বন্ড এই নির্ভেজাল জোদুরি দেখে ভুরু কোঁচকাল। গলফ-এর ক্ষেত্রে কেউ জোচ্চুরি করলে তার সঙ্গে আর কোনদিন না খেলাই-এর প্রতিকার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতিকার খাটবে না। এই লোকটির সঙ্গে দ্বিতীয়বার খেলার কোন ইচ্ছাই তার আর নেই। যতক্ষণ না বড় সড় কোন চোট্টামি ধরা না যায় ততক্ষণ এইসব ছোটখাট ছিঁচকেমি নিয়ে। তর্কাতর্কি করায় কোন মানে হয় না। আর বন্ডের কাজ হল তাকে হারান তা সে যতই জোচ্চুরি করুক না।
বন্ডের বল গর্ত থেকে দূরে গিয়ে পড়ল। এখানে থেকে অর্থাৎ কুড়ি ফুট দূরে থেকে গর্তে ফেলা মুখের কথা নয়। কিন্তু বলটাকে গর্তের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। ফের মারতে এক গজ দূরে এসে পড়ল। এবারে খুব কষ্ট করেই বলটা গর্তে ফেলতে হল। গোল্ডফিংগারের বলটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মেনে নিল সে একবারের মারেই গর্তে ফেলতে পারত। এ দানটা ড্র হয়ে গেল।
এখনও খেলা সমান সমান। ৪ নম্বরের দৈর্ঘ্য চারশ ষাট গজ। এ দানটাও ড্র হল।
৫ নম্বরের টীতে বলে বসিয়ে বন্ডের দৃষ্টি চলে গেল দূরে ঝকঝকে সমুদ্র আর পেগওয়েল উপসাগরের ওপারে ঢেউ খেলান সাদা পর্বতমালার দিকে। তারপর নিজের লক্ষ্যস্থল সবুজ ঘাসজমিটা দেখে নিল। আস্তে আস্তে ক্লাব তুলে জোরে মারল বলের গায়ে। হঠাৎ ঠং করে আওয়াজ হয়ে থামতে গিয়েও থামল না, প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগল বলকে সঠিক জায়গায় পাঠাতে। ঠং করে আওয়াজ হল, তবে কি মারটা ঠিকমত লাগেনি। দ্রুত মাথা তুলে বলকে দেখল অনেক ওপরে উঠে গেছে। বেশিদূর যেতে পারবেন না বোধহয়। বলটা একটা মাটির ঢিবির ওপর ধাক্কা খেয়ে গড়িয়ে গেল, ঠিক জায়গায় পৌঁছল না বোধহয়।
জ্বলন্ত চোখে গোল্ডফিংগার ও ক্যাডীদের দিকে তাকাল বন্ড। নির্বিকারভাবে গোল্ডফিংগার মাটি থেকে ক্লাবটা তুলছেন। বন্ডের চোখে চোখে রেখে বললেন, দুঃখিত, এটা হাত থেকে পড়ে গেছিল।
-আর যেন না হয়, বন্ড বলল, টী থেকে ঘরে এসে হকারকে ক্লাব ফেরৎ দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। এদিকে গোল্ডফিংগার প্রথম মারে বলকে দুশ গজ দূরে পাঠিয়ে দিলেন।
তারা দুজনে উঁচু জমি থেকে নিচে নেমে আসার সময় অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন ভেসে উঠল, কোথায় যেন কাজ কর তুমি?
[এখানে গলফ খেলার নিয়ম সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া প্রয়োজন। দ্বৈত গল খেলা হয় দু জনের মধ্যে। একটি বিরাট খোলা মাঠে। নির্দিষ্ট স্থানে ১৮টি ছোট গর্ত থাকে। খেলোয়াড়দের কাজ হল গলফ ক্লাব অর্থাৎ গলফ খেলার লাঠি দিয়ে ছোট্ট সাদা বলকে মেরে মেরে এই গর্তগুলিকে ফেলা। যে যত কম শটে বল ফেলতে পারবে তারই জিত। এক একটি গর্তে বল পড়া মানে এক একটি গেম শেষ। যে খেলোয়াড় সব থেকে বেশি গেম জিততে পারবে তারই জয় হবে। প্রত্যেক গেমের শুরুতে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে প্রথম শট মারতে হয় একটা ছোট রবারের টীর ওপর বল রেখে। খেলোয়াড়দের যাচাই করার জন্য মাঠে বিভিন্ন জায়গায় বাধা তৈরি করা হয়। যেমন অসমতল বুনো জমি, উঁচু নিচু জায়গা (বাংকার) ইত্যাদি। গর্তের চারপাশে শুধু খানিকটা সাফ সবুজ জমি থাকে-এর নাম গ্রীন।]
-ইউনিভার্সাল এক্সপোর্ট।
–সেটা কোথায়?
–লন্ডনে। রিজেন্টস পার্কে।
–কি এক্সপোর্ট কর?
তার মনঃসংযোগ নষ্ট করার জন্য এই যাত্রা যে শয়তানী করল তার জন্য বন্ড রীতিমত ফুসফিল রাগে। এবার সজাগ হয়ে উঠল। এটা আসল গলফ খেলা নয়, চাকরির অঙ্গ। লোকটা মার নষ্ট করার চেষ্টা করলেও ওর কথার খোঁচায় গল্প না ফেঁসে যায়, যেটা সে এখুনি বলবে। যে কোন জিনিস–সেলাইয়ের কল থেকে যুদ্ধের ট্যাংক পর্যন্ত।
-তুমি নিজে কি কর?
বন্ড বুঝতে পারল গোল্ডফিংগার তার দিকে তাকিয়ে আছে। বলল, অস্ত্রশস্ত্রের দিকটা। আরবদেশের শেখ, ভারতের রাজা মহারাজাদের কাছে অস্ত্র বিক্রিতেই সময় কেটে যায়। আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে যারা কোনদিন আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে না একমাত্র তাদের কাছেই অস্ত্র বেচা যেতে পারে। — বেশ মজার কাজ গোল্ডফিংগারের গলা বর্ণহীন শোনাল।
-সোজা কোথায়, চাকরি ছেড়ে দেব ভাবছি। ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্যই এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে এখানে এসেছি। ভাবছি কানাডা চলে যাব, ইংল্যান্ডে তেমন ভবিষ্যৎ নেই।
-তাই নাকি।
অসমান জমিটা পেরিয়ে এসে বন্ড দেখল বলটা বেশ ভাল জায়গায় পড়েছে। গোল্ডফিংগারের থেকে কয়েক ফুট এগিয়েই আছে সে। গোল্ডফিংগার এবার কিন্তু তার বাঁধাধরা মার মারল না, বদলে শোনা গেল বেমক্কা মারের কেঠো আওয়াজ। বল গড়িয়ে থামল নুড়ি আর পাথরে ভর্তি ভাঙ্কারে।
ভাগ্যলক্ষ্মী তাহলে মুখ তুলে চেয়েছেন। বন্ড যা বলল তাই বোধহয় ভাবছিল গোল্ডফিংগার। কিন্তু এখনো তিনবারে বল গর্তে ফেলা যাবে। বন্ড ক্লাব হাতে নিয়ে লক্ষ্য স্থির করে নিল।
সহসা তার ডানদিকে টুংটাং আওয়াজ শুনে দেখে বন্ডের দিকে পেছন করে দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখে পকেটের পয়সা নাড়াচাড়া করছে গোল্ডফিংগার। বন্ড তিক্ত হেসে বলল, আমার বল মারা পর্যন্ত তোমার ধনরত্ন নাড়াচাড়াটা বন্ধ করলে ভাল হয়।
গোল্ডফিংগার মুখে কিছু না বললেও আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেল।
বন্ড প্রাণপণ চেষ্টা করল এ মারটা ভাল করে মারতে। হকারের কাছ থেকে ক্লাব নিয়ে বলটা ভালই মারল সে। বলটা ভাল জায়গাতে থামল।
