চোখের কোন দিয়ে বন্ড দেখল কি যেন একটা উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। কালো হাউইয়ের মত একটা জিনিস।
অনেক উঁচুতে গিয়ে এক মুহূর্ত থামল, তারপর ভেসে এল সামরিক আক্রমণ সংকেতের কান ফাটান আওয়াজ।
বন্ডের বুক আনন্দে নেচে উঠল। এক ঝলক তাকাতেই দেখল মৃত সৈন্যরা দলে দলে উঠে দাঁড়াচ্ছে। ধাক্কা লাগা সাঁজোয়া গাড়ি দুটোর মেশিনগান গেটের দিকে ঘুরে স্থির হয়ে গেল। কোথায় যেন লাউড স্পীকারে সামরিক আদেশ। ভেসে এল, যে যেখানে আছ দাঁড়িয়ে পড়। হাতিয়ার ফেলে দাও। কিন্তু পিছনে এক দস্যু বাহিনী শুধু শুধু গুলি বৃষ্টি করাতে শুরু হয়ে গেল গুলি গোলার ঝড়।
বন্ড মেয়েটার কোমর জাপটে ধরে লাফ দিল দশ ফুট নিচের প্ল্যাটফর্মে। বাঁ হাতের সাহায্যে ঝাঁকুনি সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটাকেও তুলল। দৌড় শুরু করতেই গোল্ডফিংগারের কয়েকটা বুলেট তার বাঁদিকের সিমেন্টের ওপর পড়ে ঠিকরে গেল। বন্ড ভয় পাচ্ছিল অডজবের জন্য। মেয়েটার হাত ধরে ছুটতে ছুটতে পেছনে অডজবের পায়ের আওয়াজ শোনা গেল।
মেয়েটা তার হাত ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছে আর বলছে, না না থাম, আমি পুসির কাছে থাকব, ওখানেই নিরাপদ।
বন্ড চিৎকার করে বলল, চুপ কর। বুদ্ধ কোথাকার। যত জোরে পার এখন দৌড়াও। কিন্তু মেয়েটা সমানে হাত টেনে বন্ডের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ট্রেনের ভোলা কামরার দিকে ছুটল। মনে মনে ভাবল বন্ড, আর উপায় নেই, একটানে কোমর থেকে ছোরা খুলে নিয়ে অডজবের সম্মুখীন হল।
দশ গজ দূরে অডজব একটুও গতি না কমিয়ে মাথার সেই মারাত্মক টুপিটা খুলে লক্ষ্য স্থির করে ছুঁড়ে দিল। নক্ষত্ৰগতিতে ছুটে গিয়ে টুপির কানা আঘাত করল টিলির ঘাড়ে। সঙ্গে সঙ্গে নিঃশব্দে লুটিয়ে পড়ল টিলি, অডজবের সামনে। তাই বন্ডের মাথা লক্ষ্য করে যে লাথিটা উঠেছিল সেটা বন্ডের গায়ে পড়ল না। সেই অবস্থা থেকে সে লাফ দিয়ে উঠে বাঁ হাত দিয়ে ঘাড়ে আঘাত দিতে গেল। মাথা নিচু করে বন্ড পাশের দিকে ছোরা চালাল। অডজবের পাঁজরের কোথাও লাগল বটে, কিন্তু সেই বিশাল উড়ন্ত দেহের ধাক্কায় বন্ডের হাত থেকে ছোরা ছিটকে পড়ল। প্ল্যাটফর্মের ওপর। পরক্ষণেই ছুটে এল অক্ষত দেহ। তার মাথার খুন চেপে গেছে, দু চোখ টকটকে লাল, খোলা ঠোঁটের পাশে লালা গড়াচ্ছে।
স্টেশনের বাইরে গোলাগুলির কান ফাটানি শব্দ ছাপিয়ে এবার ডিজেল ইঞ্জিনের সিটি ভোঁ শোনা গেল। অডজব ক্ষিপ্তভাবে লাফ মারল এবং বন্ডও। বাঁ কাঁধে এক প্রচণ্ড আঘাত এসে লাগল, লুটিয়ে পড়ল বন্ড। এইবার মরণ আঘাত আসবে, ভাবল বন্ড। কোনরকমে উঠে দাঁড়াল কিন্তু আর কোন আঘাত এল না। বন্ড ধোয়াটে চোখে দেখল অডজব। প্ল্যাটফর্ম দিয়ে দৌড়চ্ছে।
সামনে ডিজেলটা চলতে শুরু করেছিল। অডজব পাদানির কাছে পৌঁছে এক লাফ দিল। কয়েক মুহূর্ত হ্যান্ডেল ধরে। ঝুলে কেবিনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। গাড়িটা আরো জোরে ছুটতে শুরু করল।
বন্ডের পিছনে কোয়ার্টার মাস্টারের অফিসের দরজা খুলে গেল। ছুটন্ত পায়ের শব্দ সেই সঙ্গে একটা চিৎকার। স্যান্টিয়াগো! কি কাণ্ড, এত সেই মেকিসকো বিজয়ী সেনাপতি কোর্টেজের বিখ্যাত রনহুঙ্কার, যা ফিলিক্স লিটার ঠাট্টা করে বন্ডকে উপহার দিয়েছিল।
বন্ড ঘুরে দাঁড়াল, হা ফিলিক্স লিটারই ছুটে আসছে যুদ্ধের সাজ গায়ে। তার পেছনে আরো ডজন খানেক খাকি পোশাকের লোক। লিটারের কাটা ডানহাতে যে ইস্পাতের হুক লাগান থাকে তাতে একটা বাসুকা (ছোট একরকম। কামান) ঝুলছে। বন্ড দৌড়ে গিয়ে বলল, আমার শিকারে হাত দিবি না হতভাগা। ওটা আমায় দে। লিটারের হাত থেকে নিয়ে প্ল্যাটফর্মের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল পা ছড়িয়ে বন্ড। ট্রেনটা দুশো গজ এগিয়ে ব্রিজের ওপর পৌঁছে গেছে। আশেপাশের লোকদের সাবধান করে দেবার জন্য হাঁক মারল, সরে যাও সবাই। তারপর লক্ষ্য স্থির করে গোলা ছুঁড়ল। বাসুকা কাঁপিয়ে ছুটে গেল দশ পাউন্ড ওজনের আর্মার পিয়ার্সিং রকেট। ছুটন্ত ডিজেলের পিছনের অংশ উড়ে গেল কিন্তু ট্রেনটা ব্রীজ পেরিয়ে চলে গেল।
-লীটার মন্তব্য করল, আনাড়ীর পক্ষে সঠিক হয়নি ছোঁড়াটা। পিছনের ডিজেলেটা বোধহয় খতম হয়ে গেল। কিন্তু এগুলো জোড়া ইঞ্জিনে চলে, অন্যটা দিয়ে ওরা কাজ চালিয়ে দেবে।
বন্ড উঠে দাঁড়াল। লিটারের ধূসর চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর প্রীতিতে হেসে বলল, সব মাটি করেছিস হতভাগা, ট্রেনটার লাইন বন্ধ করে দিসনি কেন?
শোন শালা, এই সব ব্যবস্থাপত্র সম্পর্কে যদি কোন অভিযোগ থাকে তাহলে স্বয়ং আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে গিয়ে জানাতে হবে। তিনি নিজে সবকিছু পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন আর কাজকর্ম তো মন্দ হচ্ছে না। আমাদের মাথার ওপর একটা প্লেন চক্কর দিচ্ছে ওটা অনুসন্ধান কারী প্লেন। ওরাই দুপুরের মধ্যে আমাদের ইঞ্জিনটার হদিশ জানাবে আর শ্রীযুক্ত গোল্ডফিংগারকে খাঁচায় পুরব আমরা। বন্ডের পিঠে আদরের চাপড় মেরে লিটার বলল, তোকে দেখে বড় ভাল লাগছে আমার এবং এই সৈন্যদের ওপর তোকে সাহায্য করবার আদেশ ছিল। আমরা আতিপাতি করে চারদিকে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর দু দিক থেকে লোকেরা গুলি চালাচ্ছে আমাদের দিকে। সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, কিহে ঠিক বলিনি?
