বন্ড নিরুত্তাপ গলায় বলল, লক্ষপতি হওয়ার ইচ্ছে আমার অনেক দিনের।
গোল্ডফিংগার তার দিকে তাকালেন না। একবার হাতের দিকে তাকিয়ে বন্ডের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
বন্ড বসে বসে খানিকক্ষণ দরজার দিকে চেয়ে রইল তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে, পাকা ঘরের উদ্দেশ্যে জোরে বটে বটে বলে বেরিয়ে গেল। ঘর থেকে বাথরুমের ভেতর দিয়ে মেয়েটার শোবার ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা দিল।
-কে?
আমি। আসতে পারি?
–হ্যাঁ এস। নিরুৎসুক গলা মনে হল।
খাটের পাশে বসে জুতা পরছিল মেয়েটা। প্রথম দিনের পোশাক তার গায়ে। বেশ ঠাণ্ডা দেখাচ্ছে তাকে, নতুন পরিবেশে এসে একটুও বিচলিত নয়। নিস্পৃহ বিতৃষ্ণায় ভরা চোখে, ঠাণ্ডা গলায় বলল, তোমারই জন্য এই ফ্যাসাদে পড়তে হয়েছে।
-হ্যাঁ, কিন্তু আর আগে কবরে ঢোকবার ব্যবস্থাটাও তুমিই করেছিলে।
বন্ড এক দৃষ্টে মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল মেয়েটাকে পিটুনি লাগাতে। কিন্তু না এখনো কিছু মেয়েটা খায়নি, এখন মারলে অভদ্রতা হবে। বন্ড বলল, এসব তর্কাতর্কি করে কোন লাভ নেই, ইচ্ছে করেই হোক আর অনিচ্ছাতেই হোক আমরা এক প্যাঁচে জড়িয়ে পড়েছি। কি খাবে বল, এখন সোয়া বারটা বাজে, আমার খাওয়া হয়ে গেছে। আগে তোমার খাবার আনতে বলে দিই তারপর তোমাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলব। এখানে বেরনোর একটা মাত্র দরজা আছে। ওই কোরিয়ান হনুমানটা যেটা পাহারা দিচ্ছে। এখন বল কি খাওয়ার ইচ্ছা।
এবার মেয়েটা একটু নরম হল, বলল, ধন্যবাদ। স্ক্যামবড় এগ আর কফি দিতে বল। সঙ্গে টোস্ট আর মামলেট।
বন্ড নিজের ঘরে গিয়ে দরজায় টোকা দিল। ইঞ্চি খানেক খুলে অডজব মুখ বাড়াল।
বন্ড বলল, ভয় পেয়ো না অডজব। আপাতত আমি তোমাকে খুন করছি না।
দরজাটা আরেকটু খুলতে বন্ড খাবারের অর্ডার দিল। নিজের ঘরে এসে বুর্বো পান করতে করতে ভাবতে লাগল মেয়েটাকে কি করে বাগে আনা যায়। প্রথম থেকেই মেয়েটা তাকে বিরাগের দৃষ্টিতে দেখছে। সেকি বোনের অকালমৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করছে। গোল্ডফিংগার মেয়েটির সম্বন্ধে অমন মন্তব্য করলেন কেন? মেয়েটিকে তার নিজেরও কেমন যেন অস্বাভাবিক লেগেছে। অনীহা, বিদ্বেষ দুটোই বড় বেশি বন্ডের প্রতি। সুন্দরী, দৈহিক আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও ভেতর ভেতর এক কঠোরতা আছে বন্ড যা বুঝতে পারেনি ব্যাখ্যাও করতে পারেনি।…চুলোয় যাক ওসব। এখন মেয়েটার সঙ্গে ভাব না জমালে বন্দী জীবন অসহ্য হয়ে উঠবে।
বন্ড মেয়েটার ঘরে গেল, দরজা দুটো খুলে রাখল যাতে তৃতীয় কোন ব্যক্তি ঢুকলে সে সাড়া পায়। মেয়েটা এখনো খাটের পাশে বসে আছে। সতর্ক দৃষ্টিতে একবার বন্ডের দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে চোখ রেখে বন্ড গ্লাসে চুমুক দিল। বলল, তোমায় জানান উচিত যে আমি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের লোক। গুপ্তচর বিভাগ না বলে কথাটা হালকাভাবে বলল, আমার সহকর্মীরা নিশ্চয় এতক্ষণে গোল্ডফিংগারের পিছু নিয়েছে। কিন্তু সেজন্য সে একটুও ব্যস্ত নয়। ওর ধারণা, অন্তত এক সপ্তাহ র মধ্যে কেউ ওর খোঁজ পাবে না। কথাটা বোধহয় মিথ্যে নয়। ও আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, কারণ ও চায় একটা ডাকাতির ব্যাপারে আমরা ওকে সাহায্য করি। ডাকাতিটা খুব বড় জাতের। এতে অনেক কাগজ কলমের কাজ আছে, সে সবের দায়িত্ব নিতে হবে। তুমি শর্টহ্যান্ড আর টাইপরাইটিং জান তো?
-জানি, উজ্জ্বল চোখে জিজ্ঞাসা করল, কিসের ডাকাতি?
বন্ড তাকে সব বৃত্তান্ত জানাল। তারপর বলল, অবশ্য গোটা ব্যাপারটাই হাস্যকর। আমার বিশ্বাস যে ক জন দস্যু আজকের সম্মেলনে আসছে তারাও দু একটা প্রশ্ন করলেই বুঝে যাবে ব্যাপারটা অসম্ভব। সঠিক বলা যায় না, যতদূর জানি গোন্ডফিংগার সব দিক বিচার না করে কোন কাজে হাত দেয় না। আর ওর মাথায় গোলমাল আছে বলে মনেও হয় না। বিশেষ করে অপরাধ জাতের সমস্ত কিছু তার নখদর্পনে। লোকটার যে অসামান্য প্রতিভা সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
-এখন তাহলে তুমি কি করবে?
বন্ড গলা নামিয়ে বলল, আমি নয় আমরা। দু জনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আর ওর অধীনে কাজ করার সময় একটুও ফাঁকি দেওয়া বা গণ্ডগোল করা চলবে না। ভান করতে হবে যে আমরা টাকার অংক শুনে লোভী হয়েছি। প্রতিদানে ভাল কাজ করে খুশি করতে চেষ্টা করছি। এতে অন্তত কয়েকদিনের জন্য প্রাণ বাঁচবে, আর ওর মতলব বানচাল করার সুযোগ পাব আমি।
-কি করে?
–এখনো পর্যন্ত কোন উপায় বার করতে পারিনি। তবে কিছু না কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।
এবং আমি তোমায় সাহায্য করি?
–কেন নয়? আর তো উপায় নেই।
মেয়েটা ঠোঁট সরু করে উত্তর দিল, আমি তোমার কথামত চলব ভাবলে কি করে?
বন্ড দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার কথামত না চললে তুমিই মারা পড়বে। এ নিয়ে ঝগড়া না করে তুমি ভেবে। দেখ!
কাঁধ ঝাঁকিয়ে, মুখে বিতৃষ্ণা ফুটিয়ে বলে উঠল, ঠিক আছে তাহলে। পরক্ষণেই বন্ডের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, কিন্তু আমার গায়ে হাত দেবার চেষ্টা কর না, খুন করে ফেলব।
শোবার ঘরের দরজায় ক্লিক করে শব্দ হল। বন্ড টিলি মাস্টারটনকে বলল, চ্যালেঞ্জটা লোভনীয়, কিন্তু এ চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করছি না। বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
কোরিয়ানদের একজন খাবারের ট্রে নিয়ে তার পাশ দিয়ে মেয়েটার ঘরে ঢুকল। অপরজন বন্ডের ঘরে একটা ডেস্ক ও একটা পোর্টেবল রেমিংটন টাইপরাইটার রেখে গেল। অডজব-এর হাতে একটা কাগজ, বন্ড সেটা নিয়ে নিল।
