গোল্ডফিংগার আবার ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে গিয়ে অন্য একটা ম্যাপ খুললেন। এতে মূল স্বর্ণভাণ্ডারের বিস্তৃত বিবরণ আঁকা রয়েছে, গোল্ডফিংগার বললেন, বন্ধুগণ, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন এক অতি সুদৃঢ় চৌকো দোতলা বাড়ির মধ্যে কোষাগার অবস্থিত। এই বাড়ির চার কোণে চারটি ইস্পাতের গ্রিল বক্সের ভেতর মেশিনগান ধারী প্রহরীরা পাহারা দিচ্ছে। এর উচ্চতা বিয়াল্লিশ ফুট, চওড়ায় ও লম্বায় যথাক্রমে একশ একুশ ও একশ পাঁচ ফুট। সমস্ত বাড়িটা তৈরি হয়েছে ইস্পাতের লাইনিং দেওয়া গ্রানাইট দিয়ে।
বাড়ির দোতলায় রয়েছে ইস্পাত ও কংক্রীটের তৈরি আরেকটি ঘর। এটিই মূল কোষাগার। এই কোষাগারের দরজার ওজনই কুড়ি টন, কোন লোক ঐ দরজায় তালা খোলবার কম্বিনেশন জানে না। বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারি পৃথকভাবে এক একটি অক্ষর ঠিক ঠিক ডায়াল করলে তবেই তালা খুলবে নচেৎ নয়। বলা বাহুল্য এই কোষাগার সব রকমের সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতির দ্বারা সুরক্ষিত। বাড়ির ভিতরে কড়া পাহারা তো আছেই, প্রয়োজন হলে এক মাইল দূরের সামরিক ঘাঁটি থেকে যে কোন সময় সাহায্য চাওয়া যায়।
আরেকবার টেবিলের চারপাশে চোখ বুলিয়ে সবশেষে বললেন, দ্রমহোদয়গণ ও মহোদয়া, ফোর্ট নক্সের ভেতর ও বাইরে সম্পর্কে-এর বেশি আমার জানা নেই, আর জানবার প্রয়োজনও নেই। আপনাদের যদি কোন প্রশ্ন না থাকে তাহলে কি করে দুর্গ ভেদ করে ভাণ্ডার লুঠ করা যায় তার ব্যাখ্যা দেব আমি।
ঘরের চারপাশের সবকটি চোখ গোল্ডফিংগারের দিকে নিবদ্ধ। মিঃ জ্যাক স্ট্র্যাপ নার্ভাস ভঙ্গিতে মুখে সিগারেট গুজলেন।
পুসি গ্যালোর ফের কড়া গলায় বলে উঠল, আবার যদি ঐ জিনিসটায় আগুন ধরিয়েছ তো এই বাটটা দিয়ে তোমার। মাথায় মারব। বাটটা চেপে ধরল শানির ঢঙে।
মিঃ স্ট্র্যাপ বললেন, ঠাণ্ডা হও।
মিঃ জেড মিডনাইট দৃঢ়কণ্ঠে মন্তব্য করলেন। মিস্টার যদি সত্যিই এ জায়গা লুঠ করতে পার তাহলে তুমি অবতার ছাড়া কিছু নয়। যা বলার বলে যাও। এ ব্যাপারটায় হয় গাঁজাখুরি আছে নয় সবার সেরা এক ডাকাতি।
গোন্ডফিংগার নিরুত্তাপ সুরে বললেন, ভাল কথা, এবার প্ল্যানের বিবরণ শোনা যাক। আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এ ব্যাপারে নিরাপত্তার প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি। তাই এ পর্যন্ত যা যা বলেছি সবটুকু পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু এবার যা বলব তাতে আমরা সবাই শান্তিকালীন ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ব। আপনারা প্রত্যেকে শপথ করে বলতে পারেন, এসব কথা জানাজানি হবে না?
বন্ড তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল মিঃ স্প্রিংগারের দিকে, অন্য সকলের সঙ্গে আমি কথা দিচ্ছি বললেও কথাটা নিতান্ত ফাঁপা শোনাল। তাই সামনের তালিকায় সহজ ভঙ্গিতে তার নামের পাশে বিয়োগচিহ্ন বসালেন।
ঠিক আছে তাহলে, নিজের টেবিলে চলে এলেন গোল্ডফিংগার, বসে পেন্সিল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে শক্ত কাজ লুঠ করা সোনা পাচার করা। এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনার ওজন প্রায় এক হাজার টন। এত সোনা সরাতে চাইলে একশটি দশ টন ওজনের ট্রাক, কিংবা বিশটা ছ চাকাওয়ালা ভারি লরী চাই। তবে দ্বিতীয়টিই আমার পছন্দ। যে সব কোম্পানি এই গাড়ি ভাড়া দেয় তার তালিকা আমার কাছে আছে। আমি চাই এখান থেকে গিয়ে প্রত্যেকে এক একটি কোম্পানির কাছ থেকে লরী ভাড়া করবেন। লুঠের পর আপনাদের ভাগের সোনা আপনারা সুবিধামত জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন।
কোথায় এবং কিভাবে নিয়ে যাবেন এটা নিজস্ব ব্যাপার। আমার নিজের প্রয়োজনে আমি রেলপথটি ব্যবহার করব। আপনাদের চেয়ে অনেক বেশি সোনা সরাতে হবে আমাকে। আশা করি সে জন্য আমি একা রেলপথটি ব্যবহার করলে কোন আপত্তি হবে না।
গোল্ডফিংগার অন্যান্যদের মন্তব্যের জন্য অপেক্ষা না করে একই ভাবে বলে চললেন, সোনা পাচারের সমস্যার তুলনায় অন্যান্য কাজ শক্ত হবে না। প্রথমত অভিযানের আগের দিন আমি ফোর্ট নন্স-এর সমস্ত সামরিক ও অসামরিক জনসাধারণকে সাময়িকভাবে অচল করে দিতে চাই এর জন্য ব্যবস্থা হয়ে গেছে, শুধু সংকেত পাঠালেই হল।
সংক্ষেপে বলতে গেলে ফোর্ট নকসের যাবতীয় পানীয় এবং অন্যান্য পানি সরবরাহের জন্য দুটি জলাশয় ও দুটি ফিল্টার প্ল্যান্ট তত্ত্বাবধান করেন একজন পোস্ট ইঞ্জিনিয়ার। টোকিওর পৌর পানি সরবরাহ কেন্দ্রের সুপারিন্টেনডেন্ট ও ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট এই ইঞ্জিনিয়ারটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। উদ্দেশ্য ও ফোর্ট নকসের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, কারণ টোকিওর এক শহরতলীতে এই সাইজের একটি পানি সরবরাহ কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। স্বভাবতই ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক সানন্দে তাদের অনুমতি দেবেন এবং দেখানোর ব্যবস্থা করবেন।
বলা বাহুল্য এই জাপানি ভদ্রলোক দুটি আমারই কর্মচারি। এদের সঙ্গে থাকবে আফিংজাত এক মাদকের ঘনীভূত মিশ্রণ। ওষুধটি গত যুদ্ধের সময় জার্মানরা এই জন্যই আবিষ্কার করেছিল। এ ওষুধ বিশাল পরিমাণ পানির মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি মিশে যায় আর কাজও করে তাড়াতাড়ি। খাবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, যে ঘুম ভাঙে তিনদিন পরে। তবে এই ওষুধের কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই।
