হ্যাঁ। কথা বলল বন্ড। এখন থেকেই যেন শত্রুর গন্ধ পাচ্ছে, সাবধান হতে চাইছে।
বাঁ দিকে দশতলা ঐ নতুন বাড়িটা হল হৌস ড্যর মিনিস্টেরিয়েন, পূর্ব বার্লিনের মগজ। বেশির ভাগ জানলাতেই এখন আলো দেখতে পাবেন। বেশির ভাগই সারারাত জ্বলবে। যে সব জানলায় আলো থাকবে সেগুলো নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই কিন্তু যে সব জানলার ভেতর অন্ধকার সেখান থেকেই নির্ঘাৎ গুলি করবে ট্রিগার। ভাল করে দেখে রাখুন, মোড়ের ঠিক ওপরেই বাড়ির কোনটার পাশাপাশি চারটে জানলা আছে। এখান থেকে জানলাগুলো তিনশ থেকে তিনশ দশ গজের মধ্যে পড়ে। অন্য কিছু নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাবার দরকার হবে না। রাত্রিতে ঐ রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা থাকে। আধ ঘণ্টা অন্তর অন্তর টহলদারি গাড়ি আসে–সঙ্গে খান দুয়েক খবরদারি মোটর সাইকেল। কাল রাত্তিরে, সন্ধ্যে ছ টা থেকে সাতটার মধ্যে ঐ পাশের দরজা দিয়ে কিছু লোকজনের আনাগোনা দেখেছি। আমার মনে হয়, এটা নিত্যকার ব্যাপার। তার আগে পর্যন্ত লক্ষ্য করার মত কিছুই ঘটেনি। বাড়ির খানিকটায় সংস্কৃতি মন্ত্রকের দপ্তর আছে বটে।
এছাড়া অবশ্য আর কিছু চোখে পড়েনি। ভাল করে দেখে রাখুন। মনে রাখবেন, আগামীকাল ছ টা নাগাদ এর চেয়ে বেশি আলো থাকবে।
মোটামুটি বন্ড ভাল করে সব কিছু দেখে নিল। আর মনের মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে পাক খেতে লাগাল সেই ছবি ক্যাপ্টেন সেভার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নাক ডাকতে শুরু করার পরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত। হ্যাঁ, সে দেখতে পাচ্ছে রাস্তার আলোর বন্যার ওপারে ভাঙা চোরার মধ্যে চলা ফেরার একটা চকিত আভাস। আর্কল্যাম্পের প্রখর আলোয় সর্পিল গতিতে একটা ধাবমান মানুষের ছবি, বন্দুকের শব্দ, রাস্তার মাঝখানে হাত পা ছড়ানো একটা নিস্পন্দ নরদেহ। মোক্ষম চ্যালেঞ্জ।
পর্দার গায়ে ভোরের আলোর ছোঁয়া লাগতেই বন্ড এলোমেলো চিন্তা গুলোকে গুছিয়ে নিল। নিঃশব্দে বাথরুমে গিয়ে। সারি সারি ওষুধের শিশিগুলি নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগল টুইনাল। অর্ধেক লাল আর অর্ধেক নীল দু খানা বড়ি পানি দিয়ে গিলে ফেলে বন্ড বিছানায় শুয়ে পড়ল। তারপর গাঢ় ঘুমে ডুবে গেল। যখন তার ঘুম ভাঙল তখন দুপুর বেলা। ফ্ল্যাটে কেউ নেই। বন্ড জানলার পর্দা সরিয়ে দিল। নিষ্প্রাণ বার্লিনের দিকে কিছু সময় চেয়ে রইল। দেখল ভাঙা চোরা ফাঁকা জমির এই সব ঝোঁপঝাড়গুলো লন্ডনেও চোখে পড়ে। রান্নাঘরে গিয়ে কিছু খাওয়া-দাওয়া করে গোসল সেরে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। খানিকটা এগিয়ে একটা কাফেতে বসে এসৃপেসো কফি খেল, অলস মেজাজে বসে বসে দেখতে লাগল ঝঝকে সব গাড়ির অফুরন্ত স্রোত নানান কসরতে এঁকে বেঁকে ছুটে চলেছে।
বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। কাফের দেওয়ালে লাগানো ইনফ্রারেড হিটারের লাল আভা পড়েছে কাফের মৌরসি খদ্দেরদের মুখে। সন্ধ্যের কথাটা বন্ড ভুলে থাকার চেষ্টা করছে। ভাবছে বিকেলটায় কি করা যায়। অনেক ভেবে চিন্তে কফির দাম চুকিয়ে জু স্টেশনের দিকে চলল ট্যাক্সি চেপে।
লম্বা লেকের ধারে ধারে নতুন গাছগুলোর ডালে ডালে পাতায় পাতায় হেমন্তের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। ঝরা পাতার ওপরে পা ফেলে ঘণ্টা দুয়েক জোরে জোরে হটলো বন্ড। তারপর লেকের পাড়ে এক রেস্টুরেন্টে ঢুকে বেশ আয়েস করে খাওয়া দাওয়া সেরে যখন বেশ চনমনে লাগল, আবার শহরে ফিরে এল।
বাসার সামনে একজন ছোকরা একটা কালো রঙের ক্যাপিটান গাড়ির ইঞ্জিন নিয়ে কি সব ঠুকঠাক করছে। ক্যাপ্টেন সেভারের কথা সন্দেহ ঘুচল। দলের লোক -WB স্টেশনের ট্রান্সপোর্ট বিভাগের একজন কর্পোরাল। ওপেল গাড়িটার ইঞ্জিন বেশ গুরুতর গোলমাল করে রেখেছে। ওয়াকি টকি মারফত ক্যাপ্টেন সেন্ডারের কাছ থেকে ইশারা পাওয়া মাত্রই, ইঞ্জিন থেকে কয়েকটা ব্যাক ফায়ার করবে সে। প্রতিদিন সন্ধ্যে ছ টা থেকে সাতটা পর্যন্ত এটাই হবে তার কাজ। বন্ডের রাইফেলের শব্দ খানিকটা ঢাকা পড়ে যাবে ব্র্যাক ফায়ারের আওয়াজে। না হলে পুলিশে খবর গেলে তার ঝামেলা অনেক। ওদের এই যে গুপ্ত ঘাটি, এটা আমেরিকান এলাকা পড়েছে।
এই গাড়ির প্যাঁচটা খুব ভাল লাগল বন্ডের। শোবার ঘরের ব্যবস্থাও খুব ভাল লেগেছে। উঁচু খাটের মাথার ঠিক পিছনেই জানলার চওড়া গোবরাটের গোড়ায় কাঠ আর ধাতুর তৈরি একটা স্ট্যান্ড দাঁড় করানো হয়েছে, আর তার ওপর বসানো রয়েছে উইঞ্চেস্টার রাইফেল, বিছানার ওপর পড়ে রয়েছে কালো মখমলের তৈরি ঘেরাটোপ ধাচের একটা মুখোশ। দেখে মনে পড়ে যায় ফ্রেঞ্চ রেভলুশনের সময়কার গিলোটিন মঞ্চে অজানা কোন ঘাতকের কথা। ক্যাপ্টেন সেন্ডারের বিছানাতে ঐ একই ধরনের কালো মুখোশ। তার জানলার সেই দিকটায় চওড়া গোবরাটের ওপর একজোড়া দূরবীন, আর ওয়াকি-টকির মাইক্রোফোন।
ক্যাপ্টেন সেন্ডারের মুখটা উত্তেজনায় থমথমে। তিনি গম্ভীর স্বরে জানিয়ে দিলেন, স্টেশনে নতুন কোন খবর নেই, পরিস্থিতির কোন বদল হয়েছে বলেও জানা যায়নি। বন্ড কিছু না বলে মুখে বেশ সহজ হাসিখুশির ভাব ফুটিয়ে তুলল এবং বিকেলের বেড়ানোর গল্প বলতে লাগল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে পাঁজরের তলায় একটা ধকধকানি টের পেতে শুরু করেছে। আর যখন কোন কথা জোগাল না তখন সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আর ক্যাপ্টেন সেন্ডার এদিকে সারা ফ্ল্যাট পাক খেয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
