ফ্যাকাশে মুখে হিংস্রতা ফুটিয়ে বলল, আমি ওকে খুন করতে চাই।
গোল্ডফিংগার কি মেয়েটিকে অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব এনে দিয়েছে। বন্ড হাত ছেড়ে দিলে, টিলি আবার হাতটাকে টেনে এনে তার ওপর মাথা দিয়ে রাখল, শরীরটা অল্প অল্প কাঁপছে। আস্তে আস্তে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল বন্ড। সাবধানে একবার চোখ বুলিয়ে নিল কারখানার দিকে। একটা জিনিস লক্ষ্য করল, চিমনির ওপর রাডারটা আর ঘুরছে না তাদের দিকে ফিরে স্থির হয়ে আছে।
মেয়েটির কথা থামলে বন্ড তার কানের কাছে মুখ এনে চাপা গলায় বলল, কোন চিন্তা নেই, আমিও ওর পিছনে আছি। আর তুমি ওকে খুন করে যতটা ক্ষতি করতে পারবে তার থেকেও বেশি ক্ষতি করব আমি। লন্ডন থেকে আমাকে পাঠানো হয়েছে, ওকে পুলিশ খুঁজছে। তা তোমার সঙ্গে কি করেছে ও?
ফিসফিস করে বলল, আমার বোনকে ও খুন করেছে। তুমি চিনতে তাকে, জিল মাস্টারটন।
বন্ড চাপা গলায় গর্জে উঠল, কি হয়েছিল? –গোল্ডফিংগার প্রতিমাসে একজন মেয়েমানুষ রাখে। মাসের শেষে হিপনোটাইজ করে মেয়েটির সর্বাঙ্গে সোনালি রং রাখিয়ে দেয়। কাজে যোগ দেবার পর জিল আমাকে বলেছিল।
-কিন্তু কেন?
জানি না, জিল আমাকে লিখেছিল লোকটা সোনা বলতে পাগল, তাই বোধহয় স্বর্ণ প্রতিমায় রূপান্তরিত করে উপভোগ করে তৃপ্তি পায়। ওর একজন কোরিয়ান চাকর রঙ মাখানোর কাজটা করে। শুধু শির দাঁড়ার ওপর টুকু বাদ দিয়ে রাখে। পরে আমি জেনেছিলাম, মেয়েরা যাতে মারা না যায় তাই এই ব্যবস্থা। সমস্ত শরীর রঙে ঢেকে দিলে দেহের লোমকূপগুলো বন্ধ হয়ে দেহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হত। তাই এটুকু জায়গা ফাঁকা রাখা। পরে চাকরটাই রেসিন বা কি দিয়ে যেন গায়ের রঙ ধুয়ে দিত গোল্ডফিংগার তখন মেয়েটাকে হাজার ডলার বকশিস দিয়ে চাকরি ছাড়িয়ে দেয়।
বন্ড কল্পনার চোখে অডজবকে সোনালি রঙের টিন হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল আর গোল্ডফিংগার হিংস্র চোখে সোনালি মূর্তিটিকে দেখছে। বন্ড জিজ্ঞাসা করল, জিলের কি হয়েছিল? –ও আমাকে টেলিগ্রাম করেছিল আসবার জন্য। মায়ামীর এক হাসপাতালে এমার্জেন্সী বিভাগে ছিল, তখন শেষ অবস্থা। আমাকে সবকিছু বলল, তারপর সেই রাত্রেই মারা গেল। মেয়েটার গলা শুকনো ভাবলেশহীন; আবার শুরু করল, ইংল্যান্ডে ফিরে আমি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ ট্রেনের সঙ্গে দেখা করি। তিনিই আমাকে লোমকূপের ব্যাপারটা জানালেন। এরকম কেস তার জানা আছে। একজন ক্যাবারে নাচিয়েকে রূপালি প্রতিমা সাজতে হত। সেই মেয়েটি কিছুদিন পরে মারা যায়। ডাক্তার আমাকে সমস্ত বিবরণ দিতে আমি বুঝলাম জিলের কি হয়েছিল–গোল্ডফিংগার ওর শরীরে শিরদাঁড়াটাও বাকি রাখেনি তাই মারা গেছে ও। ইচ্ছে করেই খুন করা হয়েছে ওকে, তোমার সঙ্গে ঘনিষ্টতা করবার প্রতিশোধ হিসেবে। একটু থেমে টিলি বলল, তোমাকে ওর ভাল লেগেছিল, তাই আমাকে বলেছিল কোনদিন যদি তোমার সঙ্গে দেখা হয় এই আংটিটা তোমাকে দিতে।
বন্ড দু চোখ চেপে বন্ধ করে পানি আটকাতে চেষ্টা করল। আরেকটা মৃত্যু ঘটল তার জন্য। এই মৃত্যুটা নিতান্তই তার গাফিলতির ফল। ডুপন্টের আমন্ত্রণে গোল্ডফিগারের বিরুদ্ধে বীরত্ব দেখাতে গিয়েছিল এবং তার ফলস্বরূপ মেয়েটির সঙ্গে এক রাত কাটান। গোল্ডফিংগারের অহমিকায় আঘাত লেগেছিল। তাই লক্ষ্য গুণ জোরে সেটি ফিরিয়ে দিলেন। বন্ডের মনে পড়ল দু দিন আগে জিলের কথা জিজ্ঞাসা করায় তাকে বলা হয়েছিল সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। বন্ড ক্রোধে দুই হাত মুঠো করল। সৃষ্টিকর্তার দিব্যি এই দোষ গোল্ডফিংগারের ঘাড়ে চাপাবেই। সে যেমন করে হোক। আর বন্ডকে সারা জীবন এই মৃত্যুর দায় নিয়ে বেড়াতে হবে।
টিলি তার আঙ্গুল থেকে আংটি খুলতে চেষ্টা করছিল। আংটিটা খুলে এনে বন্ডের দিকে দিল মেয়েটি। বিচিত্র দেখতে আংটিটা, মাঝখানে সোনালি রঙের হৃদয় আঁকা, আর তার চারদিকে জড়ানো দুটি হাত হ্যাঁ এই সেই আংটি।
হঠাৎ এক বিচিত্র শব্দ শুনতে পেল বন্ড, পরক্ষণেই অ্যালুমিনিয়াম পালক লাগান একটা ইস্পাতের তীর বিদ্যুতের মত চোখের সামনে সোনার আংটিটাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। বিধল গাছের গায়ে।
খুব আস্তে ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল দশগজ দূরে এক কালো মূর্তি পা ফাঁক করে জুজুৎসু ওস্তাদের মত দাঁড়িয়ে আছে। আরেকটা তীর লাগিয়ে।
বন্ড চাপা গলায় মেয়েটিকে বলল একটুও নড়ো না। তারপর চেঁচিয়ে বলল, হাল অডজব দারুণ তীর ছুঁড়েছ তো?
অডজব কেবল তীরটাকে একবার ঝাঁকাল। বন্ড মেয়েটিকে ঢেকে উঠে দাঁড়াল, খুব আস্তে বলল, রাইফেলটা যেন দেখতে না পায়। অডজবকে শান্ত ভঙ্গিতে বলল, মিঃ গোল্ডফিংগারের বাড়ি ভারি সুন্দর, আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। তুমি বরং বলে দিও কাল ওর সঙ্গে দেখা করব। বন্ড মেয়েটার দিকে ফিরে বলল, এস প্রিয়ে, জঙ্গলের মধ্যে অনেক বেড়ানো হয়েছে, হোটেলে ফিরতে হবে। বলে কাঁটাতারের বেড়ার দিকে পা বাড়াল।
অডজব সামনের পা দিয়ে সজোরে মাটিতে আঘাত করে উঠল। দ্বিতীয় তীরটার আগা ঘুরে এসে বন্ডের পেটের ওপর স্থির হল।
-ওয়ার, পাশের দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বাড়ির দিকে ইঙ্গিত করল।
–ওঃ তোমার বুঝি মনে হয় এখনই ওনার দেখা হয়ে যাবে? ঠিক আছে তবে চল, বিরক্ত না হলেই হল। বন্ড গাছের বাঁ দিক দিয়ে এল, ডান দিকে রাইফেলটা আছে।
