তারপর সিক্রেট সার্ভিসের প্রমাণপত্র আর বন্ডের প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং MIx-এর ক্যামেরা ম্যানের ভোলা ছবির দৌলতে ফরেন অফিস অর্থাৎ পররাষ্ট্র দপ্তরের হাতে এমন সব মাল মশলা এসে যাবে যে, গুপ্ত কার্যকলাপের দায়ে কমরেড পিয়োত্র ম্যালিনোসকি-কে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি বলে ঘোষণা করে ঘরের ছেলেকে ঘরে পাঠাতে মোটেই কষ্ট হবে না।
আগের ট্যাক্সিটা লোহার গেট দিয়ে সত্যিই সেই বিশেষ প্রবেশ পথেই ঢুকল। বন্ড মুচকি হাসল। সামনের দিকে ঝুঁকলো।
ধন্যবাদ, ড্রাইভার। হেড কোয়ার্টার চল।
.
ডানা–মেলা প্রাণপাখি
জেমস্ বন্ড বিলের বিখ্যাত সেঞ্চুরি রেঞ্জ-এর চত্বরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে–পাঁচশ গজ দূরে চাঁদমারি। তার পাশেই ঘাসের ওপর যে নিশানা গোঁজা, তাতে লেখা 44; দূরের ছ ফুট চৌকা চাঁদমারির মাথাতেও ঐ একই সংখ্যা লেখা। ছ ফুট চৌকো নিশানাটা খালি চোখে এখান থেকে ডাক টিকিটের মত ছোট মনে হয়। তবে রাইফেলের মাথায় লাগানো ইনফ্রা-রেড স্নাই-পারস্কোপ-এর লেন্সের জন্য অনেক বড় করে দেখতে পাচ্ছে বন্ড। নীল ডোরাকাটা হাওয়া দেয়া নিশানগুলোর দিকে সে ভাল করে তাকিয়ে নিল। পশ্চিম দিকে মুখ করে পতপত করে উড়ছে, আধ ঘণ্টা আগে যখন গুলি ছোঁড়া শুরু করে তখন এত জোরে উড়ছিল না। শরীরটাকে স্থির করে আঙটির মত জায়গায় মধ্যে আঙুল গলিয়ে বাঁকানো ট্রিগারের ওপর আলতো করে রাখলে, নিঃশ্বাস চাপলে, খুব নরম করে চাপ দিল।
স্যুটিং রেঞ্জের শূন্য চতুরটা গুলির বিকট আওয়াজে খান খান হয়ে গেল। এক লহমায় নিশানাটা অন্তর্হিত হল মাটির নিচে, আর সঙ্গে সঙ্গে ডাম টা ফিরে এল নিজের জায়গায়। কালো দাগটা এবার ডান দিকের কোন ঘেঁষে নিজের দিকে পড়েছে।
ওপর থেকে চীফ রেঞ্জ অফিসারের গলা শোনা গেল, চমৎকার। ঠিক ঐ রকমই চালিয়ে যান। বন্ডের ওপর যে কাজের ভার পড়েছে তাতে, প্রথম গুলিটা ফস্কে গেল, দু সেকেন্ড সময় দেওয়াটাও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তবে M বলেছেন, পাল্লাটা তিনশ গজের বেশি হবে না। বন্ড এক সেকেন্ডের বেশি সময় দেবে না–বলতে গেলে একেবারে একটানা পাঁচটা গুলি ছুড়বে।
রেডি?
হ্যাঁ।
পাঁচটা গুলি পর পর ছুটে গেল গোধূলির আবছায়ার মধ্যে। তখন লক্ষ্যবিন্দুর কাছাকাছি চারটা ছোট ছোট গর্ত, পাঁচ নম্বরের গর্ত নেই–এমন কি কালো আঁচড়ের দাগটুকুও নয়।
রেঞ্জ অফিসারের গলা শোনা গেল, শেষের টা নিচু হয়ে গেছে।
বন্ড আর্মার সেশনের কর্পোরাল মোস গান ক্লাবের ঘর থেকে বেরিয়ে চীফ রেঞ্জ অফিসার বন্ডের হাতে লক্ষ্য ভেদের খতিয়ান লেখা কাগজটা তুলে দিলেন। দুটো সামনাসামনি গুলি ছোঁড়া হয়েছে, তারপর একশ গজ থেকে শুরু করে পাঁচশ গজ পর্যন্ত প্রত্যেক নিশানায় দফায় দফায় দশটা করে গুলি। আলোর যা অবস্থা তাতে ভাল ছুঁড়েছেন বলতে হবে। আসছে বছর কুইন্স্ প্রাইজের জন্য লড়তে চলে আসুন।
ধন্যবাদ।
দূরের গম্বুজ-ঘড়ির দিকে তাকাল বন্ড। ঘড়ির কাঁটা দুটো ন টা পনেরোর ঘরে।
রেঞ্জ অফিসার মনে মনে ভাবছেন, কম্যান্ডার জেমস বন্ড এরকম যার মারাত্মক টিপ, ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের খাতায় তার নাম থাকবে নিশ্চয়। মনে করে একবার ফোন করতে হবে।
হাঁটতে হাঁটতে দুজনে বাইরে বেরিয়ে এল। সামনে বন্ডের গাড়ি। শুভরাত্রি জানিয়ে বন্ড বিদায় নিল।
কিংস অ্যাভিন্ন ধরে লন্ডনের রাস্তার দিকে মিলিয়ে গেল গাড়ির লাল আলো–রেঞ্জ অফিসার দাঁড়িয়ে দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে গেলেন কর্পোরাল মেঞ্জিস-এর কাছে। কিন্তু প্রশ্নের জবাব পেলেন না। গাড়িতে একটা কাঠের বাক্স তুলেছিলেন কর্পোরাল মেঞ্জিস, কাঠের মতই নীরব হয়ে রইলেন। রেঞ্জ অফিসার একজন মেজর। বন্ডের রাস্তার দিকেই চলে গেল ল্যান্ড-রোভার গাড়িটা। চিন্তার পাহাড় মাথায় নিয়ে ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তরের দিকে হাঁটতে লাগলেন মেজর। লাইব্রেরিতে বন্ড, জে, নামটা খুঁজে দেখতে হবে।
বি ই এ কোম্পানির হ্যাঁনোভার বার্লিন গামী প্লেন ধরতে যাচ্ছিল। গাড়ি হাঁকিয়ে যাচ্ছিল লন্ডন বিমান বন্দরের দিকে। মন তার উধাও হয়ে গেছে পুরোেনো ঘটনায়। বার বার ভাবছে আর বিশ্লেষণ করছে। আসল সাক্ষাৎক্টা কোনও মেয়ের সঙ্গে তো নয়ই, প্লেনের সঙ্গে ও নয়; আগামী তিন দিনের মধ্যে বার্লিনে আসল মোলকাটা যার সঙ্গে হবে, সে একজন পুরুষ। লোকটাকে সামনাসামনি দেখা চাই। আর মোক্ষম গুলির ঘায়ে একেবারে শেষ করে ফেলতে চাই।
বিকেল আড়াইটা নাগাদ বন্ড M-এর ঘরে ঢুকে দেখল ডেস্কের ওপাশে পাশ ফিরে বসে আছেন M। তখনই বুঝতে পেরেছে যে, ব্যাপার খুব গুরুতর। বন্ডকে দেখে চেয়ার ঘুরিয়ে নিয়ে বস্তের দিকে তাকিয়ে M বললেন, আমাদের 272 বড় ভাল, তুমি চিনবে না। কারণ সেই যুদ্ধের সময় থেকে নোভায়া জিম্লয়াতে বন্দী হয়েছিল। এত দিনে পালিয়ে আসার মওকা পেয়েছে। পারমাণবিক বোকা আর রকেটের ব্যাপার। সঙ্গে অনেক মাল মশলা। সেই সঙ্গে ওদের ভবিষ্যৎ সব পারমাণবিক পরীক্ষার খসড়া। ১৯৬১ সালে হবার কথা। পশ্চিমী দেশের ওপর চাপ দেওয়া আর কি। বার্লিন নিয়ে একটা কিছু ব্যাপার আছে। ফরেন অফিস বলছে, ব্যাপারটা সত্যি হলে, সাংঘাতিক। 272 পূর্ব বার্লিন। পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তবে পেছনে রয়েছে KGB-র কেউ। পূর্ব জার্মানির গুপ্ত বিভাগ আছেই। শহরের কোথাও লুকিয়ে আছে, আমাদের কাছে একটি মাত্র খবর পাঠাতে পেরেছে। সীমান্ত পেরিয়ে এপার আসছে সন্ধ্যা ছ টা থেকে সাতটার মধ্যে। তিন দিনের যে কোন একদিনকাল, পরশু বা তরশু। কোন জায়গায় পার হবে, তাও বলে দিয়েছে। যার। মাধ্যমে খবরটা পাঠিয়েছে, সে ডবল এজেন্ট, গতকাল স্টেশন WB-এর কাছে ফেঁসে গেছে লোকটা। কপাল জোরে KGB-র একটা সাঙ্কেতিক খবরের পাঠোদ্ধার করে ফেলে WB। লোকটাকে এনে বিচার-টিচার করা হবে অবশ্য। কিন্তু তাতে কোন্ সুরাহা হবে? KGB জেনে গেছে যে 272 সটকাবার চেষ্টা করবে। কখন, তাও জানে।
