গোল্ডফিংগার দু বার ঘন্টা বাজিয়ে অডজবের কাছে সংকেত দিয়ে পেটানো হল স্প্রিংগার ও তার দেহরক্ষীকে। এ ব্যাপারে বন্ডের কিছু করার ছিল না আর সে বিষয়ে আর মাথাব্যথাও নেই। হয়ত একে বহুদিন আগেই খতম করা। উচিত ছিল। কিন্তু গোল্ডফিংগার অচিরেই আরো ৫৯, ৯৯৮ জনকে পেটানোর ব্যবস্থা করেছেন এবং বন্ড ছাড়া তাকে বাধা দিতে কেউ পারবে না।
দস্যু সর্দারদের সম্মেলন শেষ হয়ে যাবার পর গোল্ডফিংগার শুধু বন্ডকে থাকতে বলেছিলেন নোট নেবার জন্য। তখন বন্ড জিজ্ঞাসা করেছিল জলাশয়ের পানি কি ওষুধ মেশান হবে, তার কার্যকারিতা কি রকম।
-ও নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন নেই তোমার।–কেন নেই? ওর ওপরেই তো সব কিছু নির্ভর করছে।
-মিঃ বন্ড গোল্ডফিংগারের চোখে উদাস দৃষ্টি। কথাটা তোমাকে বলছি, কারণ আর কাউকে বলে দেবার সুযোগ তুমি পাবে না। অভিযানের আগের দিন মধ্যরাত্রের আগেই ফোর্ট নকসের প্রতিটি লোক মৃত অথবা পঙ্গু হয়ে যাবে, ওখানকার পানীয় পানি যে বিষ মেশান হচ্ছে তার আসল নাম GB.
-তোমার মাথা খারাপ হয়েছে! তুমি বলতে চাও ষাট হাজার লোককে তুমি খুন করবে?
–কেন করব না? আমেরিকান ড্রাইভাররা আমার থেকেও বেশি মানুষ চাপা দেয়।
বন্ড অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে চেয়ে রইল গোল্ডফিংগারের দিকে। এ কখনও হতে পারে না, বাজে কথা বলছে লোকটা। উত্তেজনা সংহত করে বলল, এই GB জিনিসটা কি?
-GB হল সবচেয়ে মারাত্মক জাতের একরকম স্নায়ু বিধ্বংসী বিষ। ১৯৪৩ সালে জার্মান সামরিক বৈজ্ঞানিকরা এটি আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু ব্যবহার করেননি। সত্যি বলতে কি ব্যাপক ধ্বংস চালাতে এই বিষ হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও বেশি কার্যকরী। যুদ্ধের শেষে সব বিষটুকুই রাশিয়ানদের হস্তগত হয়। আমার এক বন্ধু মারফত খানিকটা আমি পেয়েছি।
বন্ড বলল, গোন্ডফিংগার তুমি একটা হতচ্ছাড়া, বেজন্ম।
–ছেলেমানুষী কর না, অনেক কাজ বাকি।
পরে কাজকর্মের বিস্তৃত বিবরণ তৈরি করতে করতে যখন তারা ঐ বিশাল পরিমাণ সোনা শহরের বাইরে পাচার করবার ব্যবস্থা পৌঁছাল তখনও বন্ড একবার শেষ চেষ্টা করল। বলল, গোল্ডফিংগার এই এত টন সোনা পাচার করা অসম্ভব। একশ টনই বের হবে না তো পাঁচশ টন বের করা দূরের কথা। শেষে দেখবে গোটাকয়েক বার্ট নিয়ে পালাতে হচ্ছে। আর তোমার পেছনে ছুটছে আমেরিকার পুলিশবাহিনী। এজন্য তুমি কিনা ষাট হাজার লোককে খুন করছ? গোটা ব্যাপারটাই হাস্যকর–তাছাড়া দু এক টন যদি সরিয়েও নিতে পার তো রাখবে কোথায়।
-মিঃ বন্ড অসীম ধৈর্যের সঙ্গে গোল্ডফিংগার-এর বক্তব্য–ঘটনাক্রমে একটি রাশিয়ান ক্রুজার জাহাজ ঠিক ঐ সময়ে এক শুভেচ্ছা সফরে আসছে ভার্জিনিয়া প্রদেশের নরফোক বন্দরে। আমাদের কাজ হয়ে যাবার পর দিন জাহাজটি নরফোক ছেড়ে যাবে। অভিযানের দিন প্রথমে ট্রেনে ও ট্রাকে করে মাল নিয়ে মধ্যরাত্রের মধ্যে জাহাজে গিয়ে উঠব। পরদিন একই জাহাজে আমি রওনা হব রাশিয়ার ক্রেনিভান্টের দিকে।
প্রতি জিনিস আগে থেকে প্ল্যান করা আছে, প্রতিটি সম্ভাব্য বাধা বিপত্তি সমাধান তৈরি করা আগে। গত পাঁচ বছর ধরে চিন্তা করে মতলব সম্পূর্ণ করেছি। এবার কাজ শেষ করে আমি উধাও হয়ে যাব, মিঃ বন্ড, সেই সঙ্গে নিয়ে যাব আমেরিকার হৃৎপিণ্ডটিকে।
এ কাজ নিখুঁতভাবে শেষ করতে হবে। এই আনাড়ী ডাকাতগুলোকে দরকার লোকবল ও অস্ত্রবলের জন্য। কিন্তু শেষ পর্যায়ে পৌঁছনোর জন্য ডাকিনি, কারণ এরা কাজে ভুল করবেই। নিজেদের লুঠের মাল সরান নিয়ে বিস্তর ঝামেলা হবে এমনকি মারাও পড়বে কেউ কেউ। জনতার দৃশ্যে যেমন অভিনয়ের জন্য রাস্তা থেকে লোক ধরে আনা হয় এরাও তেমনি, অভিনয়ের শেষে কি আছে ওদের কপালে তা নিয়ে একটুও চিন্তিত নই আমি…আচ্ছা এবার কাজ শুরু করা যাক, সবকটার সাত কপি দেবে আমায় রাত্তিরের মধ্যে। তা কতদূর এগিয়ে ছিলাম আমরা…?
বন্ডের মাথায় তখন ঘুরছে গোল্ডফিংগারের কথা। SMERSH-এর প্রতিনিধি হিসেবে তাহলে গোল্ডফিংগার কাজ করেন না। SMERSH-নিজেই এ কাজ করছে আর তাকে ব্যবহার করছে ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে। অন্য দেশের সোনা চুরিও কি আক্রমণের পর্যায়ে পড়ে না? কিন্তু কেউই জানবে না SMERSH-এ কাজ করছে, কেউ না। যারা এসেছিল তারা। এই গোপন অধ্যায়ের কথা ঘুণাক্ষরে টের পায়নি। জাহাজে চেপে শুধু কি গোন্ডফিংগার যাবে? তার অনুচরেরাও যাবে নিশ্চয়ই। তাহলে বাকি থাকে বন্ড ও টিলি, তাদের শেষ করে দিলে এই বিশাল ঘটনার সাক্ষী কেউ থাকে না।
এবং সারা পৃথিবীতে একজন মাত্র লোক আছে যে এই ষড়যন্ত্র ভেস্তে দিতে পারে, কিন্তু কি করে?
পরের দিন অন্তহীন কাজকর্মের চাপে বন্ড নিঃশ্বাস ফেলার সময় পায়নি। আধ ঘণ্টা অন্তর অন্তর কাজের ফিরিস্তি। এত কিছু হচ্ছে তবু অডজবের পাহাড়ার এতটুকু হেরফের হচ্ছে না। টিলি মাস্টারটন ও চাপচাপ নির্ভুলভাবে কাজ করে যাচ্ছিল, কথাও বলল নিরুত্তাপভাবে, বন্ড বন্ধুত্ব পাতাতে চেষ্টা করলে একই ভাবে সাড়া দিল তার বেশি কিছু নয়। কথা প্রসঙ্গে সে বন্ডকে জানাল এই ফোর্ট নকসের ব্যাপারটা একদম বাজে, নির্ঘাত একটা গণ্ডগোল হবে, এবং গণ্ডগোল। হলে পুসি গ্যালোর টিলিকে বাঁচাবেন, বন্ড যেন তাকে নিয়ে মাথা না ঘামায়। সে নিজেই নিজের ব্যবস্থা করে নিতে পারবে, আর মেয়েরা সূক্ষ্ম কাজ তাছাড়া ভালই পারে।
