ভদ্রমণ্ডলী, আমার মতে কেনটাকি প্রদেশে এই জুন মাসের গরমে অন্তত আধগ্লাস পানি না খেয়ে চব্বিশ ঘণ্টা কাটান যায় না। অতএব, অভিযানের দিন আমরা যখন ঢুকব তখন দেখা যাবে শহরের প্রতিটি লোক যে যে অবস্থায় মুখে গ্লাস দিয়েছিল সেই অবস্থায় ঘুমিয়ে রয়েছে।
-এটা ঠিক রূপকথার মত শোনাচ্ছে না! মিস গ্যালোর উক্তি।
-চুপ কর পুস। মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন মিঃ ট্র্যাপ, আপনি বলে যান মিস্টার, ভালই শোনাচ্ছে, আমরা শহরে ঢুকব কি করে?
গোল্ডফিংগার বললেন, অভিযানের আগের দিন রাত্রে নিউইয়র্কে একটা বিশেষ ট্রেনে যাব আমরা, দলে প্রায় একশ জন লোক থাকব, পরনে থাকবে রেড ক্রস কর্মীদের পোশাক। নার্সের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য একজন মেয়ে আশা করি মিস্ গ্যালোর দেবেন। এই সামান্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটির জন্যই আপনাকে এই সমাবেশে ডাকা হয়েছে।
মিস গ্যালোর সোৎসাহে বলে উঠল, কিছু ভাববেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে, নার্সের সাদা পোশাকে আমার মেয়েদের চমৎকার দেখাবে। কি বল জ্যাকো? বলে মিঃ স্ট্রাপকে খোঁচালেন।
-আমার মনে হয় সিমেন্টের ওভারকোট পরলে আরও ভাল দেখাবে। কথায় কথায় তোমার টিপ্পনি কাটার দরকার নেই, আপনি বলে যান মিস্টার স্ট্র্যাপ বলে উঠলেন।
ফোর্ট নসের পঁয়ত্রিশ মাইল আগে লুইভিলে আমি ও আমার সহযোগী উঠব ট্রেনের কামরায় যেখান থেকে। ডিজেল ইঞ্জিন পরিচালিত হয়। কৈফিয়ৎ দিতে হলে বলব যে সঙ্গের সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির সাহায্যে আমরা ফোর্ট নকসে ঢোকবার আগে ঐ এলাকার হাওয়া বিশ্লেষণ করে দেখতে চাই, কারণ ততক্ষণে এই বিচিত্র রোগের সংবাদ বর্হিজগতে পৌঁছে যাবে এবং ঐ এলাকায় এবং সারা দেশেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। খুব সম্ভবত আমাদের যাওয়ার পরই, ভোরবেলা উদ্ধারকারী বিমান ফোট নকসের নিকটবর্তী গডম্যান এয়ারফিন্ডে নামতে চেষ্টা করবে। অতএব অকুস্থলে পৌঁছে প্রথম কাজ গডম্যান এয়ার ফিল্ডের কন্ট্রোল টাওয়ার দখল করে এয়ার পোর্টটি বন্ধ ঘোষণা করে দেওয়া ও ঐ সব প্লেনকে লুইভিল দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। যাই হোক, এবার আগের কথায় ফিরি। ট্রেন লুইভিল ছাড়বার একটুপরে। আমি ও আমার অনুচরেরা যথা সম্ভব অহিংস উপায়ে ড্রাইভার ও ফায়ার ম্যানকে কাবু করে ফেলব। তারপর ট্রেনটাকে নিয়ে গিয়ে ফোর্ট নকসের কোষাগারের সংলগ্ন রেলওয়ে সাইডিং-এ রাখব। ইতিমধ্যে আপনাদের ট্রাকগুলোও এসে পৌঁছবে। একদল লোক ট্রাকে করে চলে যাবে গডম্যান এয়ার ফিল্ড দখল করবার জন্য। আর আমরা সবাই কোষাগারের দিকে পা বাড়াব। ঠিক আছে।
টেবিলের ওপারে মিঃ শোলোর কালো চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। নরম গলায় বললেন, নিশ্চয় এ পর্যন্ত তো ঠিকই আছে, এরপর বোধহয় আপনি– এইরকম একটা ফুঁ দেবেন (মুখভঙ্গি করে দেখালেন) আর সঙ্গে সঙ্গে কোষাগারের টন টন সোনার লোহার দরজাটা ধ্বসে পড়ে যাবে। কেমন?
-আজ্ঞে হ্যাঁ গলার স্বর এতটুকু না বদলিয়ে বললেন, ব্যাপারটা সেইরকমই হবে। উঠে ব্ল্যাক বোর্ডের কাছে টেবিলটার ওপর থেকে বড় বাক্স নিয়ে এসে সামনের টেবিলে রাখলেন। বাক্সটা রীতিমত ভারি মনে হল।
আবার বসে বলতে শুরু করলেন, আমার অনুচরেরা যতক্ষণ দরজা খোলার চেষ্টা করছে ততক্ষণে একদল কর্মী। স্ট্রেচারে করে ঐ নিদ্রিত দেহগুলি, যতগুলি আছে আশপাশে তাদেরকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করবে। গোল্ডফিংগারের পরের কথাতেই ভণ্ডামির গন্ধ পেল বন্ড–সুধীমণ্ডলী আশা করি আপনারা সকলেই একমত হবেন যে, নরহত্যা যত সম্ভব না করাই ভাল। এ পর্যন্ত ট্রেনের দুই কর্মচারির ক্ষতি ছাড়া আর কারও হয়নি।
কোন মন্তব্যের অপেক্ষা না রেখে সামনের বাক্সের ওপর হাত রেখে বলে চলছেন, বন্ধুগণ আমার বা আপনাদের দলের যদি কখনো সাধারণ বন্দুক পিস্তলের চেয়ে বড় অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন হয় সেগুলো কোথা থেকে জোগাড় করবে? নিশ্চয়ই সামরিক যন্ত্রাগার থেকে। সাব মেশিনগান বা তার চেয়েও মারাত্মক অস্ত্র আপনারা সগ্রহ করবেন নিকটস্থ সামরিক ঘাঁটির স্টোর কীপারের কাছ থেকে। এজন্য গায়ের জোর, ব্ল্যাকমেলিং বা যেপথ নিতে হয় নেবেন। আমিও তাই করেছি। কোষাগারের দরজা ভাঙবার মত একটিই অস্ত্র আছে, সেটা অনেক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে জার্মানির এক সামরিক ঘাঁটি থেকে নিয়ে এসেছি। এর জন্য খরচ দশ লক্ষ ডলার। এই বাক্সে রয়েছে একটি এটম বোমা। কর্পোরাল নামক মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ডগায় এই বোমা লাগানো থাকে।
-ইয়া আল্লাহ! মিডনাইট সজোরে টেবিলের একধার চেপে ধরলেন বিস্ময়ে।
টেবিলের প্রতিটি মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেছে। বন্ড অনুভব করল তার নিজের চোয়ালই এত শক্ত হয়ে গেছে যে গালে টান পড়ছে। উত্তেজনা প্রশমিত করবার জন্য সিগারেট ধরাল। লাইটার নিভিয়ে ভাবল, এ কোথায় এসে পড়েছে সে।
গোল্ডফিংগার সম্পর্কীয় যাবতীয় স্মৃতি একে একে চোখের ওপর ভাসতে লাগল। কাবানা ক্লাবের ছাদে প্রথম গোল্ডফিংগারের অর্ধনগ্ন খয়েরি দেহ দেখতে পেয়েছিল সে, চোট্টামি ফাঁস করে দিয়েছিল খেলাচ্ছলে, তারপর M-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সোনা স্মাগলারকে ধরার চেষ্টা। বড় জাতের অপরাধী, রাশিয়ানদের হয়ে কাজ করেন–তবু একজন প্রমাণ সাইজের অপরাধীর চেয়ে বেশি কিছু নয়। তাকে গলফ খেলায় হারিয়ে সুকৌশলে আড্ডায় পৌঁছল, এরকম ওর। আগেই হয়েছে।
