আস্তে আস্তে পাহাড় বেয়ে নামতে নামতে চাপা গলায় নির্দেশ দিল, আমি বলব যে তুমি আমার বান্ধবী, ইংল্যান্ড থেকে এসেছি একসঙ্গে। তুমি ভান করবে যেন এই অ্যাডভেঞ্চারে খুব বিস্ময় ও কৌতুক অনুভব করছ। আমার খুব বিপদে পড়েছি তাই একটুও কায়দা করার চেষ্টা কর না। পিছন দিকে ইঙ্গিত করে বলল, এই লোকটা পাকা খুনী।
মেয়েটা ক্রুদ্ধ গলায় বলে উঠল, তুমি নাক না গলালে কোন ঝামেলা হত না।
-আমিও তোমাকে সেই কথা বলতে পারি। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কিছু মনে কর না টিলি খারাপ ভেবে কথাগুলো বলিনি। তবে গোল্ডফিংগারকে গুলি করে বেশিদূর পালাতে পারবে না।
— আমার সব প্ল্যান ঠিক করা ছিল। আজ রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে যেতাম আমি।
বন্ড জবাব দিল না। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করল সেই রাডারটা আবার ঘুরতে শুরু করেছে। এটাই তাদের উপস্থিতি জানিয়ে দিয়েছে। যন্ত্রটা নিশ্চয়ই ফেনিকডিক্টোর। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধ্বনি ও তার উৎপত্তিস্থল খুঁজে বের করবার যন্ত্র। কত কায়দাই না জানে লোকটা।
গোল্ডফিংগারের ক্ষমতাকে নিচু নজরে দেখার কোন ইচ্ছে বন্ডের নেই। কিন্তু তাই করে ফেলেছে, পিস্তলটাও সঙ্গে আনেনি। আনলেও ঐ কোরিয়ান লোকটির সামনে সে কিছুই নয়, ঐ সাংঘাতিক তীর ধনুকের সামনে তো নয়ই। লোকটার সবকিছুই যেন মারাত্মক। বন্ড সশস্ত্র হোক বা নিরস্ত্র, ওর সঙ্গে লড়াই করবার চেষ্টা মানে ট্যাংকের হাতির লড়াইয়ের মত হাস্যকর।
নিচের উঠোনে এসে পৌঁছালে সঙ্গে সঙ্গে লাল বাড়ির পিছনের দরজা খুলে গেল, বেরিয়ে এল দু জন কোরিয়ান। এক ঝলক আলো এসে পড়ল ওদের ওপর। লোক দুটোর হাতে বিশ্রী চেহারার চকচকে লাঠি। হুকুম করল, থাম। মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়াও।
বন্ড দুই হাত আস্তে ওপর দিকে তুলল। মেয়েটাকে বলল, বাধা দিও না..যাই করুক না কেন?
অডজব তাদের সামনে এসে দাঁড়াল অন্য লোক দুটি দেহ তল্লাসী করে দেখল।
ঠিক আছে এস।
খোলা দরজার ভিতর দিয়ে নিয়ে গিয়ে পাথরে তৈরি প্যাসেজ পেরিয়ে একটা সাদা প্যানেল লাগানো দরজার কাছে এসে টোকা দিল।
-কে।
অডজব ও তারা ঢুকল।
গোল্ডফিংগার বসেছিলেন একটা ডেস্কের পিছনে। পরনে বেগুনী রঙের স্মোকিং জ্যাকেট। তার নিচে সাদা সিল্কের শার্ট। মেয়েটির দিকে না তাকিয়ে বন্ডের দিকে দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে। সে চোখে শুধু কঠোরতা। বন্ড ক্রুদ্ধ গলায় বলে উঠল দেখ গোল্ডফিংগার এসব কি ব্যাপার। তুমিই তো দশ হাজার ডলারের জন্য আমার পেছনে পুলিশ লাগালে। অগত্যা আমিও আমার বান্ধবী মিস সোমকে নিয়ে তোমার পিছু নিলাম। জানতে ইচ্ছে হয়েছিল এ বদমায়েসীর উদ্দেশ্য কি। আমরা অনধিকার প্রবেশ করেছি এছাড়া উপায় ছিল না। তুমি অন্য কোথাও যাবার আগে একবার দেখা করতে চাইছিলাম। তারপরই তোমার এই পার্শ্বচরটি আমাদের পেছনে এসে এমন তীর মারল আর একটু হলে লাগত। আমাদের আবার দেহ তল্লাসী করা হল। বলি ব্যাপারটা কি? এসব কথার জবাব দিয়ে ক্ষমা না চাইলে আমি পুলিশে খবর দিতে বাধ্য হব।
গোল্ডফিংগারের দৃষ্টি একটু কাঁপল না। মনে হল যেন কথাগুলো কানেই ঢোকেনি। কিছুক্ষণ পর বললমিঃ বন্ড শিকাগোর গুণ্ডামহলে একটা কথা খুব প্রচলিত ও দু জন লোকের প্রথম পরিচয়কে বলা হয় সাক্ষাৎ, দ্বিতীয় বার তাদের দেখা হয় দৈবাৎ; আর তৃতীয় বার দেখা হলে বাধে সংঘাত। মায়ামি এবং স্যান্ডউইচে দু ধাপ পেরিয়ে এসেছি আমরা…এবার সংঘাতের পালা। তোমার মুখ থেকে সব কথা শুনতে চাই আমি। গোল্ডফিংগারের দৃষ্টি চলে গেল বন্ডের পিছন দিকেঅডজ একে যন্ত্রণা ঘরে নিয়ে যাও।
.
তৃতীয় পর্ব
সংঘাত
যন্ত্রণা ঘর
কথাটা শোনামাত্র বন্ড তা করল তা নেহাতই সহজাত প্রবৃত্তি বলে। কোন যুক্তি টুক্তির পরোয়া না করে সামনের এক পা বাড়িয়ে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়ল গোল্ডফিংগারের ঘাড়ে। রাশীকৃত কাগজ ছড়িয়ে গিয়ে ডেস্কের ওপর দিয়ে শরীর নিয়ে গিয়ে মাথা দিয়ে আঘাত করল পাজরার ওপর। আচমকা ধাক্কায় গোল্ডফিংগার চেয়ার শুদ্ধ উল্টে পড়ছিল। ডেস্কের কোন ধাক্কা দিয়ে আবার ঝাপাতে দু জনেই একসঙ্গে উল্টে পড়ল চেয়ার ভেঙে। এবার জোরে টুটি টিপে ধরল গোল্ডফিংগার-এর।
ভারি কাঠের মত কিছু একটা ঘাড়ে পড়তেই বন্ড জ্ঞান হারাল।
একটা আলোর ঘূর্ণির মধ্যে পাক খাচ্ছিল বন্ড। ঘূর্মিটা আস্তে আস্তে চ্যাপ্টা হয়ে এসে চাকতি, তারপর হলুদ চাঁদ, শেষে একচক্ষু দানবের জ্বলজ্বলে চোখের রূপ ধারণা করল। চোখটার মধ্যিখানে লেখা আছে কিছু একটা। বন্ড একাগ্রচিত্তে বানান করে লেখাটা পড়ে ফেলল : মাজদা। কিন্তু লেখাটির তাৎপর্য কি?
একরাশ পানি ঝপ করে বন্ডের ওপর পড়ল, চোখ মুখে খানিকটা পানি ঢুকে গেল। উঠতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। ঘাড়ের কাছে দপদপে ব্যথা। সেই দানব চক্ষু এক অত্যুজ্জ্বল বাতি। বন্ড বুঝল ধাতুর টেবিলের সঙ্গে হাত পা বাধা।
একজনের গলা শোনা গেল, বর্ণহীন নিরুৎসুক স্বরে বললেন, এবার শুরু করা যাক।
বন্ড সেইদিকে মাথা ঘুরিয়ে চোখ কুঁচকে তাকাল। একটা ক্যানভাসের চেয়ারে গোল্ডফিংগার বসে আছে। গলার নিচে লাল লাল দাগ ফুটে বেরুচ্ছে। একটা টেবিলের ওপর ধাতব যন্ত্রপাতি সাজান। টেবিলের অপরদিকে চেয়ারে ওপর বসে আছে টিলি মাল্টারটন। তার হাত পাও চেয়ারের সঙ্গে বাধা। তার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা দেখে বন্ডের মনে হল তাকে হয় মাদকদ্রব্য খাওয়ান হয়েছি নয় হিপরোটাইজ করা হয়েছে।
