কোনরকম অনুশোচনা নেই বন্ডের। দু দুবার চোট্টামি করলেও রেহাই পেয়ে গেছেন। গোল্ডফিংগার অনেকবার ছোটখাট অপরাধ, বন্ডের মনে বিক্ষিপ্ত করতে চেষ্টা করছিলেন তাছাড়া সব ছেড়ে দিলেও ১৭ নম্বরে যেটা করলেন সেটা না করলে অনেক আগেই বন্ড জিতে যেত। এখন যদি একটা মাত্র জোছুরি দিয়ে সব শোধ তোলা যায় তাহলে কোন ক্ষতি নেই। এই খেলায় জিততেই হবে বন্ডকে। হেরে গেলে শোধ হয়ে যাবে। আর জিতলে দু ধাপ এগিয়ে যাওয়া যাবে। গোন্ডফিংগার নিজেকে সর্বশক্তিমান মনে করেন, তাই দুবার পরাস্ত হওয়ার ধাক্কা হজম করা তেমন সহজ হবে না, ফলে গোল্ডফিংগার মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে এই বেপরোয়া মেজাজের লোক, মাথায় বুদ্ধিও আছে একে কাজে লাগান যেতে পারে। বন্ড ভাবল হয়ত তেমন কোন কাজই পাবে না সে। হয়ত গোল্ডফিংগারের মনস্তত্ত্ব সে বুঝতে পারেনি, আর লোকটার ওপর প্রভাব বিস্তার করার অন্য কোন পথ অজানা বন্ডের।
গোন্ডফিংগারের পরের শটটা ভালই হল। পাঁচ কি চার শর্টে গেম শেষ বুঝতে পারলেন। অবশ্য তাতে কিছু এসে যায় না।
প্রচুর মনঃসংযোগের অভিনয় করে ক্লাব চালাল বন্ড, বল গিয়ে পড়ল বাংকারের ওপরে। পরের শর্টে সেটা গ্রীনের ওপরে গর্ত থেকে কুড়ি ফুট দূরে হবে। এটাই চাইছিল সে। গোল্ডফিংগারকে খুব খেটে তবেই এ গেম জিততে হবে।
এবার গোল্ডফিংগার সত্যি-সত্যিই ঘামছেন, একাগ্রতা ও লোভ মেশান অদ্ভুত বন্য হাসি তার মুখে। বল মারবার জন্য ঝুঁকে পড়লেন বেশি জোরে না, বেশি আস্তেও না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছয় পদক্ষেপে গ্ৰীনের ওপর দিয়ে গর্তের কাছে গিয়ে দেখলেন বলের লাইন ঠিক আছে কিনা। তারপর আবার নিজের জায়গায় এসে ক্লাব দোলালেন–কপালে গভীর মনঃসংযোগের খাজ।
বল মারলেন গোল্ডফিংগার। গল্পে ছ ইঞ্চি দূরে গিয়ে থামল। পরের শর্টেই বল গর্তে ঢুকে যাবে। বন্ড যদি তার বল চতুর্থ শটে না ফেলতে পারেন তাহলেই ম্যাচ জিতে যাবেন তিনি।
বল মারার আগে অনেক ভনিতা করল বন্ড, যাতে একটু সাসপেন্স তৈরি হয়।
-ফ্ল্যাগ সরিয়ে নাও, সোজা গর্তে ফেলব বল আমি যেন কেউ প্রতিজ্ঞা করল। তারপর ঝুঁকে পড়ে গর্তের বেশ খানিকটা ডানদিক দিয়ে বল বার করে দিল।
–দুত্তোর পারলাম না! গলায় যথেষ্ট পরিমাণ তিক্ততার সুর। তারপর গর্তের কাছে গিয়ে তোক দেখিয়ে বলটা তুলে নিল।
গোল্ডফিংগার আনন্দে নেচে উঠল, বললেন, ধন্যবাদ আমার সঙ্গে খেলার জন্য। সত্যই আমি তাহলে ভাল খেলি।
– নয়ের হ্যান্ডিকাপ ভালই খেল। গোল্ডফিংগারের বল ফেরত দেবার জন্য হাতের বল দুটোর দিকে তাকাল। পরক্ষণেই যেন ভীষণ চমকে উঠল, এ কি ব্যাপার? তুমি তো ডানলপের ১ নম্বর বলে খেল তাই না?
-হ্যা! অজানা আশঙ্কায় গোল্ডফিংগারের মুখ শুকিয়ে গেল, কেন কি হয়েছে।
-দুঃখিত, তুমি ভুল বল নিয়ে খেলছিলে। এই আমার পেনফোল্ড হার্টস আর এটা ৭ নম্বর ডানলপ। বল দুটো গোল্ডফিংগার ছিনিয়ে নিয়ে উত্তেজিতভাবে নাড়াচাড়া করতে লাগল।
আস্তে আস্তে গোল্ডফিংগারের মুখ টকটকে লাল হয়ে গেল। একবার বন্ডের দিকে একবার বলের দিকে তাকাল।
বন্ড বলল, দূর্ভাগ্যবশতঃ এ খেলায় গলফের সব নিয়ম মেনে চলার কথা হয়েছিল। তার মানে এ গেমটা হেরে গেল ভুল বলে খেলার জন্য। এবং সেই সঙ্গে গোটা ম্যাচটাতেও।
-কিন্তু কিন্তু…।
বন্ড ঠিক এটাই চাইছিল, তীরে এসে তরী ডুবল। মুখের কাছ থেকে কেউ যেন খাবার ছিনিয়ে নিল।
গোল্ডফিংগারের মুখ সহসা রাগে ফেটে পড়ল ঐ বুনো জমিটাতে তুমি ৭ নম্বর ডানলপ পেয়েছিলে। আর তোমার ক্যাডীই তো ওটা আমায় দিয়েছিল। ও নিশ্চয়ই ইচ্ছে করে ভুল বল দিয়েছে আমায়, ব্যাটা জোচ্চর।
–আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, আর এগোলে মানহানির মামলায় পড়বে। হকার তুমি কি কোন ভুল করে বা অন্য কারণে গোল্ডফিংগারকে ভুল বলে দিয়েছিলেন?
-না স্যার, হকার নির্বিকার। বলল আমার মতামত যদি চান স্যার আমি বলব আগের গেমেই কিছু গোলমাল হয়েছিল। তখন বল যেদিকে গিয়েছিল তার অনেক দূরে বলটা পাওয়া গেল। ডানলপের ১ ও ৭ একই রকম দেখতে। আমার মনে হয় ভুল বলটা পেয়েছিলাম আমরা। আর ভদ্রলোক যেভাবে শর্ট মেরেছিলেন তাতে ঐ জায়গায় পড়া অসম্ভব।
-যত্তো সব বাজে কথা। সক্রোধে বন্ডকে বলল, আমার ক্যাডী যে বলটা পেয়েছিল সেটা তো ১ নম্বরই ছিল।
বন্ড বলল, দুঃখের বিষয় আমি অতটা খেয়াল করিনি। তাছাড়া বল ঠিক আছে কিনা দেখে নেওয়া খেলোয়াড়ের কর্তব্য তাই না? যদি ভুল বলে নিয়ে শর্ট মেরে থাক তাহলে তোমারই ভুল। যাক খেলবার জন্য ধন্যবাদ! আবার একদিন খেলব তোমার সঙ্গে।
গোল্ডফিংগার-এর দীর্ঘ শরীর ছায়ায় মিশে যাচ্ছে, চিন্তাগ্রস্তভাবে বন্ডকে দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগলেন।
.
বাগানবাড়ি
কিছু কিছু বড়লোক আছেন যারা নিজেদের সম্পত্তিকে মুগুরের মত ব্যবহার করেন। আরাম করে বাথটবে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল বন্ড। গোল্ডফিংগার-সেই জাতেরই লোক। তারা মনে করে পৃথিবীটাকে ঐশ্বর্যের পদাঘাতে চ্যাপ্টা করা যায়, অপমানিত করা যায়–সবরকম বিরক্তিকর ব্যাপার ও বিরোধিতাকে। তিনি ভেবেছিলেন দশ হাজার পাউন্ড বাজি ধরে বন্ডের নার্ভ নষ্ট করে দেবেন–কারণ টাকার অঙ্কটা তুচ্ছ হলেও বন্ডের কাছে ছোটখাট ঐশ্বর্যের সমান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই কায়দা ফলপ্রসু হতে বাধ্য, কারণ আঠার গেম ধরে প্রতিটি শর্টে একটা বিশাল অঙ্কের বোঝা নিয়ে বাজি, তাতে খেলা খুব শক্ত।
