ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কোরিয়ান লোকটা কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে। তার উর্ধাঙ্গ অনাবৃত হলেও হ্যাটটি যথাস্থানে রয়েছে। লোমহীন শরীরে ঘাম চকচক করছে। বাইসেপ ও দুই বাহু সাধারণ মানুষের উরুর সামন মোটা।
দুটো ইলেট্রিকেল ফার্নেস দেখে বুঝল কারখানার কোন একটা ঘরে তারা রয়েছে। দূরে জেনারেটারের শব্দ আসছে। যে টেবিলের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে সেটার দিকে তাকিয়েই চোখ বন্ধ করে নিল সে। টেবিলটার ঠিক মাঝ বরাবর পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা সরু ফাটল। নিচে ফাটলটার গোড়ায় একটা চক্রাকার বৈদ্যুতিক করাতের দাঁতের সারি। একটা সুইচ টিপলেই নিমেষের মধ্যে বন্ড দু টুকরো হয়ে যাবে।
বন্ড শুয়ে শুয়ে ভালবের ওপরের লেখাটা পড়তে চেষ্টা করল। তখন শান্ত সহজ গলায় গোল্ডফিংগার বললেন, মিঃ বন্ড, ইংরাজির পেন কথাটা এসেছে লাতিন শব্দ পোয়েনা থেকে। পোয়েনা কথার আসল অর্থ কিন্তু শাস্তি –অর্থাৎ অন্যায়ের প্রতিফল। তুমি আমার সঙ্গে অন্যায় করেছ অতিরিক্ত কৌতূহল দেখিয়ে। তাই তার প্রতিফল তোমায় পেতেই হবে।
কৌতূহল যে বন্ধুভাবাপন্ন নয়, তার উল্টোটা, আমার ওপর তোমার দৈহিক আক্রমণ থেকে সেটাই প্রমাণিত হল। অতিরিক্ত কৌতূহল বড় মারাত্মক জিনিস। এক্ষেত্রে তোমাদের দুজনের পক্ষেই সেটা মারাত্মক, কারণ এই মেয়েটিকেও আমি শত্রু হিসেবে দেখি।
মেয়েটি আমায় বলল, সে নাকি বার্গেস হোটেলে উঠেছে কিন্তু টেলিফোনে জানলাম কথাটা মিথ্যা। তোমরা যে জায়গায় লুকিয়েছিলে আমার লোকেরা সেখান থেকে এই রাইফেল আর আংটিটা নিয়ে এসেছে। আংটিটা আমি চিনি, তাই হিপনোটাইজ করতে সত্যি কথা বেরিয়ে এল। ঐ মেয়েটি আমাকে মারবার জন্য এখানে এসেছিল। তোমারও বোধহয় তাই উদ্দেশ্য ছিল। তোমরা দু জনেই ব্যর্থ হলে, এবার সেই ব্যর্থতার মূল্য দেবার পালা। মিঃ বন্ড, আমি একজন অত্যন্ত কৃতী ও বিত্তশালী পুরুষ তাই শত্রুর সংখ্যাও কম নয় যারা আমার ক্ষতি করতে চেষ্টা করেছে, আরেকটি বাণী না শুনিয়ে পারছি না, অর্থের প্রাচুর্য মানুষের বন্ধুর সংখ্যা বৃদ্ধি করে না, বরং আরও বিভিন্ন জাতের ও বিভিন্ন ধরনের শত্রুর সৃষ্টি করে।
-বেশ বলেছ কথা।
বন্ডের টিপ্পনী যেন কানেই গেল না, তিনি বলে চললেন, আজ যদি তুমি মুক্ত হতে তাহলে অনুসন্ধানের ব্যাপারে তোমার দক্ষতা কাজে লাগালে যারা আমার ক্ষতি করতে চেয়েছিল বা কাজে ব্যাঘাত ঘটাবার চেষ্টা করেছিল সেই সব লোকেদের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বার করতে পারতে। এইসব লোকেদের সংখ্যাও কম নয় মিঃ বন্ড। এদের দুরবস্থা দেখলে গাড়ি চাপা পড়া সজারুদের কথা মনে পড়বে।
-উপমাটা বেশ কবিত্বপূর্ণ।
-ওটা হঠাৎ বেরিয়ে গেছে। আমার কাব্য আমি কাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করি, কথা দিয়ে নয়। মায়ামিতে তুমি আমার কাজে বাধা দিলে আর তোমার শাস্তি অন্য জনকে পেতে হল সে ছিল মাস্টারটন। তুমি কপাল জোরে বেঁচে গেছ।
-তোমার কথাগুলো খুবই পরিষ্কার। বড় ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। খয়েরি কমলা রঙের বিশাল যন্ত্রটা সামান্য ঝুঁকে পড়েছে। নির্বিকার মুখে হাত বাড়িয়ে একটা সুইচ অন করে দিতে বন্ডের টেবিলের নিচে একটা ধাতব যন্ত্রের গর্জন শোনা গেল। এটা তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠল। শিসের মত শব্দ করে বৈদ্যুতিক করাত চালু হয়েছে।
বন্ড মুখ ফিরিয়ে নিল, মরতে আর কত দেরি, মৃত্যুকে কোন উপায়ে ত্বরান্বিত করা যায় না? তার এক বন্ধুকে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। সে নিজে কি করে আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছিল তা মনে পড়ল। অমানুষিক ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে দম আটকাতে গিয়ে জ্ঞান হারাল। চেতনা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সব ইচ্ছাশক্তি বিদায় নিয়েছিল তার দেহ থেকে। ততক্ষণই বেঁচে থাকবার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু মৃত্যুই যখন একমাত্র পথ তখন শেষ চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সব বলে। দেওয়ার গ্লানি কোন দিন ভুলতে পারবে না। অবশ্য সে যদি বেঁচে থাকে তবে তাছাড়া যে আশা নেই।
না তার চেয়ে মৃত্যুবরণ করা অনেক ভাল। এরপর যারা গোল্ডফিংগারের পিছু নেবে তাদের ভাল হবে। বন্ড না ফিরলে M কাকে কাজের ভার দেবেন। তাদের ডাবল জিরো বিভাগে মাত্র তিনজন গুপ্তচর কাজ করে–ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন গুপ্তচর, যাদের কাছে নরহত্যার লাইসেন্স রয়েছে, যাদের কাজই হল ব্রিটিশ সরকারে প্রয়োজনে মানুষ খুন করা। বন্ড মারা গেলে 008-কেই নিয়োগ করা হবে। 008 অত্যন্ত পুঁদে মানুষ। M বুঝতে পারবেন যে বন্ড গোল্ডফিংগারের হাতে মারা পড়েছে অতএব 008-কে অনুমতি দেবেন গোল্ডফিংগারকে খুন করার জন্য। জেনিভা স্টেশনের চর ২৫৮ জানাতে পারবে এন্টার প্রাইজেস অরিক সম্পর্কে বন্ড খোঁজ নিচ্ছিল। এই সূত্র ধরে এগিয়ে যাওয়া শক্ত হবে না। গোল্ডফিংগারের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া যাবে মুখ বন্ধ করতে পারলে। মুখের কথা প্রকাশ পেলেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে চম্পট দেবেন তিনি। এর চেয়ে খারাপ কিছু হতে পারে না।
এবার কাজের কথায় আসা যাক্ মিঃ বন্ড। যথেষ্ট সৌজন্য দেখান হয়েছে। আমি তোমার উদেশ দিচ্ছি পেট হালকা কর। সব কথা চটপট বলে দাও আমায়, আমিও বিনা কষ্টে মারবার ব্যবস্থা করে দেব তোমারও, মেয়েটিরও। না বললে অনেক যন্ত্রণা পেতে হবে তোমাকে। বেড়ালটার ভাগ্যে যা ঘটেছিল মেয়েটির ভাগ্যেও তাই ঘটবে…ওকে অডজবের হাতে তুলে দেব। তুমি কোনটা চাও বল।
