একটা বিষয় মনস্থির করে ফেলেছিল বন্ড। অভিযানের শেষ মুহূর্তে যে করেই হোক গোল্ডফিংগারকে সে মেরে ফেলবে। কিন্তু এতে তো কোন লাভ হবে না? তাঁর মৃত্যুতে দলের পরিচালন ভার গ্রহণ করবে মিঃ শোলো সম্ভবত। অভিযানটা তাহলে সফল হবে না। সবাই নিজের নিজের অংশ নিয়ে সরে পড়বে। শুধু গোল্ডফিংগারের দল পড়ে থাকবে।
আর ইতিমধ্যে যদি ষাট হাজার লোক মারা পড়ে তাহলে তার সত্যিই তো কিছু করবার নেই। সে কি কোন সময়ে গোল্ডফিংগারকে মারার সুযোগ পেয়েছিল? বন্ডের মনে অসংখ্য প্রশ্ন, চিন্তা অসংখ্য সন্দেহ ও অনুশোচনায় ক্ষতবিক্ষত হতে লাগল। ট্রেনের জানালার কালো কাঁচে তার প্রতিচ্ছবি যেন তাকে ব্যঙ্গ করছে।
.
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধনী
ধীরে ধীরে প্রভাত হল, কালো পৃথিবীর ওপর। সকাল ছ টা নাগাদ ট্রেন এসে থামল লুইভিলে, শহরতলীর ভেতরে একটা ফাঁকা স্টেশনে।
একদল সম্ভ্রান্ত চেহারার লোক অপেক্ষা করছিল। গোল্ডফিংগার একটা কালো ব্যাগ নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন অধ্যক্ষের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে গেলেন। মাঝে মাঝে দু একটা বিস্মিত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন এবং উত্তর পাওয়া মাত্র বিষণ্ণ ভাবে ঘাড় নাড়ছিলেন। কথা শেষ হলে ট্রেনে ফিরে গিয়ে মিঃ শোলোকে বললেন, ডাক্তার আমার যতটা ভয় করছিলাম পরিস্থিতি তার চেয়েও খারাপ। আমি সামনের ইঞ্জিন ঘরে যাচ্ছি এটা নিয়ে (কালো ব্যাগটা দেখিয়ে)। এবার আমরা ক্রমশ দূষিত এলাকায় ঢুকব। সকলকে গ্যাস মুখোশ পরে নিতে বলুন। বাকি সব রেল কর্মচারি এখানেই নেমে যাবে, শুধু ইঞ্জিন ড্রাইভার ও ফায়ারম্যান ছাড়া।
মিঃ শোলো গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক আছে, প্রফেসর। গোল্ডফিংগার প্ল্যাটফর্ম দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন তার জার্মান দৈহরক্ষী ও সম্ভ্রান্ত চেহারার বিচলিত দলটিকে নিয়ে।
কিছুক্ষণ পর শান্তগতিতে রওনা হল ট্রেনটা। আর আধঘণ্টা বাকি গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে। নার্সেরা সবাইকে কফি ও ডোনট পরিবেশন করে গেল, আর যাদের স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ছে তাদের একটা করে ডেক্সিড্রিম ট্যাবলেট। কেউ কথা বলছে না, আশেপাশেও চটুল মন্তব্য শোনা যাচ্ছে না। সময় ট্রেন উত্তেজনায় থমথম করছে।
দশ মিনিট পরে হঠাৎ ট্রেনের গতি কমে ব্রেকের তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা গেল। প্রায় থেমে এসেছিল ট্রেনটা, শেষে আরেকটা ঝাঁকুনি দিয়ে আবার ছুটতে শুরু করল। বোঝা গেল মৃত ইঞ্জিন ড্রাইভারকে সরিয়ে কেউ একজন ট্রেন চালানোর ভার নিলেন।
কয়েক মিনিট পরে মিঃ স্ট্র্যাপ প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে বলল, আর দশ মিনিট, সবাই তৈরি হও! A,B,C বাহিনীর প্রত্যেকে অস্ত্রশস্ত্র গুছিয়ে নাও। সব ঠিক আছে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে যে যার কর্তব্য মনে রেখ। দ্রুত পদে পরের কামরায়। গিয়ে একই কথা বলে গেলেন। বন্ড এবার উঠে বাথরুমে ঢুকে ডানপায়ের জুতার তলা থেকে লুকানো ছুরিটা টেনে বার করে কোমরে গুঁজে নিল। একপাটি জুতার গোড়ালি নেই কেউ এটা এই সময় লক্ষ্য করবে না। মুখ ধুয়ে আয়নার মুখ দেখল ফ্যাকাসে মুখ, ধূসর নীল চোখ উত্তেজনায় থমথম করছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের জায়গায় বসল।
এবার ডানদিকে একসারি নিচু ঘর দেখা গেল, অনেক দূরে যেন ভোরের কুয়াশা থেকে ভেসে ওঠা মরীচিকা। আস্তে আস্তে স্পষ্ট দেখা গেল একসারি হ্যাঁঙ্গার এবং বেঁটে কন্ট্রোল টাওয়ার। গডম্যান বিমান বন্দর। ছুটন্ত ট্রেনের গতি এবার কমে এল। অনেকগুলো নতুন বাড়ি চোখে পড়ছে আশেপাশে, তাতে লোকজন নেই।
দূরে ফোর্ট নক্স দেখা দিল। নতুন শহরটাকে বেশ দেখাচ্ছে। শহরের ওপরের আকাশটা পরিষ্কার, একটুও ধোঁয়া নেই। আজ আর কোন ঘরে রান্না হচ্ছে না। ট্রেনের গতি খুব কমে এল। বাঁদিকের স্টেশন রোডে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, মুখোমুখি ধাক্কা লেগেছে দুটো গাড়িতে। গাড়ির ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে একটা দেহ অর্ধেক বেরিয়ে আছে, অন্য গাড়িটা উল্টে পড়ে আছে। বন্ডের হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল।
স্টেশনের মেন সিগন্যাল বক্স দেখা দিল অল্পক্ষণের জন্য। ঘরটার ভেতরে যন্ত্রপাতির ওপর সাদা রঙের শার্ট। শার্টের। ভেতরে একজন মানুষের দেহ, মাথা দেখা যাচ্ছে না বাইরে থেকে। এবার একসারি আধুনিক বাংলো দেখা গেল। একটা ছিমছাম লনের মাঝখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে শার্টপ্যান্ট পরা জনৈক ব্যক্তি। লনের অনেক দূর পর্যন্ত সুন্দর করে ঘাসকাটা হয়েছে, ভদ্রলোক পড়ে যাবার পর মুহূর্তে ঘাসকাটা যন্ত্রটা পাল্টা দাগ কেটে বেড়ার গায়ে উল্টে পড়ে আছে।
আরেকটি বাড়ির সামনে একজন মহিলা, রাশিকৃত জামাকাপড়ের মধ্যে পড়ে আছে, হয়ত কাপড় টাঙাতে টাঙাতে তার মৃত্যু হয়েছে। এবার ট্রেন যখন শহরে ঢুকল, দেখা গেল চারদিকে পড়ে আছে অসংখ্য মানুষের দেহ। কেউ রাস্তায়, ফুটপাথে, কেউ মোড়ে, থেমে যাওয়া গাড়ির মধ্যে কোথাও দোকানের ভেতর ঢুকে যাওয়া বিধ্বস্ত গাড়ির ভিতরে। আর রাস্তার মোড়ে লাল নীল বাতিগুলো এখনো নির্বিকার ভাবে রঙ বদলাছে। মৃত্যু আর মৃত্যু চতুর্দিকে মৃতদেহের ছড়াছড়ি, কোন চাঞ্চল্য কোন শব্দ নেই। কবরখানার মত নিস্তব্ধ শহরে শুধু শোনা যাচ্ছে খুনি ট্রেনের ধ্বনি।
ট্রেন ব্রান্ডেনবুর্গ স্টেশনে ঢুকল। এখানেও পড়ে আছে ডজন ডজন নারী, পুরুষ, শিশু সৈনিকদের দেহ। সারা প্ল্যাটফর্ম ছেয়ে গেছে; কেউ পড়ে আছে চিৎ হয়ে, কেউ উপুড় হয়ে, কেউ পাশ ফিরে, কোথাও বন্ড চাঞ্চল্য দেখতে পেল না। কিন্তু ওটা কি? ট্রেনের বন্ধ জানালার ভেতর দিয়ে একটা ক্ষীণ কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এল। টিকিট অফিসের সামনে তিনটে পেরামবুলেটর দাঁড় করানো, তিনজন মা পড়ে আছে মাটিতে। আর তাই তো, বাচ্চাগুলো তো দুধ খেয়েছে, বিষাক্ত পানি খায়নি।
