গোল্ডফিংগার সবটা শুনে বললেন, হ্যাঁ ব্যাপারটা বেশ জটিল। তোমার খেলার ধরনটা আমার থেকে আলাদা। আমি যেভাবে খেলি তাতে সবরকম গলফ ক্লাব ব্যবহার করতে পেলে সুবিধে হয়। যাগে তুমি বস। আমি হাত মুখ ধুয়ে এখনি আসছি।
বন্ড আর এক গ্লাস পানীয় ঢেলে নিয়ে গোল্ডফিংগারকে দেখল, সিঁড়ি দিয়ে উঠে করিডোরে গেল। উত্তেজনায় খেয়াল করেনি বইটা উল্টে ধরে আছে। বই সোজা করে নিয়ে একটা প্রাসাদের ফটোর দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইল।
দোতলায় সব চুপচাপ। শুধু বাথরুমের চেন টানার শব্দ, দরজার খট করে আওয়াজ। বন্ড গ্লাসে আর এক চুমুক দিল, দেখল গোল্ডফিংগার সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন। গোল্ডফিংগার তার দিকেই এগিয়ে আসছে। বন্ড বই নামিয়ে তাকাল তার দিকে, দেখে হাতে সেই বাদামী বিড়ালটা। ফায়ার প্লেসের কাছে নিচু হয়ে বেল টিপলেন।
বন্ডের দিকে ফিরে বললেন, বিড়াল ভাল লাগে তোমার?
বেশ ভালই লাগে।
চাকরদের ঘর থেকে ড্রাইভারটা বেরিয়ে এল, নিরুত্তাপ চোখে গোল্ডফিংগারের দিকে তাকিয়ে রইল। ইশারায় কাছে। ডাকলেন।
এবার বন্ডের দিকে ফিরে বললেন, এ হল আমার পার্শ্বচর। কথাটা অবশ্য ইয়ার্কির মত শোনাচ্ছে। ওকে অড় জব বলে ডাকি, কারণ ওর কাজ হচ্ছে টুকিটাকি কাজকর্ম করা অর্থাৎ অডজব। তোমার হাতটা একটু দেখাও তো বন্ডকে অডজব।
কোরিয়ান লোকটি হাতের দস্তানা খুলে সামনে এসে দু হাত বাড়িয়ে দিল। বন্ড উঠে দাঁড়িয়ে হাত দুটো দেখাল। বিশাল তালু, সুকঠিন পেশিতে ভরা। সবকটা আঙ্গুল সমান মাপের, তবে ডগাগুলো ভেত, আর এত চকচকে যেন মনে হয় হলদে হাড়ের তৈরি।-হাত উপুড় করে পাশের দিকটা দেখাও।
আঙ্গুলগুলোর নখ নেই, তার বদলে শক্ত হলদে খোলে ঢাকা। লোকটা হাত কাত করে ধরল, হাতের পাশ বরাবর একই হাতের মত বস্তু।
বন্ড গোল্ডফিংগারের দিকে তাকাতে সে বলল, এবার ওর কেরামতিটা দেখ। সিঁড়ির ধার বরাবর কাঠের রেলিংটা ছ ইঞ্চি চওড়া, চার ইঞ্চি পুরু, সেই দিকে ইঙ্গিত করলেন তিনি। কোরিয়ান লোকটি বাধ্য ছেলের মত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। গোল্ডফিংগার ঘাড় নাড়াতে কোরিয়ান লোকটি নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে ডান হাতটা সোজা মাথার ওপর তুলে কুঠারের মত আঘাত হানল পালিশ করা রেলিংয়ের ওপর। অতএব রেলিংটা ভেঙে ঝুলে পড়ল। আরেকবার হাতটা ওঠা নামা করাতেই শুধু হাঁ করা কতগুলো এবড়ো-খেবড়ো গর্ত দেখা গেল। ঘরের মেঝেতে কাঠের টুকরো ভর্তি হয়ে গেছে। কোরিয়ান লোকটি পরবর্তী জিনিসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু তার মুখে পরিশ্রমের বা গর্বের কোন চিহ্নই নেই। গোল্ডফিংগার ইশারা করতে নিচে নেমে এল। তিনি বললেন ওর পায়ের অবস্থাও একইরকম। লোকটিকে আদেশ দিলেন, অডজব.ফায়ার প্লেসের তাকটা। ফায়ার প্লেসের ওপর ভারি কারুকাজ করা একটা তাক, মেঝে থেকে সাত ফুট আর কোরিয়ান লোকটির টুপির চেয়ে ছ ইঞ্চি ওপরে।
গার্চ আ হায়?
–হ্যাঁ। কোট আর টুপি খুলে রাখ। গোল্ডফিংগার বন্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, বেচারার টাকায় একটা গর্ত আছে তাই কথাগুলো ঐ রকম, আমি ছাড়া কেউ বুঝতে পারে না।
বন্ড ভাবল ব্যাপারটা বেশ সুবিধের। একজন ক্রীতদাস যার কথা মালিক ছাড়া কেউ বোঝে না, হারেমের বোবা কালা দাসেদের থেকেও কাজের, কারণ এরা বেশি অনুগত হতে বাধ্য।
অডজব কোট, টুপি খুলে প্যান্টের পা দুটো হাঁটু পর্যন্ত মুড়ে জুজুৎসু খেলোয়াড়ের মত সুদৃঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়াল, দেখে মনে হল ভারি হাতি যদি তার দিকে আসে তাহলেও সে নড়বে না।
-তুমি একটু সর মিঃ বন্ড? এই আঘাতের মানুষের মাথা পর্যন্ত গুঁড়িয়ে যায়। কথা বলার সময় দাঁতগুলো যেন। ঝকঝক করে উঠল। গোল্ডফিংগার লম্বা সোট আর পানীয়ের ট্রে সরিয়ে দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে দিলেন। কিন্তু অত উঁচু তাকের নাগাল সে কি করে পাবে?
মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রইল বন্ড। অডজবের হলদেটে চ্যাপ্টা মুখ একাগ্রতায় জ্বলজ্বল করছে। বন্ড মনে মনে ভাবল এমন আগ্রাসনের সামনে পড়লে মৃত্যু অনিবার্য।
গোল্ডফিংগার হাত তুলে ইশারা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এক পা এগিয়ে গেল, পরক্ষণেই দু পা সহসা উঠে গেল শূন্যে। হাওয়ার বুকে দুই পা সশব্দে ঠোক্কর খেয়ে আরও উঁচুতে উঠে গেল, তারপর শরীরটা বা দিকে বাঁকিয়ে, ডান পা ছুটিয়ে দিল লক্ষ্য স্থলের দিকে। মড়াৎ করে শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অডজব স্বচ্ছন্দ গতিতে মাটিতে নেমে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
অডজবের পায়ের আঘাতে তাকের তিন ইঞ্চি গভীর অংশ উড়ে গেছে। তার চোখে মুখে এখন সাফল্যের চাপ।
বন্ড গভীর বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। দু রাত আগে সে কিনা নিরস্ত্র লড়াইয়ের ওপর বই লিখতে যাচ্ছিল। এ বিষয় তার যা জ্ঞান আছে তা নেহাতই তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছে-এ লোকটির ক্ষমতার কাছে। এ যেন রক্তমাংসের মানুষ নয়, এক জীবন্তু মুগুর, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী। বন্ড এই আশ্চর্য মানুষটিকে সম্মান জানাবার জন্য করমর্দন করতে চাইল।
-আস্তে অডজব কড়া গলায় বললেন গোল্ডফিংগার।
কোরিয়ান লোকটি মাথা নিচু করে করমর্দন করল। বন্ডের মনে হল এক টুকরো কাঠ ধরে আছে। এরপর সে পোশাকের দিকে এগিয়ে গেল।
-কিছু মনে কর না বন্ড, তোমার এ ব্যবহারে আমি খুশিই হয়েছি। কিন্তু নিজের গায়ের জোর সম্পর্কে অডজব মোটেই সচেতন নয়–বিশেষ করে যখন উত্তেজিত থাকে। ওর হাতগুলো হচ্ছে যন্ত্রের মত। ও নিজের অজান্তেই তোমার হাতটাকে পিষে ফেলত। আচ্ছা এবার… বলে অডজবের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাল কাজ দেখিয়েছ তুমি, তোমার ট্রেনিং ঠিকমত চলছে দেখে খুশি হয়েছি। এই নাও বলে বিড়ালটা তার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। গোন্ডফিংগার বললেন, বিড়ালটা আমাকে জ্বালাতন করে খুব। তুমি এটাকে খেয়ে ফেলতে পার। আর রান্নাঘরে বল আমাদের ডিনারের ব্যবস্থা করতে।
