বন্ড বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটা গল্প বইয়ের মধ্যে একেবারে ডুবে গিয়েছিল, সম্বিৎ ফিরে পেল সেভারের ডাকে, সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে, জায়গায় বসা দরকার। বন্ড তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে মুখোশটা গলিয়ে নিল তারপর স্নাইপারস্কোপের ঘুল ঘুলিতে চোখ লাগিয়ে পর্দার তলার দিকটা আস্তে আস্তে তুলে ধরে কাঁধের পিছনে নামিয়ে নিল। একে একে সন্ধ্যা নামছে। স্নাইপারটাকে এপাশ ওপাশ সরিয়ে বন্ড সবকিছু ভাল করে দেখে নিল। সেই চারটে অন্ধকার জানলার দিকে লক্ষ্য করল বন্ড। প্রতিপক্ষের বন্দুক যে এখানেই থাকবে সে বিষয়ে তার কোন সন্দেহ নেই। নিচের রাস্তায় ভিড় হয়ে গেছে। ফুটপাথ ধরে দরজার দিকে এগিয়ে আসছে সেই মেয়ে অর্কেস্টার দল–হাস্যময়ী কুড়িটা মেয়ে, হাতে তাদের বেহালার বাক্স, চারজনের হাতে ড্রাম। বন্ড ভাবতে লাগল রাশিয়ান এলাকায় এখনও তবে কেউ কেউ আছে, যারা জীবনের সহজ আনন্দটুকু একেবারে ভুলে যায়নি। ভাবতে ভাবতে লেন্স এর সামনে এসে পড়ল যে মেয়েটি সে দীর্ঘাঙ্গিনী। অপূর্ব লীলায়িত ভঙ্গিমায় ত্রস্ত চরণে এগিয়ে চলেছে মেয়েটি, তার সুঠাম চরণের গতির ছন্দে পাখির ডানার স্পন্দন। দলের সঙ্গে মিশে যখন দরজায় ঢুকছে তখন পাশ ফিরতেই আকল্যাম্পের আলোয় তার মিষ্টি শুভ্র মুখখানি চকিতের মত একবার দেখতে পেল বন্ড। তার বুকের মধ্যে একটা সুতীব্র যন্ত্রণা টনটনিয়ে উঠতে লাগল। জৈবিক আকর্ষণে রোমাঞ্চিত হল সে। গম্ভীর হতাশায় হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বন্ড দেখল পাঁচটা পঞ্চাশ বাজে। আর দশ মিনিট। মেয়েটির কথা মন থেকে প্রাণপনে সরিয়ে রাখতে চাইল।
মিনিস্ট্রি ভবনের ভিতর কোথা থেকে যেন যন্ত্র বাধার পরিচিত শব্দ কানে এল। একটু নীরবতা, তারপর সমবেত বাজনার ঐকতানের ঝঙ্কার। ছ টা বাজল। বন্ড সূক্ষ্মভাবে স্নাইপারস্কোপের ফোকাশ করল চারটে জানলার ডান দিকের নিচেরটাতে। অন্ধকারের কন্দরের মধ্যে নড়াচড়ার আভাস মিলছে। এবার ভিতর থেকে একটা কালো জিনিস বাইরে বেরিয়ে এসেছে। একটা অস্ত্র ধীর গতিতে ওপর থেকে নিচে, এপাশ থেকে ওপাশে সঞ্চালিত হতে চলেছে। অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য মানুষটি বোধহয় নিশ্চিন্ত হয়েছে। অস্ত্রটা আর নড়ছে না, স্থির হয়ে গেছে। খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করতে নজরে পড়ল নলের মাথায় বসানো ফ্ল্যাশ এলিমিনেটর, টেলিস্কোপ আর নিচের দিকে ঝুলে থাকা গুলির ম্যাগাজিন–ওদের সবচেয়ে সেরা অস্ত্র।
কাটা কাটা জবাব দিল, কালাশনিকভ। সাব মেশিনগান, গ্যাসে চলে। 7.62মিলিমিটারের তিরিশটা গুলি ভরা যায়। একেবারে ঝাঁঝরা করে ছাড়বে। খুব তাড়াতাড়ি ওকে যদি সামলাতে না পারি তবে 272 শুধু মরবে না একেবারে কিমা হয়ে যাবে। আপনি নজর রাখুন ঐ পোড়ো জমির মধ্যে কোনও নড়াচড়ার আভাস পান কি না। গুলি ছোড়বার সময় ওকে ধরা দিতেই হবে। বন্দুকের দিক থেকে চোখ তুলবার উপায় নেই আমার। আরও কেউ হয়ত পেছন থেকে নজর রাখছে। যে রকম ধারণা করেছিলাম অনেকটা সেইরকম ব্যাপার।
মুখোশের ভেতর বন্ডের মুখটা ঘামে জবজব করছে। মিনিটের পর মিনিট পার হয়ে আর বন্ডের চোখ টনটনিয়ে উঠতে থাকে। পাশ থেকে ক্যাপ্টেন সেন্ডারের গলা শোনা যেতে লাগল, সাতটা পাঁচিলের ওদিকে কোন নড়াচড়ার আভাস নেই।
KGB-র সাব মেশিনগানটা যখন আস্তে আস্তে পিছনের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল তখন সাড়ে সাতটা। যাক, আজকের মত শান্তি। 272 এখনও আত্মপ্রকাশ করেনি। আরও দু রাত্রি এই যন্ত্রণা রয়েছে কপালে। পর্দার তলাটা কাঁধের ওপর দিয়ে টেনে এনে উইঞ্চেস্টারের নলের সামনে ফেলে দিল বন্ড। মুখোশ খুলে গোসল খানায় গিয়ে ঢুকল। গোসল সেরে বরফ দিয়ে হুইস্কি গিলল পরপর দু পাত্তর। কান দুটো তার খাড়া হয়ে আছে অর্কেস্ট্রার শব্দ কখন থামে তার জন্য। মেয়েটির কথা সে ভুলতে পারছে না।
পরের দিন সন্ধ্যেয় সেই পুনরাবৃত্তি, ব্যতিক্রম খুব সামান্য। তৃতীয় দিন বন্ড সকাল দুপুর শুধু চুটিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে। মনের পর্দা জুড়ে বার বার ভেসে উঠেছে অন্য সব ছবি–সেই মেয়ে, সেই চারটে কাল জানালা, সেই অজানা মানুষ, আজ রাত্রিতে যাকে মারতেই হবে।
পাঁচটার সময় বন্ড ফিরে এল। গলায় হুইকি ঢেলে গল্পের বই হাতে বিছানায় শুয়ে পড়ল। হুইস্কির দৌলতে তার স্নায়ুগুলো বেশ ঢিলে হতে শুরু করেছে।
তখন ঠিক ছ টা বেজে পাঁচ। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেন সেভার উত্তেজিত চাপা গলায় বলে উঠলেন, ঐ ওদিকে কি যেন নড়ে উঠল, বন্ড! ঐ জায়গাটায় খানিকটা ভাঙা পাঁচিল আছে। ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসছে। আর মাত্র পঞ্চাশ গজ বাকি। যে কোন মুহূর্তে রাস্তা পার হবার জন্য দৌড়তে শুরু করবে।
বন্ড বুঝতে পারল তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। সে এক মুহূর্তের জন্য ট্রিগার থেকে হাত সরাল। প্যান্টের গায়ে মুছে নিয়ে আবার যথাস্থানে আঙুল ঢোকাল মাইক্রোফোনে সাঙ্কেতিক নির্দেশ শুনতে পেল বন্ড, নিচের রাস্তায় ওপেল গাড়ির ইঞ্জিন চালু করার শব্দ কানে এল। চালু ইঞ্জিনের গুঞ্জনকে ছাপিয়ে উঠে এক্সসট পাইপ থেকে কান ফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ বের হতে লাগল পর পর, আর সঙ্গে সঙ্গে বন্ডের গাড়ির গতি হয়ে উঠল দ্রুততর।
