কাল্পনিক গল্পের পরিণতিটা ভেবে হাসল বন্ড। কিন্তু ঐ গোল্ডফিংগারের জন্য তার আজকে কিছু হবে না। সে মেয়েটির সেন্টের বদলে গোল্ডফিংগারের আফটার শেভ-এর গন্ধ শুকবে।
বন্ড রিসিভার চালিয়ে সংকেত দেখে নিয়ে অলসগতিতে ড্রাইভ করে চলল। মন পড়ে আছে সেই মেয়েটার দিকে, ও কি অর্লিয়েনসে কোন হোটেলে রাত কাটিয়েছিল? একটা সুযোগ চলে গেল! অবশ্য পথে আবার দেখা যেতে পারে তাদের।
আরে দাঁড়াও দাঁড়াও; সহসা বন্ড-এর স্বপ্নভঙ্গ হল। গাড়িটার খোলা হুড দেখে একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। কোথায় যেন আগে দেখেছে। ফোরফিল্ড এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়েছিল, গোল্ডফিংগারের পরের প্লেনে এসেছে বোধহয়। মেয়েটার গাড়ির নম্বর লক্ষ্য করেনি, কিন্তু এ যে সেই গাড়িটা সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই যদি হয় তবে এখনও গোল্ডফিংগারের পেছনে লেগে রয়েছে। গতরাত্রে মেয়েটা আবার হেডলাইট জ্বালিয়ে চালাচ্ছিল। তাই তো ব্যাপারটা কি।
বন্ড অ্যাসিলেটরে চাপ দিল। সামনেই মেভরম শহর, পরের মোড় আসার আগে গোল্ডফিংগারের আরও কাছাকাছি এগিয়ে যেতে হবে। এক ঢিলে দুই পাখি মারবে সে কোন পথে সে গেল আর মেয়েটার উদ্দেশ্য। যদি মেয়েটা তাদের মধ্যে নাক গলাতে আসে তাহলে ঝামেলার ব্যাপার। একে গোল্ডফিংগারকে সামলান ঝামেলা তার ওপর উড়ে এসে জুড়ে বসবে মেয়েটা।
মেয়েটা যথাস্থানেই আছে, রোলস রয়েসের সঙ্গে মাইল দুয়েক দূরত্ব রেখে অনুসরণ করছে মেয়েটির গাড়ির পিছন দিকটা চোখে পড়তেই গাড়ির গতি কমল। মেয়েটির অজানা পরিচয়, উদ্দেশ্য চিন্তা করতে করতে ড্রাইভ করে চলল বন্ড।
N7 রাজপথটা ফ্রান্সের বুক চিরে চলে গেছে। রাস্তাটা বেশ চওড়া, তার ওপর দিয়ে চলেছে পরপর তিনটি গাড়ি। মূলা বলে জায়গায় আর একটু হলে গোল্ডফিংগারের হদিশ হারিয়ে ফেলে ছিল পরক্ষণেই আবার তা পেয়ে যায়। N7 থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে ইটালী বা জেনিভার দিকে রোলস রয়েস এগোচ্ছ।
হোমারের আওয়াজের বদলে ট্রায়নফ গাড়িটা এখন মাথায় ঘুরছে। হঠাৎ গভীর গর্জনের আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ব্রেক করল, নয়ত রোলস রয়েসের ওপর গিয়ে পড়ত।
শম্বুক গতিতে চলতে চলতে একটা চড়াইয়ের মাথায় এসে চোখে পড়ল মাইল খানেক দূরে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে।
বরাত ভাল, পাশেই একটা মেঠো রাস্তা ছিল, গাড়িটা ভেতরে উঁচু ভুট্টা ক্ষেতের আড়ালে থামল। ছোট একটা দূরবীন বার করে চোখে লাগিয়ে দেখল নদীর ধারে গোল্ডফিংগার বসে লাঞ্চ খাচ্ছেন। পরনে সাদা কোট, মাথায় হেলমেট। খাবার দেখে তারও যেন খিদে পেয়ে গেল।
গাড়িটার দিকে তাকাতে ড্রাইভারের আসনে বসা কোরিয়ান লোকটিকে দেখা যাচ্ছে, ট্রায়ন গাড়িটা ধারে কাছে কোথাও নেই। যদি সেও পিছু নিয়ে থাকে তবে ঘাপটি মেরে আছে কোন জায়গায়। বন্ড মনে হয় বেশি কল্পনা করে ফেলছে। সে হয়ত তার আত্মীয় বা প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গেছে।
গোল্ডফিংগার উঠে দাঁড়িয়ে খাওয়া কাগজগুলো ব্রিজের তলায় খুঁজে দিলেন। কিন্তু নদীতে ফেলল না কেন? হঠাৎ চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কি যেন মনে হচ্ছে কাগজ গোঁজা দেখে। তবে কি এই ব্রীজ গোল্ডফিংগারের পোস্ট অফিস। তিন দেশের নাগালের মধ্যে এই ব্রীজ ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইটালী, জায়গাটাও খোলামেলা। হয়ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওখানে সোনার বাট রেখে যেতে।
গোল্ডফিংগার নদীর পাড় বেয়ে উপরে উঠলেন, গাড়ির স্টার্ট দেওয়ার শব্দ হল। গাড়িটা অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি চেয়ে রইল বন্ড।
সুন্দর নদীর ওপর সুন্দর ব্রীজ। জরীপ বিভাগের একটা নম্বরও লাগান আছে গায়ে 79/6-অর্থাৎ N79 নং রাজপথের ওপর নির্দিষ্ট কোন শহর থেকে 6 নম্বর ব্রীজ। খুঁজে বার করা একটুও শক্ত নয়। বন্ড গাড়ি থেকে নেমে নদীর নিচু পাড়ে নেমে এল। নদীটি পরিষ্কার, নুড়ি বিছানো পানিতে মাছেদের ছায়া পড়েছে। ঠিক মাঝখানে, রাস্তার নিচে ব্রীজের গাঁথুনির গায়ে একজোড়া মোটা ঘাস হেলান দিয়ে আছে। ঘাসগুলো ফাঁক করে দেখে সদ্য খোঁড়া মাটি, বন্ড মাটির ভিতর আঙ্গুল চালিয়ে দিয়ে দেখে একটা মাত্র সোনার বাট। মসৃণ হঁটের মত দেখতে, তুলতে বেশ জোর লাগল। মাটি ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিয়ে রুমালে বেঁধে কোটের পকেটে করে ফাঁকা রাস্তায় উঠে এল।
গোল্ড ফিংগার (পার্ট ২)
আবার যদি ওখানে হাত দাও…
বন্ড বেশ সন্তুষ্ট। বাট সরানোর ফলে অনেকে বেশ ক্রুদ্ধ হবেন। এই কুড়ি হাজার পাউন্ডের সোনার বাট অনেক নোংরা কাজের রসদ জোগাতে পারত। এখন SMERSH-কে অনেক প্ল্যান বদল করতে হবে, ষড়যন্ত্রের তারিখ পিছিয়ে দিতে হবে, অনেক প্রাণ বেঁচেও যেতে পারে। আর যদি অনুসন্ধান চালায় ধরে নেবে কোন ভবঘুরে সোনার বাটটি পকেটস্থ করেছে। অবশ্য নাও করতে পারে, কারণ SMERSH অত্যন্ত বাস্তবপন্থী সংস্থা, এধরনের ক্ষতি নিয়ে হৈ চৈ বাঁধান তার সম্ভব নয়।
বন্ড তার গাড়ির পিছনের সীটে ঢাকা তুলে গুপ্ত কোটরে বাটটি রেখে দিল। ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের পরবর্তী স্টেশনে এটা দিয়ে দিতে হবে। ওরাই ওটা লন্ডনে পাচার করে দেবে। রিপোর্টে সোনার বাট লুকানোর কথা বলতে হবে। বন্ড চাইছিল না অন্য অঞ্চলের গুপ্তচরেরা সতর্ক হয়ে ওঠে আর তার কাজে নাক গলায়। গোন্ডফিংগার সতর্ক হবার সুযোগ না পেলেই বন্ডের সুবিধা।
