বন্ড বুঝল; টিলি মাস্টারটন সেই বিচিত্র মেয়েদের একজন যাদের দেহে গোলমাল আছে। এদের মধ্যে পুরুষ ও নারী সত্তার এমন এক অস্বাভাবিক মিশ্রণ থাকে যার জন্য পুরুষদের বশ্যতা স্বীকারও করে না আবার সমকামী হতেও পারে না। এরা যে ঠিক কি চায় জানে না, তার জন্য দৈহিক পরিতৃপ্তির দিক দিয়ে অশান্তি ও হতাশা ভোগ করে। বন্ড এদের জন্য দুঃখ অনুভব করে, অথচ এই মেয়েটাকে নিয়েই সে স্বপ্নের জাল বুনছিল, মনে পড়ে হাসি পায় বন্ডের।
দিনের শেষে গোন্ডফিংগারের কাছ থেকে নির্দেশ এলঃ আগামীকাল বেলা ১১টায় আমি এবং পাঁচজন প্রধান সহযোগী লা গাডিয়া এয়ারপোের্ট থেকে একটি ভাড়াটে প্লেন নিয়ে অপারেশন এ্যান্ড স্ল্যামরের ঘটনাস্থল দেখতে যাব। তুমিও সঙ্গে যাবে, তবে মাস্টারটন এখানেই থাকবে। ইতি–G.
বন্ড বিছানায় বসে কিছুক্ষণ দেওয়ালের দিকে চেয়ে রইল তারপর উঠে টাইপরাইটারের দিকে এগিয়ে গেল। একটা কাগজের দুদিকে অভিযানের বিস্তৃত বিবরণ টাইপ করে গোলা পাকিয়ে আঠা দিয়ে শীল করে দিল, দেখতে ঠিক কড়ে আঙ্গুলের মত হল। এরপর ছোট এক টুকরো কাগজে বড় বড় অক্ষরে টাইপ করল? অত্যন্ত জরুরী। কাগজটি না খুলে পিংকারটন ডিটেটিভ এজেন্সীর (ঠিকানা : ১৫৪ নাসসা স্ট্রিট নিউইয়র্ক সিটি) মিঃ ফেলিক্স লিটারের হাতে পৌঁছে দিলেই ৫০০০ ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে যে পৌঁছে দেবার সঙ্গে সঙ্গে কোন প্রশ্ন না করে নগদ প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়া হবে।
পাকানো কাগজটার ওপর চিরকুটটা আটকে বাইরে লাল কালি দিয়ে বড় করে লিখল ৫০০০ ডলার পুরস্কার।
সবশেষে উরুর ভেতরের দিকে টেপের সাহায্যে আটকে নিল প্যাকেটটা।
.
মৃত্যুপথের যাত্রী
মিস্টার বিমান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ জানতে চাইছে আমরা কে? কারণ এই এলাকায় বিমান চালান নিষিদ্ধ।
গোন্ডফিংগার উঠে ককপিটের কাছে গিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললেন, সুপ্রভাত, প্যারামাউন্ট পিকচার্স কর্পোরেশনের মিঃ গোন্ড কথা বলছি। ১৮৬১ সালের এক বিখ্যাত লড়াই নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের একটা ছবি করছি। সে। জন্য আকাশপথে শুটিং-এর জায়গা পরিদর্শনে বেরিয়েছি আমরা। …আজ্ঞে হ্যাঁ। প্রধান ভূমিকায় আছেন ম্যারী গ্রান্ট ও এলিজাবেথ টেলর। কি বললেন সরকারি অনুমতিপত্র? নিশ্চয় আছে বৈকি। দাঁড়ান দেখে বলছি। কিছু না দেখেই। বললেন, এই যে আছে পেন্টাগনের চীফ অফ পেনাল সার্ভিসেস মহাশয়ের সই করা। ঠিক আছে ধন্যবাদ। আশা করি আপনাদের ভালই লাগবে। বিদায়।
গোল্ডফিংগার মাইক্রোফোন রেখে কেবিনে এসে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আশা করি আপনারা যা দেখার দেখে নিয়েছেন। আমার মনে হয় ফোর্ট নন্স শহরের যে বর্ণনা আপনারা পেয়েছেন আসল জায়গাটার সঙ্গে তার কোন আমিল নেই। এবার আমরা ফিরে যাব। অডজব জলযোগের ব্যবস্থা কর।
দু একটা প্রশ্ন ও মন্তব্য কানে এল। গোল্ডফিংগার একে একে তার জবাব দিতে লাগলেন। অডজব উঠে প্লেনের পেছনদিকে যেতে বন্ডও তার পেছনে চলল, অডজবের কড়া সন্দিগ্ধ দৃষ্টির সামনে বাথরুমে ঢুকে গেল।
চুপ করে বসে ভাবতে লাগল, সে এয়ারপোর্টে কারো হাতে কাগজটা পাচার করতে পারেনি, কারণ অডজবের সারক্ষণ কড়া দৃষ্টি, তার ওপর প্লেনে বসতেও হয়েছে তার পাশে। ডাকাত প্রতিনিধিরা তাদের কিছু পরে প্লেনে ওঠে, আগের দিনের মত অত উশৃখল ভাব নেই। পুসি গ্যালোরকে পর্যন্ত অন্যরকম দেখাচ্ছে। প্লেনের মধ্যে কয়েক বার বন্ডের দিকে চিন্তান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়েছে। বন্ড চোখে চোখ পড়তে হাসলেও সে কিন্তু হাসেনি। বন্ডের মনে হয়েছে। তার পরিচয় ও ভূমিকা সম্পর্কে পুসি বোধহয় সন্দেহ করছে। অতএব কাগজটা পাচার করতে না পারলেই নয়। এয়ারপোর্টে নেমেও পারবে না। যা করবার এখনই করতে হবে।
বাথরুমের কড়া জোরে নেড়ে উঠল। অঞ্জবের কাণ্ড সে ভাবছে। প্লেনে বোধহয় আগুন ধরাবার চেষ্টা হচ্ছে। বন্ড তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন, আসছিরে বাঁদর দাঁড়া! উঠে কমোডের সীট টেনে তুলে, প্যাকেটটা সীটের তলার সামনে আটকে দিল। প্লেন যখন হ্যাংগারে ফেরত যাবে সেখানে নিশ্চয়ই বাথরুম পরিষ্কার করা হবে। লাল অক্ষরে লেখা ৫০০০ ডলার পুরস্কার। ঝাড় দার যতই ব্যস্ত হয়ে কাজ করুক না কেন চোখে পড়বেই। তবে এর আগে কেউ এটাকে পেয়ে গেলে মুশকিল। কিন্তু যাত্রীদের কেউ আর সীট তুলবে বলে মনে হয় না। সীটকে নামিয়ে মুখ ধুয়ে চুল ঠিক করে চলে এল বন্ড।
রাগে লাল হয়ে অপেক্ষা করছিল অডজব। তাকে ঠেলে বাথরুমে ঢুকে চারপাশ পরীক্ষা করে বেরিয়ে এল। বন্ড মনে মনে ভাবতে লাগল এবার তাহলে বোতলে পোরা সাহায্যবার্তা সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া গেছে। কিন্তু কতক্ষণে কে পাবে?
এমন দুর্ভাগ্য, যাত্রীদের প্রত্যেকে এমনকি পাইলট সেই বাথরুমটাতেই ঢুকল। এক একজন বের হচ্ছে আর তা মনে হচ্ছে এই বুঝি ঘাড়ে পিস্তলের নল ঠেকল, তার পরেই নিশ্চয় শোনা যাবে উত্তেজিত কথাবার্তা আর প্যাকেট খোলার মড়মড় শব্দ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্লেন মাটিতে নামল, আবার গাড়ি করে বন্ডকে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হল।
এইবার রেস শুরু হল। গোল্ডফিংগারের সুদক্ষ পরিকল্পনা ও বন্ডের রেখে আসা ছোট সূত্রটুকুর মধ্যে। বাইরে কি হচ্ছে? সে যা আশা করছে তাই, না কি গোলমাল ঘটেছে? পিংকারটন এজেন্সীর দুদে গোয়েন্দা লিটার হয়ত বলবে, কে এই 007? কথার মানে কি? পাগল টাগল মনে হয়। স্মিথ কাগজটা একবার পড়ে দেখ তো! না হয় বাড়িটা একবার খুঁজে এস। নাঃ মিস্টার দুঃখিত, তোমাকে পাঁচ হাজার ডলার দেওয়া যাচ্ছে না। তবে লা-গার্ডিয়া এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ট্যাক্সী ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। মনে হচ্ছে এটা একটা ধাপ্পা। কিংবা হয়ত তার চেয়েও খারাপ কিছু হয়েছে, প্লেনটাকে না ধুয়ে ফেলে রাখা হয়েছে।
