ঘরের সব আলো জ্বলছে। বাথরুমে কেউ আছে ভেবে সোজা গিয়ে দরজা খুলল। না জনপ্রাণী নেই। বাথরুমটা বেশ বড়। অনেক ব্যায়ামের সরঞ্জাম আছে। আলমারিতে নানান জাতের জোলাপ ছাড়া অন্য কোন ওষুধ নেই। পুরুষ মানুষের শোবার ঘর যেমন হওয়া উচিত এটাও সেরকমই আরামদায়ক, বহু ব্যবহৃত। দেওয়ালে অনেকগুলো ছোট আলমারি, বিছানার একপাশে একটা বুককেসে ইতিহাস ও জীবনী সাজান–সবই লেখা ইংরাজি ভাষায়। পাশের টেবিলের ড্রয়ার থেকে প্যারিসের প্যালেডিয়ান পাবলিকেশান-এর প্রেমের গোপন কথা বইটি পাওয়া গেল। এই একটিই বিশ্রী জিনিস পাওয়া গেল।
বন্ড ঘড়ি দেখল, তার আসতে আর পাঁচ মিনিট বাকি। শেষবারের মত চোখ বুলিয়ে নিতে গিয়ে ষষ্ঠইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। কোথাও অসামঞ্জস্য আছে এই ঘরে, কোন অস্বাভাবিক রঙ, গন্ধ? শব্দ? ঠিক! এখান থেকে শোনা যাচ্ছে। অতি মৃদু মশার বো বো আওয়াজের মত একঘেয়ে শব্দ। আওয়াজটা এত ক্ষীণ যে শোনাই যায় না। কোথা থেকে আসছে এই শব্দ?
উত্তেজিতভাবে বন্ড দরজার পাশের দেয়ালে লাগান আলমারিটার ডালা সন্তর্পণে খুলল। হা-এর ভিতর থেকেই আসছে শব্দটা, কোট সরিয়ে জিনিসটা দেখামাত্র বন্ডের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
আলমারির ওপরের দিকে তিনটে ফুটো আর তার ভিতর দিয়ে তিন লাছি ১৬ মিলিমিটার ফিলন একে বেঁকে জমা হচ্ছে সাজান ড্রয়ারগুলোর পেছনে রাখা পাত্রের মধ্যে। রাশিকৃত ফিল্মে পাত্রটা ইতিমধ্যে ভর্তি হয়ে গেছে।
এই তাহলে গোল্ডফিংগারের পঁাচ, তার ওপরে নজর রাখা হচ্ছে। তিনটে মুভি ক্যামেরা কোথায় লাগান আছে কে জানে! বাড়ি থেকে বেরোবার আগে তাহলে ক্যামেরা অন করে দিয়ে গেছে এবং সেই জন্য জ্বালিয়েছে অজস্র আলো। তার মানে প্রথম থেকেই তার গতিবিধির ছবি উঠে গেছে। বন্ডের কি কল্পনাশক্তি কমে আসছে না হলে এই আলো জ্বলার তাৎপর্য সে বুঝতে পারল না কেন?
কোন অজুহাত আর দেখান যাবে না। আর সব থেকে বাজে ব্যাপার এত করেও তার গোপন খবর সে আবিষ্কার করতে পারেনি। গোল্ডফিংগার তার সব কীর্তিকলাপ ধরে ফেলেছে। বন্ড কি করবে ভেবে পেল না, স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল ফিল্ম-এর দিকে।
অজুহাত তৈরির চেষ্টা করলেও সেগুলো বাতিল করতে হল। আচ্ছা আলমারি খোলার সময় আলো লেগে কিছুটা নষ্ট হয়ে গেছে কি? তাহলে সবটাই নষ্ট করে ফেললে হয়; অবশ্য বুঝতে পারবে এটা বন্ডেরই কাজ।
হঠাৎ বিড়ালটার ডাক কানে এল। বিড়ালটাকে দিয়ে কিছু একটা করাতে হবে, যেই ভাবা অমনি কাজ। দরজার বাইরে থেকে বিড়ালটাকে নিয়ে এগিয়ে গেল আলমারির দিকে। বন্ড ঝুঁকে পড়ে আলমারি থেকে ফিল্মগুলো নিয়ে আলোয় ধরতে লাগল শেষে যখন নিশ্চত হল ফিল্মের বারটা বেজে গেছে তখন সেগুলো নামিয়ে রেখে বিড়ালটাকে তার ওপর বসিয়ে দিল। বেড়ালটা এখান থেকে বেরোতেও পারবে না আর বন্ডের যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় তবে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়বে।
এবার আলমারির দরজাটা একটু ফাঁক করে দিল যাতে বাকিগুলো নষ্ট হয়ে যায় আলো লেগে। শোবার ঘরের দরজাও সেই পরিমাণ ফাঁক রেখে দৌড়ে প্যাসেজ পেরিয়ে এসে সিঁড়ির কাছে এসে আস্তে আস্তে নিচে নামতে লাগল। নিচে এসে গ্লাসে খানিকটা মদ ঢেলে দ্য-ফিল্ড পত্রিকাটি নিয়ে গলফ সংক্রান্ত ডারউইনের লেখার বিষয়বস্তুটা পড়ে, চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাল।
কিছু পেল বন্ড, এত কাণ্ডকারখানাই সার হল। শুধু গোল্ডফিংগারের চরিত্র, নোংরা মনোবৃত্তি, এইসব জেনে কিছুই লাভ হল কি? বন্ডকে যাচিয়ে নেবার প্রক্রিয়াটা SMERSH-এরই উপযুক্ত, কোন আনাড়ীর কর্ম নয়। যার কিছু গোপন করার থাকে তারই মাথায় এত প্যাঁচ আসে।
এখন একটাই কথা বেড়ালের অ্যালিবাই ধোপে টিকবে কি? ঘটনাটা অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব বলেই ভাববে গোল্ডফিংগার, একটা বিড়াল আলমারির ভিতর ঢুকে পড়ে কি করে? গোল্ডফিংগার নিশ্চিত জানবে যে বন্ডই তার ঘরে ঢুকেছিল, আর ফিল্ম নষ্ট সেই করেছে।
বন্ড উঠে দাঁড়িয়ে আরো কয়েকটা পত্রিকা নিয়ে এসে জড় করল চেয়ারে। এখন একমাত্র কর্তব্য ভবিষ্যৎ বলে যদি কিছু থাকে তার জন্য সতর্ক হওয়া। এরপর থেকে তাকে সাবধান হতে হবে, নইলে বিপদে পড়লে জগতের সব বাদামী বেড়াল মিলেও তাকে উদ্ধার করতে পারবে না।
ঘাড়ের ওপর এক ঝলক হাওয়া লাগলেই বুঝতে পারল গোল্ডফিংগার এসে গেছে। আশ্চর্যের বিষয় গাড়ির আওয়াজ হয়নি, শব্দও শোনা যায়নি।
.
লোকটির নাম অড–জব
সদর দরজা বন্ধ হবার শব্দে
হাতের পত্রিকা রেখে বন্ড উঠে দাঁড়াল। পিছন ফিরে বলল–আরে! তোমার গাড়ির আওয়াজ পেলাম না তোর ওদিকে কি হল!
গোল্ডফিংগারও সহজ ভাবে বলল, ওঃ ওসব আপনা থেকেই ঠিক হয়ে গেছে। মদের আড্ডায় মার্কিন বিমান। বাহিনীর লোকের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়েছিল। তারা নাকি চাকরটিকে জাপানি বলে গালাগাল দিয়েছিল। আমি পুলিশের লোকদের বুঝিয়ে বললাম কোরিয়ানদের জাপানি বললে অপমানিত বোধ করে। তাই পুলিশ আমার লোকটিকে সতর্ক করে ছেড়ে দিল। দেরি হল বলে দুঃখিত, তা তোমার কোন অসুবিধা হয় নি তো? আর এক গ্লাস নাও।
ধন্যবাদ। তুমি যাবার পর সময় কোথা দিয়ে কেটে গেছে বুঝতেই পারিনি, চৌদ্দটা ক্লাব নিয়ে লেখা ডারউইনের বক্তব্য পড়ছিলাম, বেশ অদ্ভুত চিন্তাধারা… বলে নিজের মতামত সহ বিস্তৃত বিবরণ দিতে শুরু করল।
