টিলি মাস্টারটন বন্ডের বাহু স্পর্শ করল। কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, তুমি ঠিক জান ওরা শুধু ঘুমিয়ে রয়েছে। আমার মনে হল কয়েকজনের মুখে যেন ফেনা ফেনা দেখলাম।
বন্ডও দেখেছিল সেটা, রঙ ছিল গোলাপী। বলল, ঘুমিয়ে পড়বার আগে বোধহয় লজেন্স খাচ্ছিল, আমেরিকানদের ব্যাপার জান তো, সারাক্ষণ কিছু না কিছু চিবোচ্ছে। এবার অত্যন্ত আস্তে মেয়েটিকে বলল, আমার কাছাকাছি থেক না, গুলি চলতে পারে। মুখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝেছে কিনা দেখল বন্ড।
মেয়েটা বোকার মত মাথা নাড়ল বন্ডের দিকে না ফিরে। ফিসফিস করে বলল, আমি পুসির পাশে পাশে থাকব। ও আমাকে সামলে রাখবে।
বন্ড উৎসাহ ব্যাঞ্জক সুরে বলল, ভাল। ট্রেন থামতেই কামরাগুলোর দরজা খুলে সবাই কোষাগারের পার্শ্ববর্তী সাইডিং-এর প্ল্যাটফর্মে জড়ো হল।
এবার সবকিছু যেন নিখুঁত সামরিক নিয়মে চলতে লাগল। বিভিন্ন বাহিনী ব্যুহ সাজিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। প্রথমে রইল সাব মেশিনগান হাতে বাহিনী, যারা আক্রমণ করবে। তারপর কোষাগার থেকে প্রহরী ও অন্যান্যদের সরিয়ে আনার জন্য স্ট্রেচার বাহী লোক। সবাই তো মৃত। এরপরে আছে দরজা ভাঙার জন্য গোল্ডফিংগারের নিজস্ব বাহিনী। তারপরে বাড়তি ড্রাইভার ও ভারি লরীগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা। সবশেষে রইল পিস্তল হাতে নার্সের দল। এদের মধ্যে কেউ যদি জেগে ওঠে তাহলে এরাই তাকে ঠাণ্ডা করে দেবে।
বন্ড ও টিলি ছিল পরিচালক বাহিনীর মধ্যে। এ দলের অন্যান্যরা হলেন গোল্ডফিংগার, অব এবং পাঁচজন দস্যু সর্দার। এ দলটি থাকছে দুটো ডিজেল ইঞ্জিনের ছাদে। ইঞ্জিন দুটো রয়েছে সাইডিং-এর পাশে, যাতে লক্ষ্য বস্তুও তার আশেপাশের সবকিছু দেখা যায়। বন্ড ও টিলির কাছে আছে মানচিত্র, সময়সূচি আর ঘড়ি। বন্ডের কাজ হবে কোনরকম গোলমাল বা দেরি দেখলে গোল্ডফিংগারকে জানান যাতে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ওয়াকি টকি মারফত নির্দেশ দিতে পারেন। বোমা বিস্ফোরণ করবার আগে সবাই ইঞ্জিন দুটোর পিছনে আশ্রয় নেবে।
দুটো ভো শোনা যেতেই বন্ড ও টিলি সামনের ডিজেলের ছাদে উঠে পড়ল একই সঙ্গে। আক্রমণকারী বাহিনী রেললাইনের ধার থেকে ছুটল কোষাগারের দিকে। বন্ড গোল্ডফিংগারের চোখে দূরবীন। মুখের সামনে মাইক্রোফোন। কিন্তু অডজব দাঁড়িয়ে রইল তাদের দুজনের মাঝখানে। আগ্রাসনের দিকে একটুও আগ্রহ না দেখিয়ে এখনও বন্ড ও মেয়েটিকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে।
বন্ড মনে মনে ভাবল কোন দিক দিয়ে গোল্ডফিংগারকে আক্রমণ করা যায়। পাশের ডিজেল ইঞ্জিনের ওপর দাঁড়িয়ে পাঁচজন দস্যু নেতাদের দিকে তাকিয়ে দেখল সবাই একমনে সামনের দৃশ্যটা দেখছে। জ্যাক স্ট্র্যাপ উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, প্রথম গেটগুলো পেরিয়েছে ওরা। কথা কানে যেতেই বন্ড সেদিকে চোখ যোরাল কারণ তার মন পড়েছিল গোল্ডফিংগারের ওপর।
সে এক অসাধারণ দৃশ্য। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কালো কোষাগার গৃহ। পালিশ করা গ্রানাইটের দেওয়ালগুলোতে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে। বাইরের বিরাট মাঠ ও রাস্তাগুলো বড় বড় গরীতে ভরে গেছে, ড্রাইভারেরা পাঁচিলের আড়ালে দাঁড়িয়ে। ট্রেন থেকে নেমে সব কটি বাহিনী ঢুকছে প্রধান গেটের ভিতর দিয়ে। এত শত চাঞ্চল্যের বাইরে সবকিছু নীরব নিস্তব্ধ, যেন সারা আমেরিকা রুদ্ধশ্বাসে এই সুবিশাল কর্মকাণ্ড দেখছে।
কোষাগারের বাইরে অজস্র সৈন্য পড়ে আছে, যে যেখানে ছিল। পাঁচিলের ওপারে যুদ্ধের সাজ পরা দুটি সৈন্যবাহিনী, পিল বক্সের পাশে। স্তূপীকৃত অসংলগ্নভাবে পড়ে আছে প্রধান গেটের কাছে দুটো সঁজোয়া গাড়িতে ধাক্কা লেগেছে, সেইভাবেই সেটা পড়ে আছে? এটা ভারি মেশিন গান মাটির দিকে মুখ করা, অন্যটি আকাশের দিকে। বন্ড মরিয়া হয়ে চারদিকে এতটুকু প্রাণের স্পন্দন, এতটুকু চাঞ্চল্য খুঁজে পেতে চেষ্টা করল যাতে মনে হয় এটা একটা চমৎকার ফাঁদ। কিন্তু কিছু নেই। একটা বিড়াল পর্যন্ত জেগে নেই, চার পাশের থেকে এক টুকরো শব্দও ভেসে আসছে না।
গোল্ডফিংগার শান্ত কণ্ঠে মাইক্রোফোনে বললেন, শেষ স্ট্রেচার বেরিয়ে এসেছে, বোমারু বাহিনী তৈরি, সকলে গা ঢাকা দেবার জন্য প্রস্তুত হোন।
এবারে দস্যুবাহিনী ও স্ট্রেচার বাহকরা চটপট বেরিয়ে এসে পাঁচিলের আড়ালে আশ্রয় নিচ্ছে। জায়গাটা ফাঁকা করার জন্য পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। প্রধান গেটে অপেক্ষা করছে তারা। পাঁচ মিনিট হলে দরজায় বোমা বসাবে।
বন্ড কাজ করছে কিভাবে সেটা বোঝাতে বলল, এক মিনিট এগিয়ে আছে ওরা।
গোল্ডফিংগার অডজবের পাশ থেকে আগুন দৃষ্টি নিয়ে বন্ডকে দেখলেন। কঠোর হাসি হেসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, এখন বুঝতে পারছ মিঃ বন্ড হিসেবে তুমিই ভুল, আমি নয়। আর দশ মিনিটের মধ্যে আমি হব পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তুমি কি বল? বিতৃষ্ণার সঙ্গে বেরিয়ে এল কথাগুলো।
বন্ড শান্তভাবে জবাব দিল, আগে সে দশ মিনিট কাটুক তারপর বলব।
বলবে নাকি? গোল্ডফিংগার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মাইক্রোফোনে দ্রুত নির্দেশ দিতে লাগল। বোমারু বাহিনী এবার আস্তে আস্তে প্রধান গেটের দিকে এগোল। চারজন একটা শক্ত জালের মধ্যে এটম বোমটা নিয়ে যাচ্ছে।
গোল্ডফিংগার অন্য ডিজেলের ছাদে যেখানে দস্যু প্রতিনিধিরা রয়েছে, তাদেরকে বললেন আর পাঁচ মিনিট, এরপর আমাদের গা ঢাকা দিতে হবে। বন্ডের দিকে তাকিয়ে বলল, আর তারপর আমরা বিদায় নেব মিঃ বন্ড। তোমরা দু জনে যে সাহায্য করেছ তার জন্য ধন্যবাদ।
