লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে জোরে গাড়ি চালিয়ে দিল। নিশ্চয়ই গোল্ডফিংগার এতক্ষণে আবেভিল পেরিয়ে প্যারিস অথবা রুয়েনের দিকে গেছেন। বন্ড যদি ভুল করে তবে তাকে ধরতে সময়, দুরত্ব দুটোই নষ্ট হবে।
উঁচুনিচু রাস্তা ধরে বন্ড তেতাল্লিশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করল ঠিক পনের মিনিটের মধ্যে। হোমার-এর আওয়াজ ক্রমশ জোর হচ্ছে। তার মানে গোল্ডফিংগার এখন কুড়ি মাইল এগিয়ে। তেমাথায় পৌঁছে প্যারিসের দিকে আন্দাজে গাড়ি ঘোড়াল। জোরে ড্রাইভ করে গোল্ডফিংগারের কাছাকাছি চলে এসেছে মনে হচ্ছে, কিন্তু কোথায় হোমারেরও আওয়াজ কমে গেল।
দূর! এখন কি গাড়ি ঘুরিয়ে ডান দিকে ঘুরে গেল সে। প্রথমে ভিড়ে গাড়ি আটকে গেলেও শেষ পর্যন্ত জন বিরল রাজপথ N30-তে এসে পড়ল। তারপর হোমারের বেতার সংকেত অনুযায়ী রুয়েন এসে পৌঁছল।
শহরের বাইরে যেতে সংকেত আরও জোরাল হল। তার মানে গোল্ডফিংগারের আগেই সে রুয়েনে চলে এসেছে। এখন শুধু অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না গোল্ডফিংগার রুয়েন ছাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
মিনিট পনের পর যখন রোলস রয়েসটা অনেক দূর চলে গেল তখন বন্ড স্টার্ট দিয়ে আরেকটা তেমাথায় এসে বাঁদিকে ঘুরল। বেতারের সংকেতের গুঞ্জন ক্রমশ গর্জনে পরিণত হল। গাড়ির গতি কমিয়ে আনল। সঙ্গে রিসিভারের গর্জনও শোনা যেতে লাগল। বন্ড মনে মনে ভাবল গোল্ডফিংগার কোথায় যেতে পারে?
পাঁচটা থেকে সাতটা বাজল, সূর্য অস্ত চলে গেছে তাও রোলস রয়েসের বিরাম নেই চলার। অর্লিয়েন গাড়ি রাস্তা ধরে তারা এতক্ষণে এসেছে পঞ্চান্ন মাইল। রাত্রে যদি গোল্ডফিংগার অর্পিয়নসে থামেন তাহলে বলতে হবে গাড়িটা ভালই এসেছে, ছ ঘণ্টায় আড়াইশ মাইল। মোটর চালানোর ব্যাপারেও তার আলসেমি নেই। বন্ড দুই গাড়ির মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে লাগল।
সামনে আরেকটা গাড়ির হেড লাইট দেখা যাচ্ছে, হেডলাইট জ্বেলে দেখল একটা ছাই রঙের ট্রায়ন টু-সীটার। পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে সামনের গাড়িটার কাছে আসতেই হেডলাইট নিভিয়ে দিল, ফগ লাইট জ্বালাল।
সামনের গাড়িটা মাইল খানেক এগিয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি কাছে একে দেখে নিল গাড়িটা রোলস্ রয়েস কিনা। সন্দেহ মেটতে আবার পিছিয়ে এল। ড্রাইভিং আয়নায় TR3 গাড়ির আলো চোখে পড়ল তার। অর্পিয়নস শহরের বাইরে পৌঁছে গাড়ি থামাল। কিছুক্ষণ পরই ট্রায়ন টু সীটার তাকে ছাড়িয়ে চলে গেল।
এই অলিয়নস শহরটার রোমাঞ্চও নেই, উজ্জ্বলতা নেই বলে বন্ডের কোনদিন ভাল লাগে না। বন্ডের ইচ্ছা হচ্ছিল শহরে না গিয়ে নদীর ধারে আরাম করে ঘুমিয়ে নিতে। কিন্তু গোল্ডফিংগার বোধহয় কোন হোটেলে উঠবে। শিকারের পিছনেই নানা দরকার এই ভেবে ঠিক করল হোটেল দ্য লা গেরু-এ উঠবে আর স্টেশন বুফেতে ডিনার খাবে।
দশ মিনিট ধরে রিসিভারের গুঞ্জন একই আছে। বন্ড শহর ঢুকে নদীর পাড় বরাবর এক ভাল হোটেলের কাছে যেতেই দেখে গেটের কাছে রোলস রয়েস দাঁড়িয়ে। বন্ড শহরের ভেতর দিকে গিয়ে স্টেশনের কাছে চলে গেল।
হোটেলে দ্য লা গের সস্তা সেকেলে মার্কা। আরাম করে গরম পানিতে গোসল সেরে স্টেশনের রেস্তোরাঁর দিকে গেল। রোলয় রয়েস তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। সাড়ে দশটার সময় ডিনার সেরে বেরিয়ে এসে ঘণ্টাখানেক রাস্তায় ঘুরল। তারপর শেষ একবার রোলস রয়েস দেখে এসে শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকাল বেলাতেও যথাস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল গাড়িটাকে। বন্ড হোটেলের বিল মিটিয়ে রেস্তোরাঁয় সকালের নাস্তা সেরে নিল। পরে গাড়ি করে গোল্ডফিংগারের হোটেলের সামনে এসে একটা গলির ভিতর ঢুকিয়ে রাখল গাড়িটাকে। এবার আর ভুল করা চলবে না। গোল্ডফিংগার হয় নদী পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে N7 ধরে যাবেন রিভিয়েরার দিকে, কিংবা লোর নদীর উত্তর পাড় বরাবর এগিয়ে যাবেন। দ্বিতীয় পথ ধরে রিভিয়েরাও যাওয়া চলে, আবার সুইজারল্যান্ড অথবা ইটালীও যাওয়া যায়।
গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে নদীর পাড়ে একটা গাছে হেলান দিয়ে বসে নজর রাখল রোলস রয়েসের দিকে। সাড়ে আটটার সময় দুটি লোক বেরিয়ে এর দরজা দিয়ে। চালু হল রোলস রয়েস। যতক্ষণ না নদীর পাড় বেয়ে চোখের বাইরে চলে যায় ততক্ষণ অপেক্ষা করল বন্ড। চোখের আড়াল হলে বন্ড গাড়ি স্টার্ট দিল।
লোর নদীর পাড় ধরে চলল বন্ড। গ্রীষ্মকালের প্রভাতী রোদে চারদিক ভরে গেছে, এই অংশটি বন্ডের বড্ড প্রিয়। এই মে মাসে ফলের গাছগুলো সাদা হয়ে গেছে, চওড়া নদী বৃষ্টির পানিতে ভরে আছে, সমস্ত উপত্যকা সবুজে সবুজে ছেয়ে আছে।
বন্ড নিবিষ্ট মনে এইসব কথাই ভেবে চলেছে। হঠাৎ জোড়া হর্নের তীব্র তীক্ষ্ণ শব্দ করে ছোট ট্রায়নয়টা বেরিয়ে গেল সামনে দিয়ে। চালাচ্ছে ঘন নীল গগলসে অধাবৃত্ত শুরু একটি মেয়ে, মুখের একপাশ লাল টুকটুকে ঠোঁট, সাদা বুটি দেওয়া গোলাপী রুমালে বাধা চুল ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি বন্ড। মেয়েটির দৃপ্ত ভঙ্গি প্রমাণ করে সারাজীবন সে পেয়ে এসেছে প্রশংসা, কর্তৃত্ব করার মনোভাব। এই মনোভাব থেকেই চটকদার গাড়িওয়ালা যুবককে গতির প্রতিযোগিতায় পেছনে ফেলে দিতে চাইছিল সে।
বন্ড মনে মনে ভাবল, আহা অন্যদিন যদি এমন হত তাহলে মেয়েটাকে অনুসরণ করত; মহ্যাহের আগেই তাকে ধরে ফেলে নদীতীরের কোন এক রেস্তোরাঁয় বসে আলাপ পর্ব সেরে নিত। এরপর আঙ্গুরলতার ছায়ায় বসে লাঞ্চ সেরে নিয়ে পরস্পর গাড়ি চালাতে চালাতে একে অন্যকে বোঝাবার চেষ্টা করত। সুন্দর একটা জায়গা দেখে গাড়ি থামিয়ে চারদিকে অলিভ গাছের সারি, নীল বনে ঝি ঝি পোকার ডাকের মধ্যে আবিষ্কার করতে পরস্পর পরস্পরকে ভাল লেগে গেছে। যেখানে যাচ্ছিল সেখানে পরে গেলেও চলবে এই ভেবে পরের দিন মেয়েটির গাড়ি হোটেলের গ্যারেজে রেখে, নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। বড় রাস্তা এড়িয়ে পশ্চিম দিকে চলে যেত তারা যেখানে একটা মিষ্টি নামের গ্রাম আছে, যদিও সেখানে তার যাবার খুব ইচ্ছে কিন্তু হোটেল না থাকায় পাশের শহরে দুটো ঘর নিত। রাত্রে চমৎকার ডিনারের শেষে প্রথানুযায়ী শ্যাম্পেন খেয়ে তারপর…।
