লেখা শেষ হলে বলল, বটে! এ যে দেখছি দারুণ খবর। ঠিক আছে। আজ রাত্রে আমার বেতার যোগাযোগ করার কথা, তখন এটা পাঠিয়ে দেব। আর সোনাটা কান থেকে কূটনৈতিক বার্তাবহকদের ব্যাগে করে লন্ডনে চলে যাবে। আর কিছু
-কপেট-এর-এন্টার প্রাইজেস অরিক নামে কারখানার নাম শুনেছ? ওরা কিসের ব্যা করে জান?
-এ অঞ্চলের প্রতিটি কারখানার খবর আমার জানা। বছর কয়েক আগে হস্তচালিত রাইভেটার বিক্রি করবার ছুতোয় ওখানে ঢুকেছিলাম। ওরা ধাতব আসবাব তৈরি করে। সুইস রেলওয়ে ওদের কাছ থেকে চেয়ার কেনে। আর একটা বিমান সংস্থাও ওদের নিয়মিত খদ্দের।
-কোন বিমান সংস্থা?
–শুনেছি মক্কা এয়ারলাইনস -এর যাবতীয় আসবাব তৈরি করে। এটি নিয়মিত জেনিভা থেকে ভারতবর্ষ যাতায়াত করে, জোর ব্যবসা চালাচ্ছে। এই এয়ারলাইন্স একটা প্রাইভেট কোম্পানি। এমন কি এই কারখানার মালিকের বেশ কিছু অংশ আছে ঐ এয়ারলাইনসে। অতএব কন্ট্রাক্ট যে ওরাই পাবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
বন্ডের মুখে হাসির আভা দেখা দিল। উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করে বলল, তুমি জান না তুমি কি কাণ্ড করলে, এক মিনিটের মধ্যে বিশাল সমস্যার সমাধান করে ফেললে। অশেষ ধন্যবাদ। তোমার ব্যবসার জন্য শুভেচ্ছা রইল। আশা করি আবার দেখা হবে।
রাস্তায় এসে সোজা বার্গেস হোটেলের দিকে গাড়ি চালিয়ে দিল বন্ড।
….এই তাহলে আসল ব্যাপার। গত দু দিন ধরে এক সিলভার গোস্ট অর্থাৎ রূপালি প্রেতের পিছু পিছু ইওরোপের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে সে। গাড়ির গায়ে লোহার পাত লাগান, আর আজ দেখলে সে সমস্ত খুলে ফেলা হচ্ছে। লোহার পাতগুলো গলিয়ে কোন এক প্লেনের সত্তরটি চেয়ার তৈরি হবে, কয়েক দিন পর আবার প্লেন ভারতে পৌঁছানোর পর ঐগুলো খুলে অ্যালুমিনিয়ামের চেয়ার লাগান হবে। গোল্ডফিংগারের কত মুনাফা হবে, পাঁচ লক্ষ পাউন্ড, দশ লক্ষ।
কারণ গোল্ডফিংগারের রূপালি প্রেত, রূপালি নয় সোনালি। গাড়িটার গায়ে যে দু টন লোহার পাত লাগানো তা আসলে আঠার ক্যারেটের সাদা সোনা!
.
রাত্রে যারা লুকিয়ে আসে
জেমস্ বার্গেসের একটা ঘর ভাড়া নিল। গোসল করে জামাকাপড় বদলে, চিরসঙ্গী আগ্নেয়াস্ত্রটি নিয়ে ভাবতে লাগল নৈশ অভিযানে বেরোবে কিনা এটাকে নিয়ে। কারখানায় আবার যে গোয়েন্দা গিরি করতে যাচ্ছে সেটা গোপন করার ইচ্ছে। ভাগ্য ভাল হলে ধরা পড়বে না। আর যদি কেউ দেখেও ফেলে তাহলেও লড়াইয়ে নামবে না। তাতে সবকিছু ভেস্তে যাবে। ধরা পড়লে চমৎকার একটা কৈফিয়ৎ দেবে বন্ড। সে কৈফিয়ৎ কাজে না লাগলেও তার পরিচয়ের সত্যতা সম্পর্কে কোন সন্দেহ জাগবে না।
নিচের রিসেপশনে জানতে চাইল মিস সোমস হোটেলে আছেন কিনা। যখন তাকে বলা হল ও নামে হোটেলে কেউ নেই তখন একটুও অবাক হল না। ভন্ড ভাবল চোখের আড়ালে যেতে কোন হোটেলে গিয়ে উঠেছে, না কি অন্য নামে ঘর নিয়েছে।
অপরূপ সুন্দর পা দুম ব্লা বরাবর গাড়ি চালিয়ে বন্ড পৌঁছল বিখ্যাত রেস্তোরাঁ ব্যাভেরিয়াতে। সেখানে একটা কথা মনে পড়ল তার, আর কোন সন্দেহ নেই গোল্ডফিংগারের সম্বন্ধে। গুপ্তচর সংস্থাকে টাকা যোগান, ভারতে স্মাগল করে। উপার্জন করা, বেশি মুনাফা পাবার জন্য। ট্রলার জাহাজটা ভেঙ্গে যাবার পর নতুন পন্থা বার করেছেন। সকলকে জানালেন আর্মাড প্লেট লাগানো গাড়ি কিনেছেন, এটাকে বড়লোকের খেয়াল ছাড়া কিছু মনে করেনি। কারণ এরকম গাড়ি অনেকে আগে ভারতীয় রাজরাজড়াদের কাছের রপ্তারি করেছে। তৈল ব্যবসায়ী আরব সেখ আর দক্ষিণ আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের কাছে পাঠানো হয়। হয়ত প্রথমদিকে কয়েকবার ইউরোপ গিয়েছেন, যাতে ফেরিফিল্ডের প্লেন কোম্পানি গাড়িটার ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
তারপর প্রতি ট্রিপের আগে আর্মাড প্লেট খুলে নিয়ে তার জায়গায় সোনার পাত লাগিয়ে দেওয়া হত। নিকেল ও রূপা মিশিয়ে এমন একটা অ্যালয় তৈরি হয় যাকে সোনা বলে চেনা শক্ত। ফলে রোলস রয়েসের গায়ে আঁচড় টাচড় লাগলে বা ধাক্কা লাগলেও ধরা পড়বার ভয় নেই।
তারপর গাড়িটাকে ইংলিশ চ্যানেলের ওপর দিয়ে নিয়ে আসা হয়। এখানকার কর্মীরাও কোরিয়ান লোকগুলোর মত বাছাই করা। এরাই পাত খুলে নিয়ে ঢালাই করে চেয়ার তৈরি করে চামড়ার আচ্ছাদন লাগিয়ে দেয়। চেয়ারগুলো প্লেনে করে নিয়ে যায় জনৈক সঙ্গী যাকে স্বর্ণ বহন করার জন্য লাভের অংশ দিতে হব।
বছরে দু তিনবার প্লেনে সোনা পাচার হয়। সোনা পাচারকারী প্লেন ওজনে এত ভারি হয় যে, অন্য মালপত্র কম নিতে হয়। নিশ্চয় বোম্বাই বা কলকাতায় প্লেন নামার পর প্লেন সারানোর ছুতো করে চেয়ারগুলো পাচার হয়ে যায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে। গোল্ডফিংগার যে কোন দেশের মুদ্রায় তার টাকা পেয়ে যান। লাভের পরিমাণ থাকে শতকরা একশ থেকে দুশ পর্যন্ত ব্রিটেনের পুরনো দোকানগুলোতে সোনা জমা হয়ে সেখান থেকে রেকুলভার…জেনিভা…এবং সবশেষে বোম্বাই।
সামনের হ্রদটা তারার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে বন্ড ভাবল হ্যাঁ, ব্যাপারটা বোধহয় এভাবে চালানো হয়। সবচেয়ে সেরা জাতের এক চোরাকারবার, বিপদ সবচেয়ে কম, মুনাফা সবচেয়ে বেশি। তিন তিনটে দেশের পুলিশের চোখের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে যেতে নিশ্চয়ই আত্মগর্বের হাসি হাসে গোল্ডফিংগার। সত্যিই ক্ষমতা আছে বলতে হবে। গোল্ডফিংগার লোকটি যদি এত বিশ্রী না হত, SMERSH-এর সঙ্গে যদি যোগাযোগ না থাকত তবে বন্ড তার প্রতি যথেষ্ট সম্ভ্রম অনুভব করত। এর ষড়যন্ত্র এত বিশাল যে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু সে যাই হোক, আপাতত বন্ডের কাজ হল গোল্ডফিংগারের সব জারিজুরি খতম করে দেওয়া। তার স্বর্ণলুঠ এত ভয়াবহ যে সারা পৃথিবী একদিন বিপন্ন হতে পারে।
