দিনরাত শুধু এই চিন্তা বন্ডকে অস্থির করে তুলল। এদিকে বিশাল অভিযানের ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র নির্ভুলভাবে এগিয়ে চলল। এর মধ্যে একদিন প্রবল উত্তেজনায় ঘটল। কেননা ফোর্ট নকস থেকে গোল্ডফিংগারের অনুচর খবর পাঠাল, বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। সেই দিনই সন্ধ্যায় বন্ডের কাছে নির্দেশ এল অভিযানের প্রথম পর্যায় শেষ। প্ল্যান অনুযায়ী ঠিক মধ্যরাত্রে ট্রেনে উঠতে হবে। যাবতীয় ম্যাপ, কার্য তালিকা ও নির্দেশ ইত্যাদি সঙ্গে আনবে।–G.
গোল্ড যথাসময়ে বন্ড ও টিলিকে মাঝখানে রেখে সদলবলে ঢুকলেন পেনসিলভানিয়া স্টেশনে। বন্ডের গায়ে সার্জেনের সাদা পোশাক আর টিলির নার্সের। অন্যান্যদেরও চিকিৎসক বাহিনীর উপযুক্ত পোশাক। আবলোর প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন দস্যুদলের একশ জনকে ভূতের মত দেখাচ্ছে। ভয়ঙ্কর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাহায্য করবার জন্য এই জরুরী চিকিৎসক বাহিনী এগিয়ে এসেছে, সেই জন্যই একটা চাপা উত্তেজনা। স্টেশনের অধ্যক্ষ দলের প্রবীন ডাক্তারদের (মিডনাইট, স্ট্র্যাপ শোল এবং রিং) সঙ্গে কথা বলছেন। পাশেই দাঁড়িয়ে নার্সের ড্রেসে গ্যালোর এর দলের বারোজন মেয়ে। তাদের মুখ ফ্যাকাসে, যেন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চমৎকার অভিনয় করছে প্রত্যেকে কর্তব্য পরায়ণ দয়ালু মানুষের ভূমিকায়।
গোল্ডফিংগারকে এগিয়ে আসতে দেখে অধ্যক্ষ তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, আপনিই ডঃ গোল্ড? তার মুখ গম্ভীর, খবর অনুযায়ী সবটুকুই খুব খারাপ, আজ রাত্রের কাগজে সব বেরিয়ে যাবে। সব ট্রেন সুইভিলে আটকে দেওয়া। হয়েছে, ফোর্ট নস্ থেকে কোন খবর নেই। তবে আপনারা যেতে পারবেন কোন অসুবিধা হবে না। কি কাণ্ড। কি হচ্ছে কি ওখানে? লুইভিলের লোকেরা বলছে রাশিয়ানরা আকাশ থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়াচ্ছে। অবশ্য এসব বাজে গুজবে আমি কান দিচ্ছি না। কিন্তু আসল ব্যাপারটা কি, খাদ্যে বিষক্রিয়া? বলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গোল্ডফিংগারের দিকে দেখলেন।
গোল্ডফিংগার গম্ভীর মুখ করে বললেন, বন্ধু এই দুঃখজনক ঘটনার কারণ জানতেই আমরা যাচ্ছি। তবে আমার মনে হয় এ একরকম নিদ্রারোগ–আমাদের ডাক্তারী শাস্ত্রে একে বলে ট্রাইপ্যানোশোনিয়াসিস।
-তাই নাকি? রোগের নাম শুনে অধ্যক্ষ যেন মুগ্ধ হয়ে গেলেন, বললেন, সত্যি ডাক্তার বিশ্বাস করুন, আপনি ও আপনার এই জরুরী চিকিৎসা বাহিনীর জন্য আমরা অত্যন্ত গর্বিত। করমর্দন করে আবার বললেন, আমার শুভেচ্ছা রইল আপনাদের সঙ্গে, এবার ট্রেনে উঠে পড় ন, যত তাড়াতাড়ি পারি ট্রেনটা ছেড়ে দিচ্ছি।
গোল্ডফিংগারের অভিবাদন সহ সংক্ষিপ্ত জবাব, ধন্যবাদ অধ্যক্ষ মশাই। আপনার উপকার আমাদের মনে থাকবে। সবাই উঠে পড় এবার।
বন্ড টিলিকে নিয়ে একটা কামরায় উঠল। চারপাশে গোল্ডফিংগারের কোরিয়ান ও জার্মান অনুচররা বসে। মিস পুসি তাদের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে বন্ডের ওপর আরেকবার সন্ধানী দৃষ্টি ফেলল। বন্ডের সামনের সীটের কাছে এসে বলল এই যে কার্তিকচন্দ্র। অনেক দিন পর দেখা হল। খুড়োমশাই বোধহয় তোমাকে ছাড়েন না, না কি?
বন্ডেরও চটপট জবাব, এই যে সুন্দরী, পোশাকটা তোমায় চমৎকার মানিয়েছে, তা আমার কেমন যেন অজ্ঞান হয়ে যাব মনে হচ্ছে, একটু নার্সিং করবে নাকি?
গাঢ়বেগুনী রঙের চোখ দুটো তাকে পর্যবেক্ষণ করল, কথাটা কি জান মিঃ বন্ড। আমার মনে হচ্ছে তোমার মধ্যে কিছু একটা মেকি ব্যাপার আছে। এসব আমার ষষ্ট ইন্দ্রিয় কাজ করে, বুঝেছ? টিলির দিকে ইঙ্গিত করে বলল? এ মেয়েটা আর তুমি এই অভিযানে কি করছ শুনি?
কাগজপত্রের কাজ আমরাই করি।
ট্রেন চলতে শুরু করেছে। পুসি গ্যালোর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, তা হয়ত কর। কিন্তু এতে যদি কোন গোলমাল বাধে তবে আমি বাজি রেখে বলতে পারি এটা তোমার কাজ, বুঝেছ?
বন্ডকে উত্তরের কোন সুযোগ না দিয়ে এগিয়ে গেল বড়কর্তাদের মিটিঙের দিকে।
বিশৃঙ্খলা ও ব্যস্ততায় একটা রাত এগিয়ে চলেছে। বিভিন্ন দস্যুদলের ঈর্ষা ও রেষারেষি কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। দুই দলপতি যদি তৈরি ও সতর্ক না থাকত তবে মাফিয়া ও জ্যাক স্ট্র্যাপ এর মধ্যে লড়াই বেধে যেত। এসব ছোটখাট ব্যাপার গোল্ডফিংগার যেন আগে থেকে আন্দাজ করে সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন। মিস গ্যালোরের মেয়েদের আলাদা কামরা, আর দলপতি ও তার লোকেরা নিজেদের মধ্যে সোনা পাচার করা যায় কিভাবে তা নিয়ে ব্যস্ত। বন্ড এই সব দস্যুদের আচরণ দেখে অবাক হচ্ছিল। এত উত্তেজনা ও লোভের মধ্যেও তারা শান্ত। গোল্ডফিংগার এর অচঞ্চলতা ও অভিযানের নিখুঁত প্ল্যান সকলের মনে আত্মবিশ্বাস আনতে পেরেছে আর তারই ফলে দস্যুদের উত্তেজনা শান্ত ও একতা জেগে উঠেছে।
পেনসিলভানিয়ার ওপর দিয়ে যাচ্ছে তাদের ট্রেন, যাত্রীরা সকলেই আধো ঘুমে আচ্ছন্ন কিন্তু গোল্ডফিংগার ও অডজব সমানে জেগে। বন্ড ভাবছিল কোন স্টেশনে ট্রেনের গতি কমে এলে অডজবকে ছুরি মেরে পালিয়ে যাবে। কিন্তু এদের দু জনের এত সতর্ক দৃষ্টি যে তার আর হল না।
অধ্যক্ষের কথাগুলো মনে করছিল বন্ড। ভদ্রলোক কি সত্যিই লুইভিল থেকে ওরকম কোন খবর পেয়েছেন, নাকি দলশুদ্ধ লোককে ফাঁদে ফেলবার চেষ্টা। কাগজের প্যাকেটের বার্তায় সেই চেষ্টাই করতে বলেছিল বন্ড। কিন্তু খবরটা কি সত্যি? বিষ যদি ইতিমধ্যে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে তবে আর কিছুই করার নেই।
