কিন্তু প্রশ্ন হল এই অপরাধের জন্য গোল্ডফিংগারকে দায়ী করার যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। ভদ্রলোকের ব্যাংক ব্যালেন্স মাত্র কুড়ি হাজার পাউন্ড আর ইনকাম ট্যাক্স যথাসময়ে জমা দেওয়া হয়। একটা সুসংগঠিত গহনার ব্যবসায় যতটা উন্নতি হওয়া সম্ভব খাতা পত্রে সেইভাবেই সব দেখান আছে।
অতএব আমাদের বাহিনীর দুজনকে তার কারখানায় পাঠালাম। নিজেদের শ্রম মন্ত্রণালয়ের ক্ষুদ্রশিল্প বিভাগের লোক বলে পরিচয় দিয়ে শ্রমিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যবস্থা দেখার জন্য এসেছে বলতে গোল্ডফিংগার তাদের অভ্যর্থনা জানালেন। মনে রাখবেন আমরা যে নজর রাখছি তা ব্যাংকের ম্যানেজার আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন। যাই হোক একটু আধটু সোনার চিহ্ন, দু হাজার ডিগ্রি পর্যন্ত উত্তাপ তোলার ফার্নেস পাওয়া গেলেও ধাতু তৈরির গবেষণার জিনিসই বেশি। পেশায় স্বর্ণকার তাই ঢালাইলের জিনিস থাকবেই, সুতরাং সন্দেহ করবার কোন কারণ নেই। আমাদের লোক ফিরে এলে আইন সংক্রান্ত বিভাগ জানাল ঐ টুকু গুড়ো মামলা করবার পক্ষে যথেষ্ট নয়। আরও প্রমাণ চাই। ব্যাপারটা এখানে শেষ হলেও আমি খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম বিভিন্ন ব্যাংকে।
কর্নেল স্মিার্স থামলেন। বাইরে থেকে শহরের কোলাহল কানে আসছে। বন্ড লুকিয়ে ঘড়ি দেখে নিল, পঁচটা বাজে। কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে ডেস্কে ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে বললেন, মিঃ বন্ড পাঁচ বছর পর আমি জানতে পারলাম গোল্ডফিংগার ইংল্যান্ডের সব থেকে ধনী ব্যক্তি। জুরিখ, নাস, পানামা এবং নিউইয়র্কের বিভিন্ন সেফ ডিপোজিট ভল্টে মোট দু কোটি পাউন্ড মূল্যের সোনা আছে, সেটা দেখার জন্য নামো গিয়েছিলাম। অন্য সব শিল্পীর মত তিনি নিজের সব সোনার বাটে ছোট একটা z অক্ষর খোদাই করে রেখেছেন। ঐ সব সোনা ইংল্যান্ডের। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড কিছু করতে পারবে না তাই আপনাকে অনুরোধ করছি মিঃ বন্ড, ঐ সব সোনা দেশে ফেরত নিয়ে আসুন। সাম্প্রতিককালের মুদ্রা সঙ্কটের বাজারে ইংল্যান্ডের ঐ সোনা অত্যন্ত প্রয়োজন।
.
প্রস্তুতি
কর্নেল স্মিদার্সের সঙ্গে লিফটের কাছে এল বন্ড। অপেক্ষা করতে করতে প্যাসেজের শেষের জানালটা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখে ব্যাংকের পেছনের মাঠে একটা চকলেট রঙের লরী এসে থামল। লরী থেকে চৌকো কার্ডবোর্ডের বাক্স নামিয়ে একটা কনভেয়ার বেল্টের ওপর রাখার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ব্যাঙ্কের ভেতর চলে যাচ্ছে।
কর্নেল পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, এগুলো পাঁচ টাকার নোট। লটনে যে ছাপাখানা আছে সেখান থেকে এল।
লিফট এল দুজনেই ঢুকল, বন্ড বলল, এগুলো ভাল লাগে না, অন্য কোন দেশের টাকার মতন দেখতে, তবে পুরনো নোটগুলো সব থেকে বেশি ভাল ছিল। তারা এখন বিরাট হলঘরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে। আলো কম, লোকজনও নেই। কর্নেল বললেন, আমিও আপনার সঙ্গে একমত, কিন্তু যুদ্ধের সময় জার্মানীর রাইখম ব্যাংক যে পাঁচ পাউন্ডের জাল নোট তৈরি করেছিল সেগুলো হুবহু এক রকম। রাশিয়ানরা যখন বার্লিন অধিকার করে তখন অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে সেই জাল ব্লকগুলিও তাদের হাতে পড়ে।
যুদ্ধের পর তাদের কাছ থেকে ব্লক ফেরত চাইলে তারা তা দিতে অস্বীকার করে। আমরা দেখলাম ব্যাপারটা ভীষণ বিপজ্জনক, মস্কো সরকার ইচ্ছা করলেই ইংল্যান্ডের বাজারে রাশি রাশি পাঁচ পাউন্ডের নোট ছেড়ে মুদ্রা ব্যবহার সর্বনাশ করতে পারে, তাই বাধ্য হয়ে পুরনো নোট তুলে নতুন নোট বাজারে ছাড়তে হল। দেখতে ভাল না হলেও এ নোট জাল করা খুব শক্ত।
সিঁড়ির ওপর নৈশ প্রহরী দাঁড়িয়েছিল, রাস্তা ছেড়ে দিল। শহরে রাত অনেক হয়েছে, রাস্তা ফাঁকা, কর্নেলকে বিদায় জানিয়ে পাতাল রেলের দিকে পা চালাল বন্ড। এই ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের কাজকর্ম দেখে ধারণা পাল্টে গেল তার। বয়সে প্রবীণ হলেও কর্মক্ষমতা নবীনের মত।
সন্ধ্যা ছ টার সময় M-এর সঙ্গে দেখা করতে হবে। সেখানেই গেল। M-এর মুখ সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত, ক্লিষ্ট। বন্ড লক্ষ্য করল অতিকষ্টে মাথা পরিষ্কার করে নতুন সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্য M তৈরি হলেন। সোজা হয়ে পাইপ হাতে নিয়ে বললেন, বল!
বন্ড সব গুছিয়ে বলে দিল।
কথা শেষ হতেই চিন্তাগ্রস্ত ভাবে M বললেন, এই কাজটা না নিয়ে উপায় নেই তাহলে। ব্যাংক রেট সম্পর্কে কিছুই জানা নেই আমার, কিন্তু আজকাল দেখছি সবাই জানে। আমি ভাবতাম আমাদের দেশের টাকার দাম কর্মক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, সোনার ভাঁড়ারে নয়। যুদ্ধের পর জার্মানদের হাতে তো কিছু ছিল না, কিন্তু এখন কি উন্নতি হয়েছে তা তো দেখতেই পাচ্ছ। যাকগে গোল্ডফিংগারের সঙ্গে কিভাবে ঘনিষ্টতা করবে, কিভাবে এগোবে ভেবেছে? ওর কোন নোংরা কাজে সাহায্য করার প্রস্তাব করলে কেমন হয়।
বন্ড বলল, ওর কাছে বিনয়ের সঙ্গে গেলে পাত্তাই পাব না স্যার। আমার ধারণা ওর থেকে বেশি বুদ্ধিমান লোককেই। ও শ্রদ্ধা করতে পারে। একবার ওকে আমি তাস খেলায় হারিয়েছি তার জন্য আমায় গল খেলার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সুতরাং সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করাই ঠিক হবে।
M ব্যাঙ্গ করে বলে উঠলেন–আমার একজন কর্মচারি সারাদিন মাটে গলফ খেলে বেড়াবে। বাঃ চমৎকার। ঠিক আছে। তাই কর, তবে খেলায় ওকে হারাতেই হবে। তাছাড়া কি বলবে তাকে?
