গোল্ডফিংগার না শোনার ভান করে খাওয়া থামিয়ে পানি খেল। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললেন, ক্যারাটের মূল তথ্য হল মানুষের শরীরে পাঁচটি অঙ্গকে আঘাত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এছাড়াও সাইত্রিশটা দুর্বল জায়গা আছে, অবশ্য সেট বিশেষজ্ঞরাই জানতে পারে। দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে হাত পা ওরকম শক্ত হয়ে যায়, রোজ অব এক ঘণ্টা ধরে হাত পা মোটা ডালের দড়ি দিয়ে খুঁটি মেরে শক্ত করে রাখে। সেইসঙ্গে নানারকম শারীরিক কসরত।
–আর টুপি ছোঁড়া প্র্যাক্টিস করে কখন?
— কথায় বাধা পড়তে পোন্ডফিংগার ভুরু কোঁচকালেন। সে আমি কোনদিন দেখিনি তবে বুঝতে পারছ তো সবরকম দক্ষতা অভ্যাসের সাহায্যে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। যাই হোক ক্যারাটের কথা জানতে চাইছিলে তো, এর উৎপত্তি চীনদেশে। সেখানকার পরিব্রাজ করা নিরস্ত্র অবস্থায় থাকত আর চোর ডাকাতদের সহজ শিকার ছিল। তারাই তখন এই কৌশল নিজেরাই আবিষ্কার করল। পরবর্তী কালে জাপান অধিকৃত ওকি নাওয়া দ্বীপে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায় তারাই ক্যারাটে বিদ্যাটাকে আরো আধুনিক, উন্নত করে তোলে। যাতে শরীরের পাঁচটি অঙ্গ পাঁচটি মারাত্মক অস্ত্রে পরিণত হয়। এই পাঁচটি অঙ্গ হল–মুষ্টি, হাতের পাশের দিক, আঙ্গুলের ডগা, পায়ের গোড়ালি, কনুই। দীর্ঘ– অভ্যাসের সাহায্যে এগুলোকে শক্ত করে নিতে হয়। আমি দেখেছি ইটের দেওয়ালে গায়ের জোরে আঘাত করলেও অডজবের হাতে একটুও লাগে না। পরপর তিন লাইন আধইঞ্চি কাঠের তক্তাও টুকরো করে দেয়, আর পা দিয়ে কি করে তা তো দেখলে।
বন্ড মদে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, অঞ্জবের জন্য তোমার আসবাবপত্রের কি হাল হচ্ছে।
তাচ্ছিল্যভরে গোল্ডফিংগার বলে উঠল, এ বাড়িতে আর বেশিদিন থাকছি না। তাছাড়া আমি ভাবলাম ওর কেরামতি তোমার ভাল লাগবে। আশা করি বিড়ালটা ওকে বখশিশ দিয়ে ভুলে করিনি।
-ও কি বিড়ালের ওপর ক্যারাটে প্র্যাকটিস করবে নাকি?
-বেড়াল ও সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য। ছোট বেলায় ওদের দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়াতে তখন থেকেই অভ্যাসটা শুরু হয়েছে।
বন্ড আলোচনার গভীরে যেতে চাইল এরকম এক লোককে তোমার কেন দরকার সঙ্গী হিসেবে, ও তো সুবিধের নয়।
–তুড়ি মেরে চাকরদের ডেকে বললেন, মিঃ বন্ড; আমি ধনী লোক। আর ধনী লোকেদের সম্পত্তির মত নিরাপত্তা বাড়ানোরও প্রয়োজন আছে। যে সব দেহরক্ষী বা গোয়েন্দা পাওয়া যায় তারা সবাই অবসর প্রাপ্ত পুলিশকর্মী। এরা কাজ করতে পারে না। হাত পা চালায় আস্তে আস্তে, সেকেলে কাজকর্ম, আর ঘুষ খেতে ওস্তাদ। নিরাপত্তার প্রয়োজনে। এদের চলে না। কোরিয়ানদের এরকম কোন দুর্বলতা নেই। সেজন্য গত মহাযুদ্ধে এদেরকে বন্দী শিবির পাহারা দেবার কাজে লাগান হয়েছিল। এরা পৃথিবীর সব থেকে নিষ্ঠুর, নির্ভীক জাত।
এইসব গুণাগুণ দেখেই আমি আমার চাকরদের বাছাই করেছি। ভাল কাজ দিয়েছে বলে কোন অভিযোগ নেই। আমার। বদলে আমিও দিয়েছি ভাল মাইনে, ভাল খাবার, বাসস্থান। যখন ওদের মেয়েমানুষের প্রয়োজন হয় লন্ডন থেকে নিয়ে আসা হয়। উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে আবার ফেরত পাঠিয়ে দিই। মেয়েদের দেখতে ভাল না হলেও গায়ের রঙ সাদা। এই সাদা চামড়ার ওপর কোরিয়ানদের প্রবল আসক্তি। মাঝে মাঝে এ নিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটে, তবে টাকা এমনই জিনিস সব চাপা পড়ে যায়।
বন্ড হাসল।
কথাটা ভাল লাগল বুঝি? এটা আমার নিজের তৈরি। নিঃশব্দে খেয়ে চলেছে তারা। দু জনে অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে। বন্ড রীতিমত আশ্বস্ত। গোল্ডফিংগার কিছু কিছু কথা জানিয়ে দিচ্ছেন তাকে, হয়ত বন্ড যে বাড়ি ঘুরে দেখেছে এটা আন্দাজ করে গোল্ডফিংগার খুশি হয়েছেন। মনে মনে যে বন্ড নিপাট ভদ্রলোক নয় তার ভেতরেও যে প্যাচ আছে এটা।
বন্ড চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাল। বলল গাড়িটা তোমার চমৎকার। ঐ সিরিজের একেবারে শেষের দিকের নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, ১৯২৫-এর মডেল তাই না?
ঠিক ধরেছ, তবে আমি কয়েকটা বাড়িতে জিনিস লাগিয়েছি। স্প্রীং শক্ত করেছি, ব্রেকের জোড় বাড়াবার জন্য ডিস্ক ব্রেক লাগিয়েছি।
তাই নাকি! কেন বল তো? গাড়িটার সর্বোচ্চ গতি তত ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইলের বেশি হবে না। তাছাড়া ওজনই বা কত যে জোরাল ব্রেক লাগিয়েছ।
গোল্ডফিংগার জ তুলে তাকিয়ে বললেন, তাই নাকি? পুরো এক টন ওজনের লোহার পাত আর আর্মারড গ্লাস লাগানোর পরে গাড়িটা আর তেমন হাল্কা নেই।
বন্ড হাসল, আচ্ছা, তাই নাকি? তুমি দেখছি তোমার নিরাপত্তার জন্য কোন ব্যবস্থা বাদ দাও না। কিন্তু প্লেনে করে অত বড় গাড়ি ইংলিশ চ্যানেল পার কর কি করে প্লেনের মেঝে ভেঙে যাবে তো?
–আমার বিশেষ প্লেন আছে। সিলভার সিটি কোম্পানির যারা প্লেন ভাড়া দেয় তারা গাড়িটা চেনে। বছরের দু বার আমি গাড়ি নিয়ে পারাপার করি।
-ইওরোপ বেড়াতে যাও বুঝি?
গলফ খেলতে।
দারুণ ব্যাপার তো। আমারও ইচ্ছা ওরকম একটা ট্রিপ দেওয়ার।
গোল্ডফিংগার টোপটা গিললেন না। বলে উঠলেন তোমার তো পকেটে যথেষ্ট টাকা, গেলেই হয়।
বন্ড হেসে বলল, ও ঐ বাড়তি দশ হাজার ডলারের কথা বলছ! কিন্তু আমি যদি কানাডায় চলে যাব ঠিক করি তাহলে ওটা তো দরকার হবে না।
-তোমার কি মনে হয় কানাডায় গিয়ে ভাল রোজগার করতে পারবে, তা খুব বেশি টাকার দরকার নাকি?
