তোষামোদ বা শাসানি নয় সুতীব্র আগ্রহ ফুটে বেরল তার মুখে।
এতক্ষণ বন্ডের কাছে মেয়েটি ছিল ব্ল্যাকমেলার, কারণ এ ছাড়া গাড়ির পিছু নেওয়ার কোন কারণ জানা যায়নি। প্রথম সে ভালভাবে মুখটা দেখল। মেয়েটির মুখে পরিণত চরিত্রের চাপ। নির্ভীক, এর পক্ষে ওসব নিচতা সাজে না। তাছাড়া পুরুষকে প্রলোভনে ফেলার মত সাজসজ্জা তার নেই। সাদা রঙের সিল্কের শার্ট। চওড়া হাতা দুটো কব্জি পর্যন্ত এসেছে। নেল পালিশ নেই, গয়না নেই, কেবল অনামিকায় বাগদানের চিহ্ন স্বরূপ একটা আংটি। কোমরে চওড়া বেল্ট আর ঘন চাই রঙের সংক্ষিপ্ত স্কার্ট, সব মিলিয়ে আকর্ষণীয়। কিন্তু মেয়েটির সাজ ও ব্যবহারে কেমন যেন পুরুষালি ভাল।
মেয়েটি অসামান্য সুন্দরী, কিন্তু সাজসজ্জা অবিন্যস্ত। চুল ভালভাবে আঁচড়ান নেই, সিথি আঁকাবাঁকা, ঘন নীল দুটো চোখ, লোভনীয় অধরোষ্ট। চোয়ালের দৃঢ় রেখায় জেদ ও আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে, দেখলেই মনে হয় বেপরোয়া। উচ্ছল যৌবনা মেয়েটি পা ফাঁক করে, হাত পেছনে রেখে চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
সমস্ত পরিস্থিতিটা তাকে বোলছে–তুমি আমায় খুকি পেয়েছ না? তুমিই আমাকে ফ্যাসাদে ফেলেছে। এখন তুমিই উদ্ধার কর। তোমার চেহারা দেখে আমার মন ভুলবে না। আমায় কাজের জায়গায় পৌঁছতেই হবে।
বন্ড হিসেব করে দেখছিল মেয়েটাকে সঙ্গে নেওয়ার বিপদ। মেয়েটার কাছ থেকে রেহাই পেলে আর কোন ঝামেলা হবে না তো, সব অসুবিধে সত্ত্বেও মেয়েটির সম্পর্কে কৌতূহল হচ্ছে তার। মেয়েটিকে নিয়ে সে কি স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু এখন তাকে সাহায্য না করা বড় খারাপ দেখায়।
বন্ড সংক্ষেপে বলল, নিশ্চয়ই পৌঁছে দেব জেনিভায় তারপর নিজের অস্টিন গাড়িটার ডালা তুলে মালপত্র তুলে নিল। মেয়েটিকে কিছু টাকা দিয়ে বলল গ্যারেজে গাড়ি সারানোর ব্যবস্থা আমিই করছি, তুমি কিছু খাবার কিনে আন। আমার জন্য লিয় মসেজ রুটি মাখন আর এক বোতল মেঝো নেবে।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে মেয়েটি টাকা নিয়ে বলল, ধন্যবাদ, আমার জন্যও তাই আনছি। নিজের গাড়ির পিছনের ডালাটা। খুলে সে বলল, তোমাকে আসতে হবে না মালপত্র আমিই সরিয়ে নিচ্ছি। গাড়ি থেকে এক ব্যাগ গলফ ক্লাব আর ছোট স্যুটকেস বার করে বন্ডের বাক্সের পাশে রেখে দিল। আর একটা কালো চামড়ার কাঁধে ঝোলান ব্যাগ নিজের কাছে রাখল।
বন্ড বলল, গ্যারেজে তোমার নাম ঠিকানা কি বলব?–কি?
বন্ড আরেকবার কথাটা বললেও সত্যি সে ঠিক নাম ঠিকানা দেবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।
মেয়েটি বলল, আমি তো এখন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরব তাই জেনিভার বার্গেস হোটেলের ঠিকানা দেওয়া ভাল। আর আমার নাম মিস্ টিলি সোমস। তারপর চলে গেল মাংসের দোকানে, খাবার কিনতে।
মিনিট পনের পর তারা যাত্রা শুরু করল। মেয়েটি সোজা রাস্তার দিকে তাকিয়ে, হোমারের আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে আসছে। ওদের গাড়িটা নিশ্চয়ই অনেক এগিয়ে গেছে, জোরে গাড়ি চালাল বন্ড। শহর ও নদী পার হয়ে N84 নং রাজপথের বাঁকগুলো ঘুরে এত জোরে বেরিয়ে এল যেন রেসে নেমেছে। পাশে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়েটির ঠোঁট লাল হয়ে গেছে। নাকের পাটা ফুলে গেছে। চোখ জ্বলজ্বল করছে। এই দুরন্ত গতি সে উপভোগ করছে দারুণভাবে।
সামনে সুইজারল্যান্ড। হোমারের আওয়াজের তীব্রতা শুনে গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। সীমান্তে কাস্টমসের জন্য থামতেই হবে। ড্যাসবোর্ডের নিচে হাত দিয়ে হোমারের আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে রাস্তার ধারে গাড়ি থামাল, ওখানে বসে চুপচাপ খেয়ে নিয়ে দশ মিনিট পর আবার পাইন গাছের সারির ভিতর দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলতে লাগল। এত কিছু হল তবু কেউই কোন কথা বলল না, দু জনেই দু জনের চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত।
মেয়েটি বলে উঠল, কিসের আওয়াজটা আসছে ম্যাগনেটের আওয়াজ, গাড়ি জোরে চালালে আওয়াজটা বেড়ে যাচ্ছে, অলিয়ন্স থেকে ঝামেলা শুরু হয়েছে, রাত্রেই ওটাকে সারিয়ে নিতে হবে।
জবাব শুনে খুশি মনে হল, নম্রভাবে বলল, তুমি কোথায় যাচ্ছিলে? আশা করি অন্য পথে নিয়ে যাচ্ছি না তোমায়?
বন্ড বলল, একটুও না, আমিও ওখানেই যাচ্ছিলাম তবে আজ রাত্রে থাকতাম না। আরো দূরে যেতে হবে। আজকের মিটিংটার ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। তা তুমি কতদিন থাকবে জেনিভায়?
সে বলা মুশকিল। আমি তো গলফ খেলি, ডেভন-এ মহিলাদের সুইস ওপন চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হচ্ছে, অবশ্য খুব ভাল খেলোয়াড় নই, তবু ভাবলাম একবার চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? এর পরে অন্যান্য মাঠে খেলব।
যুক্তিটা মন্দ নয়, তাছাড়া না হবার কারণ তো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এটুকু বুঝল-এর পিছনে আরো কিছু ব্যাপার। আছে। বলল, তুমি শুধু খেল নাকি? কোন মাঠে খেল?
–টেম্পল মাঠে। হ্যাঁ একটু বেশিই খেলি।
বন্ডের প্রশ্নটা স্বাভাবিক হলেও উত্তরটা স্বাভাবিক কি? নাকি যা মনে এল তাই বলে দিচ্ছে।
–তুমি বুঝি টেম্পল মাঠের কাছে থাকা
আমার এক খালা থাকে হেললিতে। তা তুমি সুইজারল্যান্ডে কি করছ? ছুটি কাটাতে?
–না ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে, আমদানী রপ্তানীর ব্যাপার।
–আচ্ছা!
পাহাড়ের নিচে নেমে এসেছে সামনের সোজা লম্বা রাস্তা ধরে, কাস্টমস্ বিভাগের দিকে যাবে বলে।
মেয়েটি বন্ডকে কোন সুযোগই দিল না পাসপোর্টটা দেখে নেওয়ার। গাড়ি থামতেই চুল ঠিক করে মহিলা ভোলা দরজার পিছনে চলে গেল। বন্ডের কাগজপত্র পরীক্ষার আগেই এসে উপস্থিত। পাসপোর্টে ছাপ মারা সাঙ্গ করে। সুইস কাস্টমসেও সুইটকেস থেকে কি যেন বার করবার ছুতো করে কাজ সেরে এলে মেয়েটা। মেয়েটি মিথ্যা পরিচয় দিয়েছে কিনা তা পরখ করার কোন সুযোগই পাওয়া গেল না।
