টেবিলের নিচে মৃদু শব্দ শোনা যেতে পোল্ডফিংগার সোজা হয়ে বসলেন, ঘরের ও প্রান্তের দরজা খুলে পাঁচজন লোক ঢুকল। উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, আমার না গোল্ড। আপনারা আসন গ্রহণ করুন দয়া করে।
পাঁচজনে নিঃশব্দে টেবিলের চারপাশে চেয়ার টেনে নিলেন। চোখ চলে গেল গোল্ডফিংগারের দিকে। গোল্ডফিংগার বসে শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, ভদ্রমহোদয়গণ আপনাদের প্রত্যেকের সামনে প্যাকেটে একটি করে সোনার বাট রাখা আছে। প্রতিটির দাম পনের হাজার ডলার। আপনারা যে দয়া করে এ সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছেন সে জন্য অজস্র ধন্যবাদ। মিস গ্যালোর এখনো এসে পৌঁছায়নি, তার জন্য আমরা অপেক্ষা করব। তার মধ্যে আমার দুই সেক্রেটারি মিঃ বন্ড ও মিস মাস্টারটনের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই। এই সম্মেলনের সমস্ত কথাবার্তা সম্পূর্ণ গোপন থাকবে আরো নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে এ ঘরে লুকোনো মাইক্রোফোন নেই। আচ্ছা, এবার …মিঃ বন্ড তোমার ডানদিকে বসেছেন ছায়া সংঘের প্রধান মিঃ জেড মিডনাইট। এদের কর্মক্ষেত্র মায়ামি ও হাভানায় বিস্তৃত।
মিঃ মিডনাইট বিশাল আকৃতির। মানুষটির মুখ দেখে আমুদে বলে মনে হলেও চোখজোড়া রীতিমত শান্ত ও সতর্ক। পরনে হালকা নীল রঙের ট্রপিকাল সুট। হাতে একটা সোনার ঘড়ি, মাপা হাসি হেসে বন্ডকে অভিবাদন জানালেন তিনি।
তার পরে বসেছেন মিঃ বিলি রিং। বিখ্যাত যন্ত্ররাজ দলের পরিচালক।
বিলি রিং বন্ডের দিকে মুখ ফেরালেন। এমন বীভৎস মুখ দুঃস্বপ্নেও কম দেখা যায়। মিঃ রিং সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বন্ডের প্রতিক্রিয়া বুঝতে চেষ্টা করল। মিঃ রিং-এর দস্যু জীবনের প্রথমে কেউ নিচের ঠোঁট কেটে উড়িয়ে দিয়েছিল অতিরিক্ত কথা বলার জন্যই। ফলে তার একপাটি দাঁত সর্বক্ষণ বিকশিত হয়ে থাকে। দৃশ্যটা নিতান্তই ভয়াবহ। ভদ্রলোকের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। বন্ড আন্দাজে বুঝল ইনি একজন নিষ্ঠুর হত্যাকারী। তীক্ষ্ণ-কটাক্ষের জবাবে বন্ড হেসে তাকাল পরের লোকটির দিকে। গোল্ডফিংগার জানালেন, ইনি হচ্ছেন ডেট্রয়েটের রক্ত সংঘের সর্দার মিঃ হেলমুট স্প্রিংগার।
মিঃ স্প্রিংগারের ঘষা কাঁচের মত চোখের দৃষ্টি দেখে মনে হল–হয় অত্যন্ত ধনী নয়ত নিষ্প্রাণ। ঘোলাটে বলের মত। দুই চোখের মণি মুহূর্তের জন্য বন্ডের দিকে স্থির হল। মিঃ স্প্রিং গার-এর নিখুঁত সাজ পোশাক ও আবরণে এমন এক সম্ভ্রান্ত ভাব ফুটে বেরোচ্ছে যে মনে হল তিনি অন্য জায়গায় এসে পড়েছেন–যেন প্রথম শ্রেণীর যাত্রী ঢুকে পড়েছে তৃতীয় শ্রেণীর কামরায়, অথবা ব্যালকনির খদ্দেরকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে দশ আনার সীটে।
–এর পরে বসেছেন মাফিয়া-র মিঃ শোলো।
মিঃ শোলোর শ্যামল রঙের ভারি মুখ বিপ্ন দেখাল। আজ পর্যন্ত যে অজস্র অপরাধ ও পাপকর্ম তিনি করেছেন, তারাই একে একে তার মুখে এই চিরস্থায়ী বিষাদের ছাপ এঁকে দিয়েছে। মোটা চমশার ওপারে থেকে তাঁর দুই চোখ ক্ষণিকের জন্য বন্ডের দিকে ফিরল। তারপর আবার ছুরি দিয়ে নখ পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বিশাল ভারি চেহারার মানুষ হলেও কোন বলে বলীয়ান, দৈহিক না মানসিক ঠিক বোঝা গেল না। তবে মাফিয়া হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ দস্যু সংস্থা। ইনি যখন সেই দলের একচ্ছত্র অধিপতি, তখন মানুষটি যে অতিশয় ভয়ঙ্কর সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
পরবর্তী প্রতিনিধি হলেন লাম ভেগাসের উজ্জ্বল সংঘ দলের প্রধান জ্যাক স্ট্র্যাপ। বছর পঞ্চাশ হবে, ইনিও মোটাসোটা, পরনে জমকালো পোশাক, মুখে সিগার। মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে কার্পেটে থুথু করে সিগারের কুচি ফেলছেন এমন করে, যেন মনে হয় ধূমপান না করে চিবোচ্ছেন।
ঘরের পেছনের দরজা খুলে গেল। কালো পুরুষালী সুট পরা একটি মেয়ে ঘরে ঢুকল, এগিয়ে এসে দাঁড়াল খালি চেয়ারের পিছনে। গোল্ডফিংগার উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। মেয়েটি তাকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে, টেবিলের সবাইয়ের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর সবার উদ্দেশ্যে ক্লান্ত ভঙ্গিতে এক টুকরো অভিবাদন ধ্বনি শুনিয়ে বসে। পড়ল। মিঃ স্ট্র্যাপ বললেন, কেমন আছ পুসি? অন্যরাও সংক্ষিপ্ত অভিবাদন জানালেন কিন্তু মিঃ স্প্রিংগার শুধু মাথা নোয়ালেন।
গোল্ডফিংগার বললেন, গুড আফটারনুন মিস গ্যালোর। আমরা পরিচয় পর্ব সেরে নিয়েছি। আজকের সম্মেলনের বিষয়সূচি আপনাদের সামনে আছে আর সেই সঙ্গে পনের হাজার ডলার মূল্যের সোনার বাট। এখানে যোগ দেবার জন্য যে খরচ এবং অসুবিধা ভোগ করতে হয়েছে, তা পূরণ করবার জন্যই এটা দেওয়া হচ্ছে উপহার হিসেবে।
মিস গ্যালোর প্যাকেট থেকে সোনা বার করে হাতে নিয়ে সন্দিগ্ধ চোখ গোল্ডফিংগারের দিকে তাকিয়ে বললেন, নিরেট সোনা?
-হ্যাঁ নিরেট সোনা।
মিস গ্যালোর কিছুক্ষণ চোখে চোখ রেখে পাকা খদ্দের এর মত বলল, প্রশ্নটার জন্য কিছু মনে করবেন না যেন।
মেয়েটিকে বন্ডের ভাল লাগল। মেয়েটির প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করল সে। উপস্থিত সব পুরুষের প্রতি অনমনীয় মেজাজ দেখে বন্ড খুশি হল। মেয়েটি যেন নিঃশব্দে বলতে চাইছে, পুরুষ মাত্রই বজ্জাত ও জোচ্চোর। তোমরা আমার সঙ্গে কোনরকম প্যাঁচ কষলে ফল ভাল হবে না, আমি অন্য জাতের মেয়ে।
