কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা আমি ভালবাসি সেই বিশাল ক্ষমতাকে যা একমাত্র সোনাই দিতে পারে। যে ক্ষমতা মন্ত্রের মত কাজ করে, যার সাহায্যে প্রতিটি মানুষের ইচ্ছে, খেয়াল চরিতার্থ করা যায় এমন কি যখন ইচ্ছে লোকেদের দেহ, মন এমন কি আত্মা পর্যন্ত কিনে নেওয়া যায়। হ্যাঁ মিঃ বন্ড, জীবনে আমি সোনা সংগ্রহের জন্য কাজ করেছি প্রতিদানে সোনাও আমায় কাজ দিয়েছে।
তুমিই বল পৃথিবীর অন্য কোন বস্তু কি তার মালিককে এতটা প্রতিদান দিতে পারে?
–এক ছটাক সোনার মালিক না হয়েও অনেকে ধনী ও ক্ষমতাশালী হয়েছ। তা এ পর্যন্ত কতটা সোনা সংগ্রহ করেছ আর তা দিয়ে কি কর তুমি?
–আমার কাছে এখন দু কোটি পাউন্ড (ছত্রিশ কোটি) মূল্যের সোনা আছে। একটি ছোট দেশের ভাঁড়ারে যতটা থাকা উচিত। সমস্তটাই নিউইয়র্কে আনা হয়েছে; যেখানে দরকার সেখানে আবার সোনার স্তূপ নিয়ে আসি আমি। এবার আমার স্বর্ণভাণ্ডারের সাহায্যে আমেরিকায় একটা বড় কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। সেই জন্যই সোনার বাটগুলো আনা হয়েছে।
-কি সেই কাজ? এর মধ্যে আমাদের ভূমিকাটি কোথায়?
–এইটে আমার সর্বশেষ কাজ এবং বড়ও বটে। গোল্ডফিংগারের চোখ দুটো এখন নির্লিপ্ত, আত্মসমাহিত, গলায় অবনত স্বর। বলল, মানুষ এভারেস্টে চড়েছে, মহাসমুদ্রের অতলে নেমেছে, মহাশূন্যে রকেট পাঠিয়েছে, পরমাণুকে বিভক্ত করেছে। মানবসভ্যতার সব ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হয়েছে, প্রতি ব্যাপারেই আশ্চর্য সব রেকর্ড হয়েছে; অলৌকিক কে লৌকিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে; কিন্তু মানুষের বিশেষ কর্ণধারা বড় বেশি অবহেলিত হয়েছে মিঃ বন্ড। এই বিভাগকে সাধারণত বলা হয়ে থাকে অপরাধ।
যে সব অপরাধ সাধারণত ঘটে থাকে তা হল–ব্যাংক ডাকাতি, জুয়াচুরি, জালিয়াতি ইত্যাদি। এগুলো এতই নগণ্য, যে জেনেও কষ্ট হয় অথচ এখান থেকে মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে পৃথিবীর সব থেকে বড় অপরাধ হাসিল করার সুযোগ রয়েছে। নাট্যমঞ্চ তৈরি, পুরস্কারটাও বিশাল, শুধু অভিনেতারাই অনুপস্থিত।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাটকের পরিচালক এসে পৌঁছেছে মিঃ বন্ড, গোল্ডফিংগার নিজের বুকে টোকা মারলেন এবং সে নিজেই নিজের ভূমিকা বেছে নিয়েছে। আজ দুপুরে প্রধান অভিনেতাদের কাছে নাটকটি পড়ে শোনান হবে। তারপর রিহার্সাল শুরু হবে। আর এক সপ্তাহ পরে মঞ্চের পর্দা টেনে, সেই এক এবং অদ্বিতীয় অভিনয়ের জন্য তারপর শুরু হবে অভিনন্দনের বন্যা–মানব ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অপরাধের জন্য অভিনন্দন। মিঃ বন্ড শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেলেও অভিনন্দনের রেশ পৃথিবীর বুক থেকে মিলিয়ে যাবে না।
গোল্ডফিংগারের বড় বড় চোখে আগুন জ্বলছে, লাল হয়ে উঠেছে দুই গাল। কিন্তু এখনও তাকে শান্ত ও নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে। বন্ড মনে মনে বলল কোনরকম উন্মত্ততা বা কল্পনাবিলাসের লক্ষণ নেই ভদ্রলোকের মধ্যে। গোল্ডফিংগার। কোন এক ষড়যন্ত্রের খসড়া তৈরি করেছেন, আর শুধু তা নয় তিনি বুঝেছেন ষড়যন্ত্র সফল হবে। বন্ড বলল, ভাল। কথা, কিন্তু ব্যাপারটা কি? আমাদেরই বা কি করতে হবে?
কাজটা একটা ডাকাতি। এ ডাকাতিতে বিরোধিতার আশঙ্কা নেই কিন্তু সাবধানে কাজ হাসিল করতে হবে। অনেক লেখালেখির কাজ আছে, তাছাড়া অন্য কাজও আছে। এসব আমিই করব ভেবেছিলাম কিন্তু এখন এ কাজ তুমিই করবে আর সেক্রেটারি মিস্ মাস্টারটন। এই কাজের জন্যই তোমাদের বাঁচিয়েছি। সুতরাং খানিকটা মাইনে পেয়ে গেছ তোমরা। আমার কাজ ঠিকঠাক শেষ হলে দশ লক্ষ ডলারের সোনা পাবে। মিস মাস্টারটন পাবে পাঁচ লক্ষ ডলার।
বন্ড সোৎসাহে বলল, কথাটা আগে বললেই হত। আমাদের কি কুবেরের ভাণ্ডার লুঠ করতে হবে?
-হ্যাঁ তাই করতে চলেছি। ১০০০ কোটি ডলারের সোনা লুঠ করব আমরা। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত সোনা হয়েছে তার অর্ধেক। আমরা আমেরিকার বৃহত্তম স্বর্ণভাণ্ডার ফোর্ট নক্স লুঠ করব বলে ঠিক করেছি।
.
দস্যু সম্মেলন
বন্ড গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল, ফোর্ট ন! তা দু জন লোক আর একজন মেয়ের পক্ষে কাজটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না কি?
গোল্ডফিংগার অধীরভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, তোমার রসিকতাগুলো এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখ, মিঃ বন্ড, তারপরে যত প্রাণ চায় হেসো। আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ছ টি দস্যুদল থেকে একশ জন নরনারীকে বাছাই করা হবে, অসামরিক কাজে এত সমর্থ অথচ এত সংক্ষিপ্ত কাহিনী আর কখনও হয়েছে কিনা সন্দেহ।
–ভাল কথা। কিন্তু ফোর্ট নক্স-এর স্বর্ণভাণ্ডার প্রহরারত সৈন্যদের সংখ্যা জান?
গোল্ডফিংগার হতাশ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন, দরজায় টোকা মেরে অডজব দেখে নিল আলোচনা শান্তিপূর্ণ ভাবেই এগোচ্ছে। বন্ডকে জিজ্ঞাসা করলেন গোল্ডফিংগার, তোমার নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্ন করবার আছে। আজ দুপুরে আড়াইটার সময় আমাদের যে সম্মেলন হবে তার থেকেই জবাব পেয়ে যাবে। এখন ঠিক বারটা। তুমি ও মিস মাস্টারটনও এতে উপস্থিত থাকবে। সম্মেলনে ঐ ছ টি দলের প্রধানকে আমার প্রস্তাব জানাব। তোমার মনে যে সব প্রশ্ন জাগছে তারাও আমাকে সেই সব প্রশ্ন করতে পারেন, তাতে সন্দেহ নেই। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর তুমিও মাস্টারটন কাজে লেগে পড়বে। যা দরকার চেয়ে নেবে। অডজব তোমাদের দেখাশোনা করবে ও পাহারা দেবে। গোলমাল করার চেষ্টা করলে মৃত্যু অনিবার্য। বাইরে খবর পাঠাবার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই। তোমাদের যখন কাজে লাগিয়েছি তখন পুরোপুরি কাজ চাই। রাজি?
