কিন্তু বন্ডের কথা আলাদা। বন্ড এই উত্তেজনায় অভ্যস্ত। দীর্ঘদিন ধরে একটানা স্নায়বিক চাপ আর বিপদের ঝুঁকি সহ্য করতে করতে তার স্নায়ু শক্ত হয়ে গেছে।
কিন্তু সত্যিই কি গোল্ডফিংগার পরাজিত? চিন্তিত মুখে গা মুছতে শুরু করল বন্ড। গোল্ডফিংগার এখন নিশ্চয়ই চিন্তা করতে শুরু করেছে কি করে দু দুবার বন্ড তার সব প্ল্যান বানচাল করে দিল। বন্ড কি ঠিক পথে চলছে গোল্ডফিংগার এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেবেন না কি বন্ডের ক্ষমতা বুঝে সতর্ক হয়ে যাবেন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আর কখনও বন্ডের ধারে। কাছে আসবে না সে, অগত্যা তদন্ত থেকে বিদায়, এবং এক অন্য পথ খুঁজে বার করতে হবে। মাছ টোপ গিলেছে কি না কি করে জানতে পারবে?
শোবার ঘরে দরজায় টোকা পড়ল, বন্ড খুলে দেখল একজন বেয়ারা।
-কি ব্যাপার।
–মিঃ গোল্ডফিংগার নামে একজন আপনাকে টেলিফোনে সংবাদ পাঠিয়েছেন। তিনি অনুরোধ করেছেন আজ নৈশভোজ তাঁর বাড়িতে করতে হবে। সে জন্য রেকুকারে সন্ধ্যা সাড়ে ছ টার মধ্যে চলে আসতে বলেছেন স্যার।
–ওনাকে ফোনে বলে দাও নিমন্ত্রণ সানন্দে গ্রহণ করেছি। দরজা বন্ধ করে খোলা জানালায় দাঁড়াল বন্ড। শান্ত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে-ভাবল তাহলে মাছ টোপ গিয়ে ফেলল।
ছ টার সময় বন্ড নিচে নামল, একটা গাড়ি নিল, বারটা একেবারে ফাঁকা তবে কিছু বিমান বাহিনীর অফিসার আছে। বন্ড আপন মনে ভাবল এরা হয়ত প্লেনে করে যেতে যেতে আমাদের দেখে থাকবে।
ধীরে সুস্থে গন্তব্যস্থলের দিকে গাড়ি চালাতে চালাতে সন্ধ্যার আবহাওয়া, পানীয়, গাড়ির এগজস্টের মৃদু গুঞ্জন উপভোগ করতে করতে চিন্তা করল নৈশভোেজটায় একটু কিছু ভুল হলে সব ভেস্তে যাবে। তারপরে তদন্তে নামা দুরুহ। হবে। তাছাড়া সঙ্গে কোন অস্ত্র নেয়নি। মুহূর্তের জন্য দ্বিধা হল নিরস্ত্র অবস্থায় শত্ৰু পুরীতে পা রাখার জন্য, পরক্ষণেই সে দ্বিধা কেটে গেল। তাদের দুজনের মধ্যে তো মিত্রতাই আছে এখনও।
বিকেলে বিদায় নেবার সময় যথেষ্ট শিষ্টতা বজায় রেখেছিলেন গোল্ডফিংগার। জিজ্ঞেস করেছিলেন বাজির টাকা কোথায় পাঠাবেন। বন্ড তাকে ইউনিভার্সাল এক্সপোর্টের ঠিকানা দিয়েছিল। তারপর কোন হোটেলে আছে জিজ্ঞাসা করেছিল। বন্ড তাকে হোটেলের নাম দিয়েছিল আর বলেছিল র্যানসগেটে থেকে ভবিষ্যতের প্ল্যান করবে সে। গোল্ডফিংগার তাকে জানিয়েছিল সে এখন ফ্রান্সে যাচ্ছে কবে ফিরবেন ঠিক নেই। তারপর তার এক্সরে দৃষ্টি বন্ডের দিকে চালিয়ে হলুদ গাড়ি নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল।
বড় রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তা ধরল বন্ড। এগিয়ে চলল নুড়ি বিছান পথ দিয়ে। বাগান বাড়িটা পুরনো আমলের এক প্রাসাদ, কেমন বাজে দেখতে। বাড়িটার পিছন দিক থেকে একটানা গমগমে আওয়াজ ভেসে আসছে। এ শব্দ কারখানার। উঁচু গাছগুলো ছাড়িয়ে চিমনিটা মাথা উঁচু করে আকাশে দাঁড়িয়ে আছে।
দরজার সামনে এসে বেলা বাজাল বন্ড। নিঃশব্দে দরজা খুলে গেল, সামনে গোল্ডফিংগারের কোরিয়ান ড্রাইভার দাঁড়িয়ে। নিরুৎসাহ চাহনি দিয়ে বন্ডের দিকে তাকাল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ডান হাত সিগন্যালের মত তুলে দিল ছায়ায় ঘেরা হল ঘরের দিকে।
বন্ড পাশ দিয়ে ভেতরে ঢুকল। কেন যেন সহ্য করা যাচ্ছে না লোকটাকে। মনে হচ্ছে পালিশ করা জুতার ওপর পাটা দিয়ে পিঠে দিতে, নয়ত কালো সুটে মোড়া স্ফীত মধ্য প্রদেশে লাথি কষাতে। এ চাপা ঘরের আবহাওয়াকে এক উন্মত্তের মত ধাক্কা দিয়ে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।
এই নির্জন হলঘরটি এ বাড়ির প্রধান ঘর। প্রশস্ত চুল্লীতে আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি, সামনে একজোড়া চেয়ার ও একটা সোফা যেন চুপচাপ পড়ে আছে। চেয়ারগুলোর পেছনে নিচু সেন্টীর ওপর ট্রে ভর্তি পানীয়ের বোতল। এছাড়া সমস্ত ঘরে পুরনো জামানার আসবাবপত্র। বন্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখার মধ্যে কোরিয়ান লোকটি এগিয়ে এল। আরেকবার হাত তুলে পানীয়ের ট্রে ও চেয়ার কে দেখাল। বন্ড ঘাড় নাড়লেও নিজের জায়গা থেকে সরল না। লোকটি অন্য একটি ঘরের ভেতর চলে গেলে আন্দাজে বোঝা গেল সেটা চাকরদের ঘর। বিশাল আকৃতির কারুকার্য করা দেওয়াল ঘড়ির শব্দ নৈঃশব্দকে আরো গভীর করে তুলেছে।
বন্ড ফায়ার প্লেসের সামনে গিয়ে পিঠ করে দাঁড়াল। সেখান থেকে ঘরটাকে ভীষণ বিশ্রী লাগছে। বন্ড ভাবতে লাগল, বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে যখন অনেক জায়গা, প্রচুর আলো বাতাস রয়েছে তখন সেগুলো ছেড়ে এই চিরহরিৎ গাছ গাছালিতে ঘেরা বিলাসবহুল কুঠুরিতে কি করে মানুষ দিন কাটাচ্ছে। সিগারেট ধরিয়ে আবার ভাবল গোল্ডফিংগারের জীবন, আনন্দেও দৈহিক সুখ কিভাবে উপভোগ করেন, না তার এসবের দরকার হয় না। সোনার পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে হয়ত এ সবের সময় পান না।
দূর থেকে টেলিফোনের তীক্ষ্ণ শব্দ আসছিল। কিন্তু দু বারের পরেই বন্ধ হয়ে গেল। একজনের মৃদু গলা শোনা গেল, তারপরই পায়ের আওয়াজ কানে ভেসে এল। সিঁড়ির দরজা খুলে গোল্ডফিংগার এলেন। আবার বন্ধ হয়ে গেল দরজা। খয়েরি রঙের ডিনার জ্যাকেট পরে পালিশ মেঝের ওপর দিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন। সৌজন্যবশত করমর্দন করে দেতো হেসে বললেন, তুমি যে সংক্ষিপ্ত নিমন্ত্রণে এসেছ তার জন্য ধন্যবাদ, আমরা দুজনেই তো একলা তাই ভাবলাম একটু গল্প করা যাক।
