পালাবার সময়ে 272-কে গুলি করে মারবার মতলব করেছে ওরা। 272 পূর্ব আর পশ্চিম বার্লিনের মাঝামাঝি যে। চৌরাস্তার কথা জানিয়েছে খবরে, সেখানে গুলি করবে। নাম দিয়েছে অপারেশন এক্সটাজ। ওদের সারামাই পারকে। লাগিয়েছে। এইটুকু শুধু জানা গেছে যে, তার সাঙ্কেতিক পরিচয় হল এমন একটা রাশিয়ান শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে ট্রিগার -বন্দুকের ঘোড়া। WB-এর ধারণা, এ-ও সেই একই লোক। প্রত্যেক দিন সন্ধ্যাবেলা সীমান্তের দিকে নজর রেখে পাহারা দিয়ে যাবে, একমাত্র কাজ হবে 272-কে খতম করা। বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে, নিখুঁতভাবে কাজ সারবার জন্য মেশিনগান বা ঐ ধরনের কিছু বসাতে চাইবে। বন্ড প্রশ্ন করল, আমার সঙ্গে সম্পর্কটা কোথায় স্যার? নীরস দৃষ্টিতে বন্ডের দিকে তাকালেন M। বুঝতেই পারছ কি তোমার কাজ। এই স্নাইপারটিকে খুন করতে হবে। কিন্তু বন্ড জানে এটা চেষ্টাকৃত। শুধু শুধু মানুষ খুন করার জন্য কাউকেই কোথাও পাঠাতে চান না M। কিন্তু যখন বাধ্য হয়ে পাঠাবার দরকার হয় তখন এমন নিষ্ঠুর ভঙ্গিতেই হুকুম করেন। বন্ড জানে খুন করতে পাঠাচ্ছে যাকে, তার মন থেকে বিবেকের ভার খানিকটা লাঘব করার জন্য করেন, তার অপরাধ বোধ খানিকটা হাল্কা করে দেবার জন্য করেন। বন্ড এসব জানে বলেই M-কে রেহাই দেবার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি এখন তবে আসি, খবর-টবর সব চীফ অব। স্টাফের কাছ থেকেই জেনে নেব।
M-এর নিরুত্তাপ গলা শোনা গেল, তোমার ওপর এরকম একটা কাজের ভার চাপালাম, কিছু মনে করো না। নিখুঁতভাবে করতে হবে।
আমার সাধ্যমত আমি চেষ্টা করব। বন্ড দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে গেল।
চীফ অব স্টাফের ব্যবহারেও নতুন কিছু নেই। তিনি বললেন, কি আর বলব জেমস, তোমার ঘাড়েই চাপল। বিলেতে গিয়ে রাত আটটা নাগাদ তোমার প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা করে এসেছি, রেঞ্জ তখন বন্ধ থাকে। বার্লিনে সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ যে ধরনের আলো থাকে সেই রকমই থাকবে। রাইফেলটা আছে আর্মারর-এর কাছে খুব ভাল টিপ করা যায়–লোক দিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে, তুমি নিজেই চলে যাবে। তারপর যাবে বার্লিনে, তোমার জন্য মাঝরাতে BEA এর একটা প্লেনের ব্যবস্থা করা আছে। আপাতত একটা ট্যাক্সি নিয়ে এই ঠিকানায় চলে যাও। একটা কাগজ বন্ডের হাতে গুঁজে দিয়ে বলে দিলেন, চারতলায় উঠে যেয়ো, ট্যাকোয়ারের দু নম্বর তোমার জন্য অপেক্ষা করবে সেখানে। সব ব্যবস্থা পাকা।
ঘড়িতে এখন দশটা পনেরো। কাল এরকম সময়ে সব কাজ শেষ। পাল্লা একদিকে 272, আর একদিকে এই ট্রিগার লোকটা–একজনের মৃত্যু দিয়ে আর একজনের জীবন কেনা। আর কিছু না ভেবে যত জোরে পারল লন্ডন এয়ারপোর্টের দিকে গাড়ি ছোটাল।
ট্যাক্সির ভাড়া ঢুকিয়ে চারিদিকে একবার দেখে নিল বন্ড। চারদিকে আগাছার জঙ্গল। ওপাশের চোরাস্তা পর্যন্ত একটানা একটা মোটা গাথুনির পাথুরে দেওয়াল। দরজায় চারতলার বোম টিপল বন্ড। ক্লিক শব্দ উঠল, ভিতরে ঢুকতেই আপনাআপনি দরজা বন্ধ হয়ে গেল। অলিন্দ পার হয়ে বন্ড লিফটে গিয়ে উঠল। এবার যা হোক, শত্ৰুপুরীতে গিয়ে ঢুকতে হচ্ছে না।
সিক্রেট সার্ভিসের স্টেশন WB-এর দু নম্বর কর্তাটি ছিপছিপে, চল্লিশের কোঠায় পা দিয়েছেন। সাদা সিল্কের শার্ট আর মার্কামারা স্কুল টাই। অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে মামুলি আলাপ পরিচয় করবার সময় লোকটাকে দেখে বিশেষ করে ওর ঐ টাইটা দেখে আরও যেন মুষড়ে পড়ল বন্ড। এরা এক একটি সিভিল সার্ভিসের খুঁটি।
এই জঘন্য কাজটায় বন্ডের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একজন মাথা ঠাণ্ডা সাবধানী লোকের দরকার ছিল। ওলেস্ গার্ড এর প্রাক্তন সৈনিক ক্যাপ্টেন পল সেন্ডারকেই বাছাই করে কাজের দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে। কাজটা তাঁরও খারাপ লাগছে। বন্ডকে তার ফ্ল্যাটের একটা ছক বুঝিয়ে দিলেন। বন্ডের সুখ সুবিধার জন্য কি কি ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে সব কিছু সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন। বড় একটা দু-বিছানার ঘর, একটা বাথরুম, আর রান্নাঘর, এই নিয়ে ফ্ল্যাট। শোবার ঘরের আসবাবের মধ্যে অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল, একটা খাট সরিয়ে আনা হয়েছে ঘরের একমেবাদ্বিতীয়ম জানালাটার কাছে, জানালা জোড়া পর্দাটার একেবারে গায়ে গায়ে, আর তাতে তিন থাক পুরু গদির উঁচু বিছানা।
ক্যাপ্টেন সোল্ডার বললেন, কোন দিকে গুলি ছোটাতে হবে, দেখে রাখবেন না কি? দেখে নিলে ও পক্ষের মতলবটা বুঝিয়ে বলতে পারি। আলোগুলো ক্যাপ্টেন সোন্ডার সব নিভিয়ে দিলেন। বললেন, পর্দা সরাতে চাইছি না, বলা যায় না 272-কে আগলাবার জন্য কোনও ব্যবস্থা হয়েছে কিনা, সেটা দেখবার জন্যই ওরা হয়ত নজর রাখছে। খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে কেবল মাথাটা যদি পর্দার বাইরে বার করে দিয়ে দেখতে থাকেন। আমি বলে দেব কোনটা কি। আগে বাঁদিকে দেখুন।
বন্ড শুয়ে পড়ে লক্ষ্য করতে লাগল–ভাঙা চোরা জমির ওপর ঘন আগাছার ঝোঁপ পেরিয়ে দৃষ্টি চলে যাচ্ছে জিমার স্টাস-এর আলোক রেখার দিকে পূর্ব জার্মানীর সীমান্ত রেখা। সামনে দেখছেন বোমা বিধ্বস্ত জমি। গা ঢাকা দেবার বিস্তর সুযোগ। এই জন্যই 272 এই জায়গাটা বেছে নিয়েছে। সীমান্তের দুদিকেই এই রকম ভাঙা চোরা পোড়া জমি। ওদিকের ঐ সব ঝোঁপঝাড় ভাঙা চোরার মধ্য দিয়ে চুপি সাড়ে এগিয়ে আসবে, জিমার স্ট্রাস-এর রাস্তাটুকু সঁ করে পার হয়েই আবার এদিকের ঐ ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে ঢুকে পড়বে। মুস্কিলের ব্যাপার হল তিরিশ গজ রাস্তা দৌড়ে পার হওয়া। মারতে যদি হয় তবে ঐ তিরিশ গজের মধ্যেই মারতে হবে। তাই তো?
