অডজব মাথা নেড়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।
বন্ড অতিকষ্টে নিজের বিতৃষ্ণা চাপা দিল। সে বুঝতে পারল এই প্রদর্শনীর সাহায্যে তাকে জানিয়ে দিলেন, আমার ক্ষমতা দেখলে তো বন্ড। আমি সহজেই তোমায় মেরে ফেলতে পারতাম, অজুহাত দেখাতাম কসরত করার সময় ভুলে অডজবের সামনে এসে পড়েছিলে। আমি নির্দোষ প্রমাণিত হতাম। তোমার বদলে বেড়ালটাকে শাস্তি পেতে হল, বেচারা।
বন্ড সহজভাবেই প্রশ্নটা করল, লোকটা সব সময় বোকার হ্যাট পরে থাকে কেন?
–কোরিয়ান লোকটি চাকরের দরজার কাছে চলে গেছে তাকে সেখান থেকে ডাকলেন গোল্ডফিংগার অডজব টুপিটা। বলে ফায়ার প্লেসের পাশে একটি কারুকার্য করা কাঠের প্যালেসের দিকে ইঙ্গিত করলেন।
বেড়ালটাকে কোলে নিয়েই ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘরের মাঝ বরাবর এসে টুপিটা খুলে নিল, সবটুকু গায়ের জোর দিয়ে ছুঁড়ে দিল আড়াআড়ি ভাবে। ঘটাং করে শব্দ হতে দেখা গেল টুপির কানাটা গোল্ডফিংগারের ঘরের প্যানেলের গায়ে। গেঁথে ঝুলে আছে। তারপর ঠং করে বসে পড়ল মেঝেতে।
বন্ডের দিকে স্মিতভাবে তাকিয়ে হেসে উঠলেন, বললেন, টুপিটা একরকম হাল্কা অথচ কঠিন মিশ্ৰধাতু দিয়ে তৈরি মিঃ বন্ড। তার ওপর বেল্ট দেওয়া। একবার ছুঁড়তে বেল্টের আবরণটা নষ্ট হয়ে গেছে। ওর সেলাইয়ের হাত খুব ভাল আর একটা লাগিয়ে নেবে। নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে ঐ টুপির আঘাতে যে কোন মানুষের মাথা কেটে যেতে পারে অথবা গলা দু টুকরো। একটা সহজ সুন্দর গুপ্ত অস্ত্র সে বিষয়ে সন্দেহ নেই মিঃ বন্ড।
–হ্যাঁ নিশ্চয়ই। হাতের কাছে এমন একটা লোক থাকলে খুব কাজ দেয় হেসে বলল মিঃ বন্ড।
অডজব চলে যেতে একটা ঘণ্টার শব্দ শুনে গোল্ডফিংগার বলল, ডিনার তৈরি খাওয়া যাক।
ফায়ার প্লেসের কাছে লুকনো একটা বোতাম টিপতেই এক অদৃশ্য দরজা খুলে গেলে তারা ভিতরে ঢুকল।
খাবার ঘরটাও অন্যান্য অংশের মত জমকালো। ঝাড়লণ্ঠন ও টেবিলের একরাশ মোমবাতির আলোয় ঘর ভরে। গেছে। টেবিলে রূপোর আর কাঁচের বাসন আলোয় ঝকমক করছে। সাদা মেস জ্যাকেট পরা বেয়ারা পাশের সার্ভিং টেবিল থেকে এনে খাবার দিচ্ছে। প্রথম পদটা ঝোলমাখা ভাত-এর মত কি একটা, দেখে ইতস্তত করছে বলে বন্ডকে বললেন, ভয়ের কিছু নেই মিঃ বন্ড ওটা চিংড়ি মাছ-এর পদ, বিড়ালের নয়।
-আচ্ছা নির্বিকার ভাবে জবাব দিল বন্ড।
–জার্মান মদটা একটু খেয়ে দেখ না। ভালই লাগবে। নিজে নিয়ে নাও নয়ত ঐ লোকগুলো গ্লাসের বদলে প্লেটে ঢেলে দিতে পার।
বন্ডের সামনেই একটা বরফের বাক্সের মধ্যে মদটা রাখা ছিল। অল্প একটু খেয়ে দেখল, চমৎকার স্বাদ মদটার। বন্ড গৃহকর্তাকে অভিনন্দন জানালে সে মাথা নিচু করে তা গ্রহণ করল।
আমি নিজে মদ, তামাক কোনটাই খাইনা, মিঃ বন্ড। মানুষের এই একটা আচরণ খুব হাস্যকর লাগে আমার। তাছাড়া এটা তো প্রকৃতি বিরুদ্ধও। মুখে এক ছিটে আবেগ প্রকাশ করে বলল, জঘন্য অভ্যাস। কল্পনা করা যায় কোন জানোয়ার একগাদা ধূমায়িত খড় মুখে নিয়ে ধোয়া টানছে আর ছাড়ছে।
আর মদের ব্যাপারে বলতে গেলে, একজন রাসায়নিক হিসেবে আমি বলতে পারি প্রত্যেক মদে অন্তত কয়েক প্রকারের বিষ আছে। এর মধ্যে কিছু মারাত্মক। ওগুলোর যে কোন একটা খেলে মারা যাবার সম্ভাবনা। যে সামান্য বিষটুকুও পেটে যায় তাতেই নানা উপসর্গ দেখা যায়, যে গুলোকে হ্যাংওভার বলে চালান যায়।
খেতে খেতে থেমে গেলেন গোল্ডফিংগার। বললেন মদ খাওয়া যখন হয়, তখন একটা ভাল উপদেশ দিই। নেপোরিয়ন ব্র্যান্ডি কখনো খেওনা, ওতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বিষাক্ত বস্তু আছে। বলে আবার খাওয়ায় মন দিলেন।
-ধন্যবাদ, মনে থাকবে। তাছাড়া সেই জন্যই ভদকা ধরেছি। ভদকাকে পরিস্রত করা হয় বলে অনেক বিষাক্ত জিনিস বাদ পড়ে যায়। একটা প্রবন্ধ এই কথাটা পড়েছিল বন্ড, সেটা দিয়েই নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করল সে। এইজন্য মনে মনে গর্বও অনুভব করল সে।
গোল্ডফিংগার তীক্ষ্ণ চোখে বলে উঠল কিছু কিছু জ্ঞান আছে দেখছি তোমার। কেমিষ্ট্রি পড়েছ?
-এই অল্প স্বল্প বলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করল। তোমার ড্রাইভারটার কাণ্ড দেখে তো আশ্চর্য হয়ে গেছি। ঐ সব কায়দা কোত্থেকে শিখেছে। কোথাকার বিদ্যে এটা? কোরিয়ানদের সবাই এসব জানে নাকি? গোল্ডফিংগার ন্যাফকিন দিয়ে মুখ মুছে তুড়ি দিলেন। এবার খানসামা খালি প্লেট সরিয়ে নিয়ে হাঁসের রোস্ট আর বন্ডের জন্য ১৯৪৭ এর সুতো রথসচাইল্ড মদ এনে দিয়ে আবার সার্ভিং টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। গোল্ডফিংগার শুরু করলেন, কখনও ক্যারাটে-এর নাম শুনেছ ক্যারাটে বিদ্যের সর্বোচ্চ সম্মান ব্ল্যাক বেল্ট, সারা পৃথিবীতে মাত্র তিনজন অর্জন করেছে। আমার লোকটি তাদের মধ্যে পড়ে। ক্যারাটে আসলে জুজুৎসুর একটি শাখা, গুলতি ও মেশিনগানের যেমন তফাৎ জুজুৎসু ও ক্যারাটের তাই।
–সে তো দেখতেই পেলাম।
ওর যেটুকু কেরামতি দেখলে সবটাই ছেলেখেলা। হাঁসের ঠ্যাং চিবোতে চিবোতে বললেন, অডজব যদি তোমার শরীরের সাতটি জায়গার কোন একটিতে ঠিকমত আঘাত করে তবে তোমার মৃত্যু নিশ্চিত। গোল্ডফিংগার পরম তৃপ্তির সঙ্গে মাংস খেতে লাগলেন কথাটা বলে।
বন্ড গম্ভীরভাবে বলে উঠল, বল কি? আমি তো মাত্র পাঁচ রকম জানি, যাতে অজ-এর মত লোককে একঘায়ে শেষ করা যায়।
