এ ধরনের কথাবার্তা উচ্চবিত্তদের সমাজেই হয়। গোল্ডফিংগার যে বন্ডকে নিজের সমকক্ষ হিসেবে দেখছেন এতে মজা পেয়ে বন্ড বলর, নেমন্তন্ন পেয়ে তো আমি খুশি। ঝামেলা দিয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে পড়ছিলাম। তাছাড়া র্যামসগেটে সময়ে কাটাবার জায়গাও তো নেই।
-তা নেই। আচ্ছা, কিছু যদি মনে করো, আমার এই মাত্র একটা ফোন এসেছিল, আমারই এক কোরিয়ান কর্মচারি কাছের এক মেলায় কি গণ্ডগোল করেছে মাথা গরম করে, তাই পুলিশী ঝামেলা হয়েছে একটু সেটা মেটাতে আমাকে বেরতে হবে। ড্রাইভার আমার সঙ্গেই যাবে। আমার আধ ঘণ্টা মতন লাগবে কাজ সারতে, তা তুমি ততক্ষণ বই পড়, পানীয়ও নিতে পার। আশা করি আমার মাফ করে দেবে। কথা দিচ্ছি আমরা এখনই ফিরে আসব।
-তাতে কি হয়েছে। মুখে এই কথা বললেও বন্ড যেন একটা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেল, গোল্ডফিংগারের কি যে মতলব বোঝা যায় না।
-ঠিক আছে, চলি তাহলে, কিন্তু তার আগে আলো জ্বালিয়ে দিই, ঘরটা বড় অন্ধকার। গোল্ডফিংগার একরাশ সুইচ টিপতেই সারা ঘর ঝলমল করে উঠল। সাধারণ বাতি, ব্র্যাকেটে লাগান বাতি, ঝাড়বাতির আলোর বন্যায় ঘর ভেসে যেতে যেতে দেখল গোল্ডফিংগার বেরিয়ে গেল, এবং সঙ্গে সঙ্গেই অন্য গাড়ির একটা শব্দ।
পুরনো অভ্যেসমত দরজার বাইরেটা একবার খুলে দেখে নিল। সব ফাঁকা। গোল্ডফিংগারের গাড়িটা বাদিকে ঘুরে রাস্তায় পড়ল, তারপর মার্কেটের দিকে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল বন্ড। শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ। ঘরের অন্যদিকে গিয়ে অন্য একটা দরজা খুলল, একটা লম্বা, অন্ধকার সুরু রাস্তা চলে গেছে বাড়ির পিছনদিক পর্যন্ত। দরজা বন্ধ করে আলোয় ভরা ঘরটাকে দেখে মনে হল এই ঘরের যাবতীয় গুপ্তরহস্য জানবার জন্য একলা রেখে দেওয়া হয়েছে বন্ডকে। কিন্তু কেন?
ট্রে থেকে কড়া এক গ্লাস জিন অ্যান্ড টনিক ঢালল। সে ভাবল ফোন এসেছিল ঠিকই, তবে পাশের কারখানা থেকেও তো ফোন আসার ব্যবস্থা করা যায়, চাকরের পুলিশে ধরার কাহিনীটাও যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য, তাছাড়া বারবার বলেছেন আধঘন্টা দেরি হবে, আর বন্ডকে একলা থাকতে হবে। তবে কি বন্ডের সামনে টোপ ফেলেছেন। কেউ কি নজর রাখছে। তার ওপর? একজন কেউ আছে এ বাড়িতে, এইসব চিন্তা করতে করতে ঘড়ির দিকে তাকাল, পাঁচ মিনিট হয়েছে। সবে।
বন্ড মনস্থির করল, ফাঁদ হোক আর যাই হোক এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। ঝট করে বাড়িটা একবার দেখে নিতে হবে–তবে এমনভাবে যাতে ধরা পড়লে অজুহাত দেওয়া যায়। কি জবাব দেবে সে? গাড়িটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাই মিস্ত্রী ডাকতে কারখানায় গিয়েছিল। এতেই মনে হয় কাজ চলে যাবে বলে পানীয়টুকু শেষ করে বেরিয়ে এল।
আলোর সুইচটা দেখতে পেয়ে আলোটা জ্বালিয়ে দ্রুত প্যাসেজ ধরে এগিয়ে গেল। প্যাসেজের শেষে দেওয়াল আর দুদিকে দুটো দরজা। একটার থেকে রান্না বান্নার শব্দ আসছে। ডানদিকের দরজা খুলে দেখল একটা উঠোন আর আশ্চর্যের বিষয় উঠোনে আলো ঝলমল করছে। উঠোনের ওপাশ থেকে যন্ত্রপাতির শব্দ কানে আসছে, কারণ ওটাই কারখানার দেওয়াল।
ঠিক সামনের দেওয়ালে একটা কাঠের দরজা। বন্ড এদিক-ওদিক স্বাভাবিক ভাবে দেখে ভোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকল। সামনেই ছোট একটা অফিসঘর, আরো জ্বলছে। সামনে ডেস্কে কিছু কাগজ, একটা টাইম লক, দুটো ফাইলিং ক্যাবিনেট আর একটা টেলিফোন। অফিস থেকে কারখানায় যাবার জন্য একটা দরজা, পাশে ছোট জানালা-কর্মীদের ওপর নজর রাখার জন্য বোধহয়। এটা ফোরম্যানের অফিস। বন্ড এবার জানালার বাইরে তাকাল।
বিশেষ কিছু দেখতে পাবে না জানত, তবে যা দেখল তা ঢালাইয়ের কারখানাতেই থাকে। সামনে দুটো ফার্নেস, তার পাশে একসারি ধাতু গলানোর চুল্লী, দেওয়ালে নানা রঙের নানা সাইজের ধাতুর পাত দাঁড় করান। ডানদিকে আর্কলাইটের নিচে পাঁচজন লোক কাজ করছে, চারজনই তাদের মধ্যে কোরিয়ান, যেটা নিয়ে কাজ হচ্ছে সেটি গোল্ডফিংগারের রোলস রয়েস গাড়ি।
গাড়িটা, আলোয় ঝকঝক করছে, শুধু সামনের ডানদিকের দরজাটা খুলে নেওয়া হয়েছে। দরজাটা রাখা হয়েছে। একটা বেঞ্চে, ধাতব প্যানেলটা এতে নেই। দু জন মিস্ত্রী অ্যালুমিনিয়ামের নতুন প্যানেল এনে দরজার ফ্রেমে লাগল। বন্ড ভাবল এবার বোধহয় ওটাকে আটকে রঙ করে দেওয়া হবে। পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে সহজ মনে হল। বিকেলের দিকে হয়ত প্যানেলটা দুমড়ে গিয়েছিল তাই তাড়াতাড়ি সারিয়ে দেওয়া হচ্ছে কালকের জন্য। বন্ড হতাশ চোখে একবার সব দিকটি দেখে জানালা থেকে সরে এল। কারখানার দরজাটা বেরিয়ে এসে বন্ধ করে দিল। দূর, কিছু নেই। কিন্তু এই পালিয়ে আসার জবাব কি দেবে? বলবে যে ভেবেছিল খাওয়া দাওয়ার পর একেবারে কাজটা করিয়ে নেবে।
বন্ড আর কোনখানে না গিয়ে সোজা নিজের জায়গায় চলে এল।
ঘড়ি দেখল আর দশ মিনিট বাকি, এবার দোতলায় যেতে হবে। যে কোন বাড়ির যাবতীয় গোপন তথ্য থাকে। বাথরুমে বা শোবার ঘরের এই সব জায়গাতেই, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল বিছানার পাশের দেরাজ ইত্যাদি। বন্ড মাথা ধরার অভিনয় শুরু করে ওপরের দিকে তাকাল তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল দোতলায়। উপরে সামনে গ্যালারী, তারপর প্যাসেজ। দরজা খুলে এক ঝলক দেখে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। প্রথমে কয়েকটা বাড়তি শোবার ঘর। বড়ই অগোছাল, ভ্যাপসা গন্ধ বের হচ্ছে। হঠাৎ বাদামী রঙের বড় একটা বেড়াল তার কাছে এসে ঘুর ঘুর করতে লাগল। প্যাসেজের শেষে গোল্ডফিংগারের শোবার ঘরে ঢুকে দরজাটা একটু খুলে রাখল।
