বন্ড বলল, বোকার মত কাজ কর না, ইউনিভার্সালে আমার বন্ধুরা জানে কোথায় যাচ্ছি কেন যাচ্ছি। মেয়েটির বাবা মা জানেন যে ও আমার সঙ্গে এসেছে। এখানে আসবার আগে তোমার কারখানা সম্পর্কে নানা খোঁজখবরর পেয়েছি। ইউনিভার্সালের প্রতিপত্তি বড় কম নয়, আমরা উধাও হয়ে গেলে পুলিশের পাল্লায় পড়বে তুমি। তার চেয়ে একটা রফা করি। আমাদের ছেড়ে দাও, কাকপক্ষীও টের পাবে না এই কথা। মেয়েটির হয়ে কথা দিচ্ছি আমি, তুমি খুব ভুল করছ।
গোল্ডফিংগার ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল, তুমি বোধহয় ব্যাপারটা এখনও বুঝতে পারনি বন্ড। আমার সম্বন্ধে যা জানলে খুব অল্প জানলে। আমার হাতে বড় কয়েকটা কাজ আছে। এ অবস্থায় তোমাদের ছেড়ে দেওয়া ঝুঁকি এবং হাস্যকর। প্রশ্নই ওঠে না। কেউ যদি তোমাদের খোঁজ করতে আসে সানন্দে তল্লাসী করতে দেব। যারা কথা বলতে পারে তারা মুখ খুলবে না। যে ফার্নেসে তোমাদের দেহ পুড়ে ছাই হবে সেও কথা বলতে জানে না। না বন্ড, তুমি তাড়াতাড়ি মন ঠিক করে নাও। একটা লীভার টানতে চাকাটা প্রতি মিনিটে এক ইঞ্চি করে এগোতে থাকল। ইতিমধ্যে অডজবের দিকে তাকিয়ে একটা আঙ্গুল তুলে ধরলেন তিনি, এর মালিশের কায়দাটা একটু পরখ কর। প্রথম শ্রেণী দিয়ে শুরু করছি।
বন্ড চোখ বুজল। অডজবের জঘন্য বুনো গন্ধ তার নাকে এল। বিরাট খসখসে আঙ্গুলগুলো নিপুণ ভঙ্গিতে কাজ শুরু করল, তার স্নায়ুকেন্দ্র গুলির ওপর সুপরিকল্পিত আঘাত শুরু হল। অমানুষিক যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত লেগে গেল। দাঁতগুলো যেন ভেঙে যাচ্ছে। চোখ যন্ত্রণায় পানি ভরে এসেছে। এদিকে বৈদ্যুতিক করাতের গর্জন জোরাল হয়ে উঠেছে।
মিঃ বন্ড গোন্ডফিংগারের গলায় ব্যগ্রতা ফুটে উঠল, এত সবের কি সত্যিই প্রয়োজন আছে? আসল কথাটা বলে দাও না। কে তুমি? কে পাঠিয়েছে। আমার সম্বন্ধে কি কি জানতে পেরেছে। এটুকু জানলেই যথেষ্ট। তোমাদের দুজনকে দুটো বড়ি খাইয়ে দেব। কোনরকম কষ্ট হবে না। ঘুমের মত অকালমৃত্যু নেমে আসবে। আর কথা না বললে ব্যাপারটা অত্যন্ত নোংরা হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া একজন ইংরেজ ভদ্রলোকের মত কাজ হচ্ছে কি এটা, যে একটা মেয়েকে নিজের দোষের জন্য বীভৎস পরিণামের দিকে পাঠিয়েছ।
আক্রমণ বন্ধ হতে বন্ড চোখ খুলে গোল্ডফিংগারের দিকে তাকিয়ে বলল, আর নতুন কি বলবার আছে, যা বলবার মত ছিল বলে দিয়েছি। আমার আগের প্রস্তাবটা অপছন্দ হলে আরেকটা প্রস্তাব দিচ্ছি। আমরা দু জনেই তোমার অধীনে কাজ করতে রাজি, অবশ্য তুমি যদি রাজি থাক। তুমি আমাদের কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগাতে পার।
-এবং তোমার ধীর সুস্থে আমার পিঠে চুরি মারতে পার, তাই তো? ধন্যবাদ বন্ড আমার দরকার নেই।
বন্ড বুঝল এবার কথাবার্তা থামান দরকার। সবটুকু ইচ্ছাশক্তি জড় করে তুলে দম বন্ধ করতে হবে, যাতে মৃত্যু আসা পর্যন্ত ইচ্ছাশক্তি অটুট ক্ষমতায় নিঃশ্বাস বন্ধ রাখতে পারে। বন্ড দ্রভাবে বলল, তবে তুমি গোল্লায় যাও এবং নিজেকে। নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ বুজল সে।
-ওটাও আমার পক্ষে অসম্ভব। যাইহোক তুমি যখন বাঁকা রাস্তায় যেতে চাইছ তখন সে পথকেই কাঁটায় ভরিয়ে দেব আমি। অডজব দুনম্বর লাগাও সকৌতুকে বললেন গোল্ডফিংগার।
করাতের চাকাটা ক্রমশ উঠে আসছে দুই হাঁটুর মাঝখানে, চাকতির কাপটা অনুভব করল। অডজবের হাত দুটো শরীরের ওপর নামছে।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকার হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে কমে আসছে। আমরা তাড়াতাড়ি হচ্ছে না কেন। শরীরে বেঁচে থাকার প্রবৃত্তিটা যেন ক্রমশই জোরাল হচ্ছে। কিন্তু না, দেহ থেকে নিংড়ে বার করে দিতে হবে সবটুকু অক্সিজেন।
দু পাটি চাপা দাঁতের মধ্যে দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে মর হতভাগা…তুই মর…তুই মর।
.
সর্বশেষ এবং সর্ববৃহৎ
স্বর্গ সম্পর্কে ছেলেবেলায় কত কি শুনেছিল-একরকম উড়ে যাওয়ার অনুভূতি, লক্ষ লক্ষ বীণার গুঞ্জন সবকিছু মিলে যাচ্ছে। স্বর্গেই যখন চলেছে তখন আরও কিছু মনে পড়বে নিশ্চয়। প্রথমে একটি মুক্তোয় মোড়া তোরণ পড়বে…।
একটা গভীর স্বর শুনতে পেল বন্ড, ক্যাপ্টেন কথা বলছি আমরা এবার নামতে চলেছি আপনারা নিজেদের আসনে। বসে বেল্ট বেঁধে নিন, সিগারেট নিভিয়ে ফেলুন। ধন্যবাদ।
তাহলে অনেক লোক স্বর্গে চলেছে। টিলিও আছে নাকি এখানে? বন্ড ভাবল, স্বর্গে গিয়ে তার অজস্র বান্ধবীদেরকে টিলির পরিচয় কি করে দেবে। তাদের থেকে আবার একজনকে বেছে নেওয়ার সমস্যা। ঝামেলার ব্যাপার।
মাথার মধ্যে এইসব চিন্তা নিয়ে আরেকবার জ্ঞান হারাল বন্ড।
পরের বার জ্ঞান ফিরতেই অনুভব করল শরীরে বেশ দুলুনি লাগছে। চোখ খুলতেই সূর্যের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল, চোখ বুজে নিল সে। একটা দরজা সশব্দে খুলে গেল। বন্ডের কনুই কিসে যেন লাগল, আহত কনুইয়ে হাত বোলাতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না।
দেখ কাণ্ড! ওহে স্যাম, তুমি ডাক্তার সাহেবকে ডাক। লোকটির জ্ঞান ফিরে এসেছে।
-ডাকছি এক্ষুণি। নাও অন্য জনের পাশে শুইয়ে দাও একে। বন্ড অনুভব করল জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডা, চোখ খুলতেই দেখল জনৈক আমেরিকানের মুখ, লোকটি হাসল। স্ট্রেচারে করে নিয়ে এসে মেঝেতে নামান হল বন্ডকে। লোকটি জিজ্ঞাসা করল কেমন লাগছে মিস্টার?
–আতঙ্কগ্রস্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করল, আমি কোথায়? সর্বাঙ্গ দিয়ে ঘাম ঝরছে, উঠে বসতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না, তাহলে কি সে বেঁচে আছে। কথাটা মনে হতেই চোখ ফেটে পানি গড়িয়ে পড়ল।
