-আরে আরে! শান্ত হোন। আপনি ভাল আছেন, এটা নিউইয়র্কের আইডলওয়াইল্ড এয়ারপোর্ট। আপনি এখন আমেরিকায়, আর কোন ঝামেলা নেই বুঝেছেন! লোকটি উঠে তার সঙ্গীকে বলল-তাড়াতাড়ি যাও শ্যাম। এ ভদ্রলোক বোধহয় শক্ পেয়েছেন। বন্ডকে বোধহয় তিনি রিফিউজি ভেবেছেন।
-যাচ্ছি যাচ্ছি। উদ্বিগ্ন স্বরে কথা বলতে বলতে দুটি পোক বেরিয়ে গেল।
এবার বন্ড মাথা নেড়ে চারদিক তাকিয়ে দেখল। সাদা রঙ করা একটা ঘর। পাশে একসারি পরিষ্কার বিছানা। তার পাশেই মেঝের ওপর একটা স্ট্রেচার। অনেক কষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল টিলি শুয়ে আছে সেই স্ট্রেচারে। এখনো অজ্ঞান।
কামরার অন্য দিকের দরজা খুলে একজন ডাজ্ঞারও সেই সঙ্গে গোল্ডফিংগার ঢুকলেন। সহজ ভঙ্গিতে বিছানার। কাছে এগিয়ে এলেন। তার পিছনে অডজব। বন্ড শ্রান্ত ভঙ্গিতে চোখ বুজল এই তাহলে ব্যাপার।
স্ট্রেচারের পাশে কয়েকজোড়া পা এসে জড়ো হল। গোল্ডফিংগার সাবধান ভঙ্গিতে বলে চললেন, তা এদের চেহারা দেখে তো ভালই মনে হচ্ছে। কি বল ডাক্তার। পকেটে টাকা থাকার এই এক সুবিধে, বন্ধু-বান্ধব, কর্মচারির অসুখ। করলে ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এদের দুজনেরই নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়েছে। একই সুপ্তাহ? ভাবতে পারছেন। অবশ্য এ জন্য আমি নিজে অনেকটা দায়ী; খুব খাটাচ্ছিলাম ওদের তাই ওদের সারিয়ে তোলার দায়িত্বও আমার।
তাদেরকে জেনিভার সেরা ডাক্তার ডঃ ফোখ দেখে বললেন, এদের দুজনের বিশ্রামের প্রয়োজন অনেকদিনের। ওদেরকে কিছু ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিলেন। আপাতত নিউইয়র্কের হার্কনেস প্যাভিলিয়ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চিকিৎসার জন্য আচ্ছা এবার কয়েকটা নোট হাত বদল হওয়ার শব্দ শোনা গেল সঙ্গে কথাও ভেসে এল, ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে আপনার সাহায্যের জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
-ধন্যবাদ, মিঃ গোল্ডফিংগার, আপনার আর যদি কোন সাহায্যে প্রয়োজন হয়…। আপনার নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স আছে তাই না? ওতেই এদের নিয়ে যাবেন।
বন্ড ডাক্তারের গলার স্বর লক্ষ্য করে তাকাল সেই দিকে। চেহারা বেশ সৌম্য রীমলেস চমশা, মাথায় কদম ছাঁট চুল। বন্ড শান্ত গলায় আন্তরিকতার সঙ্গে বলে উঠল, ডাক্তার আমার এবং এ মেয়েটির কোন অসুখ করেনি। ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা ওর কর্মচারি নই, কোনদিন ছিলামও না। আমি বলছি। আমাদের অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছে। ইমিগ্রেশন বিভাগের বড় কর্তাকে ডাকুন। ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্কে আমার বন্ধু-বান্ধব আছে তারাই আমার কথার সত্যতা প্রমাণ করে দেবে। আপনি দয়া করে আমার কথা বিশ্বাস করুন। বন্ড ডাক্তারের চোখে চোখ রাখল যাতে তিনি তার কথা বিশ্বাস করেন।
ডাক্তার উদ্বিগ্ন চোখে গোল্ডফিংগারের দিকে তাকাল। গোল্ডফিংগার বন্ডকে আড়াল করে একটু মাথা নাড়লেন ইঙ্গিতে, বোঝাতে চাইলেন মাথায় গোলমাল আছে। অসহায় ভঙ্গি করে বললেন, এবার বুঝলেন তো? গত কয়েকদিন ধরে এইরকম প্রলাপ বকছে। ওর স্নায়ুগুলো এলিয়ে গেছে, তার সঙ্গে আবার মাথায় ঢুকেছে সবাই ওর সঙ্গে অত্যাচার করতে চায়। ডাঃ ফোখ বললেন, এ দুটো লক্ষণ সাধারণত একই সঙ্গে দেখা যায়। সেরে উঠতে সময় লাগবে, কিন্তু ওদেরকে ভাল করে তুলবই। এই পরিবেশ সহ্য হচ্ছে না বলেই এমন করছে। আর একটা যদি ঘুমের ইঞ্জেকশন,..
ডাক্তার নিচু হয়ে তার কালো ব্যাগ বার করে সিরিঞ্জ বার করতে করতে বললেন, ঠিকই আন্দাজ করেছেন, তবে হার্কনেস হাসপাতালে যখন নিয়ে যাচ্ছেন তখন আর ভাবনা নেই।
গোল্ডফিংগার বললেন, এ লোকটি আমার সেরা কর্মচারিদের অন্যতম আর ওই এমন ভেঙে পড়বে ভাবতেও পারিনি। ঝুঁকে পড়ে বিদ্রূপ মেশান গলায় বন্ডকে বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে জেমস, স্রেফ আরাম কর আর ঘুমোও। প্লেনে আসার সময় তোমার মাথায় চাপ পড়েছে। আমার ওপর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোও।
বাহুতে স্পিরিট ভেজান তুলোর স্পর্শ পেল বন্ড, হাত-পা ছুঁড়তে চেষ্টা করল, শাপ-শাপান্ত বেরোল মুখ দিয়ে। প্রাণপণে চিৎকার করেও কিছু হল না, সিরিঞ্জের উঁচ ঢুকল তার বাহুতে। ক্রমশ নির্জীব হয়ে আসতে লাগল সে। ডাক্তার হাঁটু মুড়ে বসে ঘাম মুছতে লাগল বন্ডের কপালের।
এবার বন্ডের জ্ঞান ফিরল একটা জানালা বিহীন সৃষ্ট রঙের ঘরে। ছাদের মাঝখানে একটা গোল আলো বসানো। বন্ড দেখল যে বসতে পারছে, মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সহসা মনে হয় তার খিদে ও তেষ্টা পেয়েছে ভীষণ। বন্ড খাট থেকে নেমে শরীর পরীক্ষা করে দেখল ডান বাহুতে সূঁচ ফোঁটানোর দাগ ছাড়া আর কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। মাথার ঘোর কাটাবার জন্য কয়েক পা হাঁটতে তার চোখে পড়ল জাহাজের বাংকের মত এখানেও সেরকম খাটেই ছিল সে, ঘরে আসবাব বলতে কিছু নেই শুধু চেয়ার টেবিল ছাড়া।
হাঁটু গেড়ে বসে খাটের নিচের ড্রয়ারগুলো খুলল, সুটকেসের সব জিনিস এখানে রাখা শুধু ঘড়ি আর পিস্তল বাদে। তার জুতাও আছে। একটা জুতা বার করে গোড়ালি ধরে টান মেরে বার করল, দু ধার ছোরা। অন্য জুতাটার মধ্যেও আছে কিনা দেখে নিয়ে গোড়ালি দুটো যথাস্থানে লাগিয়ে দিল বন্ড। গায়ে কিছু জামাকাপড় পরে, সিগারেট কেস খুঁজে একটা সিগারেট ধরাল।
ঘরের দু দিকে দরজা। একটার হাতল আছে, অন্যটার নেই। হাতলওয়ালা দরজাটা খুলে দেখল একটা ছোট বাথরুম। তার গোসল ও দাড়িকামানোর জিনিসগুলো এখানে রাখা হয়েছে, পাশে কয়েকটা মেয়েলি জিনিসপত্রও রয়েছে। বাথরুমের অন্যদিকে আরেকটা দরজা, সেটা খুলে দেখে তার ঘরের মত আরেকটা ঘর, খাটে শুয়ে আছে টিলি মাস্টারটন। বন্ড কাছে গিয়ে দেখল শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা। বন্ড এবার বাথরুমে গিয়ে নিজের চেহারা দেখে পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
