– ফোর্ট নকস।
চারদিকে সমবেত কণ্ঠে হতাশ গোঙানি শোনা গেল। মিঃ মিডনাইট নিরাশ কণ্ঠে বললেন, এসব ব্যাপার হলিউডের বাইরে চলে না, যেখানে নানা লোকে বিচিত্র আকাশ কুসুম কল্পনা করলেও কেউ কিছু মনে করে না। কিন্তু আপনার দরকার ডাক্তার দেখান বা পাগলা গারদে যাওয়া। ক্ষোভে মাথা নাড়ালেন মিঃ মিডনাইট, অল্প এক বিলিয়ন ডলার পকেটে আসবে ভেবে আনন্দ হয়েছিল।
মিস পুসি গ্যালোর বিরক্ত গলায় বলল, আমি দুঃখিত মিস্টার, অতবড় কাঁচে নাক গলানোর সামর্থ্য আমার দলের নেই। চেয়ার থেকে উঠেই পড়ল সে।
গোল্ডফিংগার স্মিতভাবে বললেন, আপনারা আগে শান্ত হয়ে সবকথা শুনুন। আপনাদের এই প্রতিক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক। আমার মতে ফোর্ট নম্স যে কোন ব্যাংকের মতই একটা ব্যাংক। কিন্তু আকারে অত্যন্ত বড় এবং সেই সঙ্গে এটিকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাগুলিও শক্ত ও অভিনব। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে হলে চাই সমপরিমাণ, শক্তি ও বুদ্ধি বল। আমার এই মতলবের বৈশিষ্ট্য-এর বিশালতা আর কিছু নয়। অন্য যে কোন দুর্গের মত ফোর্ট নও ভেদ করা সম্ভব। ব্রিংক কোম্পানির টাকা চালান দেওয়ার গাড়িগুলোকে লোকে এক সময় দুর্ভেদ্য মনে করত। কিন্তু ১৯৫০ সালে মাত্র আধ ডজন দুঃসাহসী লোক এই কোম্পানির একটি আনায়ড কার থেকে দশ লাখ ডলার লুঠ করে নিয়ে সে ধারণা ভুল প্রমাণ করেছিল। আমেরিকার সিং সিং জেল থেকে পালানো অসম্ভব হলেও অজস্র বন্দী মাথা খাটিয়ে ঐ জেল থেকে পালাতে পেরেছে। না না বন্ধুগণ, অন্যান্য অনেক ভুয়া বিশ্বাসের মত ফোর্ট নকসের দূর্ভেদ্যতাও সম্পূর্ণ অলীক ধারণা। এবার আমি আমার প্ল্যানের বিবরণ দেব কি?
বিলি রিং কথা বললে তার কাটা ঠোঁটের দরুন শিসের মত শব্দ হয়। রুক্ষস্বরে বললেন তিনি, শুনুন, আপনার বোধহয় জানা নেই যে আমেরিকান সৈন্যবাহিনীর থার্ড আর্মার্ড ডিভিশনের ঘটি হচ্ছে ফোর্ট নস। এটাও যদি অলীক হয় তবে আমার কিছু বলার নেই।
মৃদু হাসলেন গোল্ডফিংগার, আপনার বক্তব্য একটুও খাটো না করে সামান্য শুধরে নিতে হচ্ছে মিঃ রিং। ফোর্ট নকসে কেবল থার্ড আর্মার্ড ডিভিশন নেই তা ছাড়াও ষষ্ঠ আর্মার্ড ক্যাভালরী রেজিমেন্ট, পঞ্চদশ আর্মার গ্রুপ, একশ ষাট নং ইঞ্জিনিয়ার গ্রুপ এবং আমেরিকান সৈন্যবাহিনীর প্রতি বিভাগ থেকে বাছাই করা আধ ডিভিশন সৈন্যও বর্তমানে সেখানে রয়েছে। এর ওপরেও আছে বিশ জন অফিসার ও চারশ পুলিশের একটি পুরোদস্তুর বাহিনী। সব মিলিয়ে ফোট নকস ওর ৬০ হাজার বাসিন্দার ২০ হাজার জনই হল সৈন্য অথবা পুলিশ বাহিনীর সুশিক্ষিত প্রহরী।
-আচ্ছা? আর এদেরকে বুঝি আপনি উড়িয়ে দেবেন? বিদ্রূপ করলেন মিঃ স্ট্র্যাপ। উত্তরের অপেক্ষা না করে বিতৃষ্ণ ভঙ্গিতে মুখের সিগার উড়িয়ে দিলেন ছাইদানীর মধ্যে।
তাঁর পাশে বসা পুসি গ্যালোর তীব্র বিরক্তির আওয়াজ করল। সে বলল, তুমি বরং গিয়ে ভদ্র গোছের একটা সিগার কিনে আন জ্যাকো। এই হতচ্ছাড়া জিনিসটা থেকে ঘেমো কাপড় পোড়ার গন্ধ বের হচ্ছে।
চেপে যাও পুস মিঃ স্ট্র্যাপ অভদ্রভাবে বলে উঠলেন। প্রত্যুত্তরে এমন এক জবাব দিলেন পুস যে চারপাশে হাসির রোল উঠল। গোল্ডফিংগার টেবিলে টোকা মেরে শান্ত হতে ইঙ্গিত করলেন। শান্তভাবে বললেন, এবার দয়া করে পুরো প্ল্যানটা শুনুন। ব্ল্যাক বোর্ডের কাছে এগিয়ে গিয়ে তার ওপরে এক মানচিত্র মেলে দিলেন। ফোর্ট ন ঘিরে যে ছোট শহরটি রয়েছে তারই মানচিত্র।
গোল্ডফিংগার বললেন, এবার বন্ধুগণ-আমি আপনাদের এই শহরতলীর বিশেষ কয়েকটি জায়গা চিনিয়ে দিচ্ছি। এইখানে শহরের ভেতর দিয়ে চলে গেছে ইলিনয় সেন্ট্রাল রেলওয়ে।–পঁয়ত্রিশ মাইল উত্তরে লুইভিল থেকে আঠার মাইল দক্ষিণে এলিজাবেথভিল পর্যন্ত স্বর্ণ কোষাগারের কাছাকাছি এই রেললাইনের একটা জটিল সাইডিং আছে। ওয়াশিংটনের কোষাগার থেকে আসা যাবতীয় সোনা এইখানেই নামানো হয়। এছাড়া ডিকিস রাজপথ বেয়ে ট্রাক মারফৎ বা নিকটবর্তী গডম্যান সামরিক এয়ারপোর্টে মালবাহী প্লেনে করে সোনা পাঠানো হয়।
মানচিত্রে দেখতে পাচ্ছেন, আসল কোষাগারটি প্রায় পঞ্চাশ একর ঘাসজমির কেন্দ্র স্থলে রয়েছে। কোষাগারে পৌঁছানোর রাস্তা মাত্র একটি। ঐ ঘাসজুমির সীমানা বরাবর যে রাস্তা আছে, সেখান থেকে এই পঞ্চাশ গজ লম্বা পথটি গেছে অনেক সুরক্ষিত গেটের ভিতর দিয়ে, কোষাগারের সামানের দরজা পর্যন্ত। গেটগুলো পার হয়েও চক্রাকারে রাস্তা আছে, স্বর্ণবাহী ট্রাকগুলোকে এই রাস্তা ধরে যেতে হয় কোষাগারের পেছনের গেটে, যেখানে সোনা নামান হয়।
বন্ধুগণ; কোষাগার বেষ্টন করে এই চক্রাকার রাস্তা আগাগোড়া পাখনার মত ইস্পাতের পাতে তৈরি। বিপদের আশঙ্কা দেখলেই হাইড্রলিকের সাহায্যে এই গোটা রাস্তাটিকে উঁচু করে ইস্পাতের প্রাচীরে পরিণত করা হয়। এছাড়া বাইরে থেকে দেখা না গেলেও একটা সুড়ঙ্গপথ আছে।
গোল্ডফিংগার থামলেন। মানচিত্রের কাছ থেকে সরে এসে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই গেল আশেপাশের বর্ণনা। কোষাগারের সামনের দিকের গেটের পেছনে কেবল রিসেপশন হল ও অফিসঘর ছাড়া কিছু নেই। আসল ভাড়ার হচ্ছে বাড়ির পেছনদিকে। আপনাদের কিছু প্রশ্ন আছে?
কেউ কিছু বললেন না, সকলেই মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে। তারা বুঝতে পারছেন ফোর্ট নক্স সম্পর্কে যেটুকু তথ্য বাইরের লোকেরা জানে তার থেকেও বেশি জানেন এ ভদ্রলোক।
