বন্ড জোরে গাড়ি চালাল, এখন আর এ নিয়ে মাথা ঘামালে হবে না, মেকো শহরের আগেই রোলস রয়েসটার কাছাকাছি পৌঁছতে হবে, যাতে পরের মোড়ে গোল্ডফিংগার কোন দিকে গেলেন সেটা বুঝতে পারে। সেই মেয়েটির সমস্যা সমাধান করতে হবে তার সঙ্গে তার পিছু নেওয়া ব্যাপারটাও। যতটুকুই হোক ঐ মেয়েটি যে কিছু ঝামেলা বাধাতে চলেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। রাস্তায় কোথাও দাঁড়িয়ে খাবার ও পানীয় কিনতে হবে, দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি তার। আরও কাজ আছে, গাড়িতে পেট্রল ভরে তেল ও পানি ঠিক আছে নাকি দেখবে।
হোমারের গুঞ্জন ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। মেকো শহরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। রোলস রয়েসের কাছে এগিয়ে গেলে গোল্ডফিংগার দেখে ফেলতে পারে। কিন্তু এত গাড়ির ভিড়ে সেটা হবে না বোধহয়। গাড়িটা এবার কোনদিকে। গেল জানা দরকার।
দূরে হলুদ গাড়িটা ঝকঝক করছে। রেলওয়ে ব্রীজ পেরিয়ে ছোট চৌমাথা ছাড়িয়ে চলতে লাগল গাড়ি, পথচারীরা সবাই ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে রাজকীয় গাড়িটার দিকে। নদী একটা সামনে, যদি গাড়ি ডান দিকে যায় তবে লিয় যাবেন আর ব্রীজ পার হলে সুইজারল্যান্ড। গাড়ি ব্রীজের ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল।
বন্ড একই পথে সেন্ট লরেন্ট-এর শহর তলিতে পৌঁছল। কিছু রুটি, মাংস আর মদ কিনে রাখতে হবে। দূরে মাংসের দোকান দেখা যাচ্ছে। সেদিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে একবার ড্রাইভিং আয়নার দিকে তাকাল–সেই ছোট ট্রায়ন গাড়িটা। তার পিছনে।
কখন এসেছে মেয়েটা, রোলস রয়েসের পিছু নিতে গিয়ে একবারও পিছন দিকটা দেখা হয়নি। মেয়েটা বোধহয় গাড়িশুদ্ধ লুকিয়ে ছিল। গোল্ডফিংগারের গাড়ি দেখে আবার পিছু নিয়েছে। এবারে তো আর ব্যাপারটাকে সহজ মনে হচ্ছে না। কিছু একটা করতেই হবে। বন্ড মনে মনে বলল কিছু মনে করো না সুন্দরী, তোমার গাড়িটার আস্তে করে বারটা বাজিয়ে দিতে হচ্ছে। যেই ভাবা সেই কাজ। হঠাৎ মাংসের দোকানটার সামনে ব্রেক কষল, তারপর সজোরে ব্যাকগীয়ার দিতেই পিছু হঠে যথাস্থানে আঘাত করল। ধাক্কা লাগার ধাতব শব্দের সঙ্গে, কাঁচ ভাঙার ঝনঝন আওয়াজ। বন্ড ইঞ্জিন বন্ধ করে মেনে এল।
অলস পায়ে পিছনে এসে দাঁড়াল, মেয়েটা রাগে মুখ লাল করে নেমে আসছে। মসৃণ, তুষার শুভ্র পায়ের তিন চতুর্থাংশ দেখতে পেল বন্ড। মেয়েটি বেরিয়ে এসে গগলস খুলে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল।
বন্ডের অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ির পিছন দিকের বাম্পার ট্রায়ন-এর হেডলাইট ও রেডিয়েটরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে গেঁথে আছে। বন্ড অমায়িকভাবে রসিকতা করে বলল, আবার যদি আমার ওখানে হাত দাও, তাহলে আমাকে বিয়ে করতে হবে।
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই মেয়েটি থাপ্পড় কষাল বন্ডের গালে। বন্ড গালে হাত বোলাতে বোলাতে দেখল লোকের ভিড় জড়ো হচ্ছে। তার ভিতর থেকে সমর্থন ও অম্লান মন্তব্য ভেসে এল, বাহুত আচ্ছা চালিয়ে যাও।
চড় মেরেও তার রাগ কমেনি। বলল, বজ্জাত কোথাকার! কি করেছ তুমি?
বন্ড ভাবল সুন্দরী মেয়েরা যদি রেগে যায় তাহলে খুব সুন্দর দেখায়। তাকে বলল, তোমার ব্রেকগুলো তেমন। সুবিধের নয়।
-আ-মা-র ব্রেক! মানে? তুমিই তো পিছু হটে আমার ওপর এসে পড়লে।
গীয়ারটা হঠাৎ হড়কে গিয়েছিল, তুমি যে ছিলে আমি সেটা বুঝতে পারিনি। বন্ড দেখল এবার মেয়েটাকে ঠাণ্ডা করা দরকার। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। তোমার যা ক্ষতি হয়েছে তার জন্য আমি খরচ দেব। তোমার কপাল খারাপ তাই দুর্ঘটনা ঘটল। দেখি! কি ক্ষতি হয়েছে তোমার গাড়িটাকে একটু পিছনে নিয়ে যাও। বাম্পার দুটো আটকে গেছে। বলে মনে হচ্ছে না। বলে ট্রায়নফের বাম্পারের ওপর পা রাখল।
-খবরদার আমার গাড়িতে হাত দেবে না, পা সরিয়ে নাও। রেগে গিয়ে স্টার্টারে চাপ দিল গাড়িতে বসে। ইঞ্জিন চালু হল, সেই সঙ্গে বনেটের নিচে ঠং ঠং ধাতব আওয়াজ শোনা গেল। সুইচ অফ করে জানালা দিয়ে বলল, দেখতে পেলে বুদ্ধ কোথাকার। রেডিওয়েটরের পাখা ভেঙে দিয়েছ তুমি?
বন্ড মনে মনে এটাই চাইছিল। নিজের গাড়িতে চড়ে সে দুটোকে আলাদা করল। ভিড় পাতলা হতে শুরু করেছে। বন্ড গাড়ি থেকে নেমে এসে জানতে চাইল ব্রেক ডাউন ভ্যান ডাকবে কিনা। বন্ড ট্রায়নফের দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটাও গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে অপেক্ষা করছিল। এখন অনেক শান্ত হয়ে গেছে। বন্ড লক্ষ্য করল, তবে তার চোখ দুটো তাকে পর্যবেক্ষণ করছে।
বন্ড জানাল তার খুব একটা অসুবিধা হবে না, পাখাটা হয়ত ভাঙেনি শুদু একটু সরে গেছে। সারিয়ে নিতে বেশি দেরি লাগবে না। কাল সকালেই বেরিয়ে পড়তে পারবে। বন্ড মানিব্যাগ বার করতে করতে বলল তুমি খুব রেগে গেছ। স্বীকার করছি সব দোষ আমার। এই এক হাজার ফ্লা তোমার কাছে রাখ। সারানোর খরচ এ সবের জন্য। দয়া করে টাকা নিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেল। তাহলে আজকের মত এখানে থেকে কাল সকালে তোমায় রওনা করে দিতে পারলে খুশি হতাম, কিন্তু সন্ধ্যাবেলা ভীষণ জরুরী কাজ আছে।
-না, ঠাণ্ডা গলায় বলল মেয়েটি। সে দাঁড়িয়ে আছে।
-কিন্তু… ও কি চায়, পুলিশে দেবে, বিপজ্জনক গাড়ি চালানোর অভিযোগ আনবে?
মেয়েটা বলল আজ সন্ধ্যায় আমারও একজনের সাথে দেখা করতে হবে। কাজটা ভীষণ জরুরী, আজই জেনিভা যেতে হবে, আমাকে পৌঁছে দেবেন দয়া করে। বেশি দূর নয়, শ খানেক মাইল। বন্ডের গাড়ির দিকে ইঙ্গিত করে বলল ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে এতে করে পৌঁছে যাব আমরা, দেবেন পৌঁছে
