকবার আমার প্রাণ বাঁচালি। আজ আর একটু হলেই গিয়েছিলাম আর কি। টিলি বোধহয় মারাই গেছে। ট্রেনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল টিলির ছোট্ট দেহটা সেখানে পড়ে আছে। বন্ড পাশে বসল। তার ঘাড়টা এমন অস্বাভাবিক ভাবে বেঁকে গেছে যে আর কিছু দেখবার দরকার হল না। নাড়িটা দেখে নিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। আস্তে করে বলল, বেচারী, পুরুষদেরকে কোনদিন বিশ্বাস করতে পারল না। লিটারের দিকে তাকিয়ে যেন আত্মসমর্থনের জন্যই বলল, জানিস ফেলিক্স, আমার সঙ্গে সঙ্গে এলেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পারতাম আমি।
লীটার ঠিক বুঝল না। বন্ডের বা হাতে হাত রেখে বলল, সে তো ঠিকই। তুই ঠাণ্ডা হ এবার। সৈন্যদের বলল তোমরা দুজন মেয়েটির দেহ অফিসঘরে নিয়ে যাও। ও ব্রায়েন তুমি অ্যামবুলেন্স ডাক। তারপর কমান্ড পোস্টে গিয়ে খবর দাও বল যে কমান্ডার বন্ডকে পাওয়া গেছে। আমি এখনই তাকে নিয়ে আসছি।
বন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল পড়ে থাকা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও পোশাকের পটার দিকে। চোখের ওপর ভেসে উঠল গাড়িতে বসা মাথায় রুমাল বাঁধা উজ্জ্বল গর্বোদ্ধত মেয়েটির ছবি।
তার মাথার অনেক ওপরে একটা হাউইয়ের মত জিনিস পাক খেতে খেতে আকাশে উঠে গেল। অনেক দূর উঠে গিয়ে থামল। পরক্ষণেই আরেকটি সামরিক সংকেতের তীক্ষ্ণ শব্দ। যুদ্ধ বিরতি।
.
শেষ কৌশল
দুটো দিন কেটে গেছে। লিটার বন্ডকে নিয়ে তার স্টুডিল্যাল গাড়িতে চেপে চলেছে এয়ারপোর্টে। প্লেন ছাড়তে এখনো অনেক দেরি। কিন্তু আমেরিকান গাড়ি সম্পর্কে বন্ডের নিচু ধারণা নিয়ে ব্যঙ্গ করতে লিটারের বড় ভাল লাগে। আপাতত সে ডানহাতের হুকটা দিয়ে গাড়ি সেকেন্ড গিয়ারে নিয়ে এল, তারপর এক বিশাল রেফ্রিজারেটর ট্রাক ও একটা ওল্ডসমোবাইল গাড়ির মাঝখানের সামান্য ফাঁকের ভেতর দিয়ে তীরবেগে গলিয়ে দিল কালো গাড়িটাকে।
গতিবেগের চোটে বন্ডের দেহ জোর ঝটকা খেল, দাঁতে দাঁত লেগে গেল। শেষে যখন লিটারের কায়দা মারা শেষ হল, অন্য গাড়িগুলোকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেল, বন্ড নরম গলায় বলল, একদিন এইসব কায়দা করতে গিয়ে এমন পুলিশী ঝামেলায় পড়বি যে তোর পিংকারটন গোয়েন্দা এজেন্সীও তোকে উদ্ধার করতে পারবে না। তুই বরং একটা রোলস রয়েস সিলভার গোস্ট কেন। ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইলের বেশি ছুটতে পারে না, দরকার হলে থামে, এমনকি পিছনদিকেও যায়। গোল্ডফিংগারের গাড়িটা তো নিলামে উঠবে শুনছি।…ভাল কথা গোল্ডফিংগারের কি হল? এখনো জালে আটকায়নি?
লীটার গম্ভীর গলায় বলল, সত্যি বলতে কি, আমরা এ নিয়ে একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছি। কাগজপত্রের এ জন্য খুব সমালোচনা হচ্ছে আমাদের নিয়ে। প্রথমত তোর ব্যাপারে যে আগাগোড়া চেপে যাওয়া হচ্ছে তা সাংবাদিকদের। অপছন্দ। আমরা তো বলতে পারি না যে এটা আমাদের ব্যাপার নয়, এসব M নামক এক বুড়োর খেয়াল। এদিকে আবার গোল্ডফিংগারও ধরা পড়েনি। তোকে বলছি জেমস্ একটা সূত্র পাওয়া যায়নি– কাঁচুমাচু মুখ করে বলল। লিটার।
ডিজেল গাড়িটা ঠিকই ধরা পড়েছিল কিন্তু তাতে কেউ ছিল না। গোল্ডফিংগার সেটাকে তিরিশ মাইল বেগে চালিয়ে দিয়ে রাস্তার মাঝখানে কোথাও নেমে গেছে। সঙ্গে কোরিয়ান চাকর, পুসি গ্যালোর ও চারজন দস্যু সম্রাটও আছে। কারণ তাদেরও আর দেখা যাচ্ছে না। ওর ট্রাকগুলো পেয়েছি আমরা, এলিজাবেথভিলের পাশে রাজপথে। তাতে একজনও ড্রাইভার ছিল না। অতএব বোঝা যাচ্ছে বাঘা বাঘা লোকসুদ্ধ গোল্ডফিংগার কোথাও না কোথাও লুকিয়েছে। নরফোকের সেই রাশিয়ান জাহাজটাতেও কেউ যায়নি। সাদা পোশাকের অনেক লোক ছিল জাহাজটার ওপর নজর রাখবার জন্য। তারা জানিয়েছে কোন অচেনা লোককে না তুলেই জাহাজ যথাসময় বন্দর ছেড়ে গেছে। নদীর ধারে সেই গুদামঘরেও নেই। নিউইয়র্কের বিমানবন্দর অথবা মেক্সিকো ও কানাডার সীমান্তেও ওদের কাউকে দেখা যায়নি।
আমার নিজের ধারণা জেড় মিডনাইট কোন রকমে দলটিকে কিউবা পাচার করে দিয়েছে। গোটা কয়েক ট্রাক নিয়ে জোরে ছুটলে অভিযানের পর দিন ফ্লোরিডার উপকূলে যাওয়া অসম্ভব নয়। আর ওখানে মিডনাইটের প্রবল প্রতিপত্তি। উপকূল রক্ষী বাহিনী ও বিমানবাহিনী ঐ অঞ্চলের উপর কড়া নজর রাখছে কিন্তু দিনের বেলা লুকিয়ে থেকে রাতের অন্ধকারে কিউবা পাড়ি দেওয়া যায়। এ নিয়ে সকলেই বিস্মিত আর প্রেসিডেন্ট সাহেব তো রেগে লাল।
আগের দিনটা বন্ডের কেটেছে আমেরিকার সর্বোচ্চ মহলের অভ্যর্থনা ও অভিনন্দনের মধ্যে দিয়ে। মুদ্রাবিভাগের বক্তৃতা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হয়েছে, সামরিক বাহিনীর বড়কর্তাদের সঙ্গে মহ্যাহ্ন ভোজ সারতে হয়েছে পেন্টাগনে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিব্রত মেজাজে আধঘণ্টা কাটাতে হয়েছে আর বাকি দিনটা কেটে গেছে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে। সব শেষে দূতাবাস থেকে ফোনে M-এর সঙ্গে কথা। গোন্ডফিংগার প্রসঙ্গে ইউরোপে যেসব প্রতিক্রিয়া হয়েছে M বন্ডকে তার কথা বিস্তৃত জানিয়েছেন।
বন্ড ঠিকই আন্দাজ করেছিল। গোল্ডফিংগারের টেলিগ্রাম ইউনিভার্সাল এক্সপোর্টে পৌঁছতেই সবাই বিপদ বুঝতে পেরে গেছিল। রেকুলভার ও কপেটের কারখানা তল্লাসি করে সোনা স্মাগলিং-এর ব্যাপারে আরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। মক্কা এয়ার লাইন্সের প্লেনটি সম্পর্কে ভারত সরকারকে সতর্ক করে দেওয়া হলে তারা উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছেন। সুইস পুলিশবাহিনী চটপট বন্ডের গাড়ি খুঁজে বার করে নিউইয়র্কের আইডাল ওয়াইল্ড বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাও বার করতে দেরি হয়নি। কিন্তু এর পর থেকে আর কোন হদিশ পাওয়া যাচ্ছিল না।
