–ইংল্যান্ডের চেয়ে বেশি দর অনেক দেশই দেয়। যেমন–সুইজারল্যান্ডে, তবে সব থেকে ভাল বাজার ভারতবর্ষই।
এবার বুঝতে পারছি, এখন বলুন বর্তমান সমস্যা কি? সিগারেট ধরিয়ে গোল্ডফিংগারের পরিচয় জানার অপেক্ষায় রইল।
কর্নেল কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ১৯৩৭ সালে রিগা শহর থেকে অরিক গোল্ডফিংগার উদ্বাস্তু হয়ে ইংল্যান্ডে আসে। বয়স তখন কুড়ি। তবে বুদ্ধি সে তুলনার বেশিই ছিল। আন্দাজ করতে পেরেছিল রাশিয়া সরকার তার দেশকে কুক্ষিগত করে নেবে কিছুদিনের মধ্যেই। বাপ ঠাকুর্দারা স্বর্ণকার ছিল, এবং সোনার পাতভর। একটা বেল্ট ছিল যেটার কথা একটু আগেই বলেছি আপনাকে। ভদ্রলোক সেই বেল্টটি সম্ভবত হাত সাফাই করেছিলেন।
যাইহোক ইংল্যান্ডে বেশ জমিয়ে নিয়েছিলেন। নিরীহ মানুষ, ব্যবসাটা ভাল, তাই লাইসেন্স সহজেই পেয়ে গিয়েছিল। এরপর দেশের ছোটখাট বন্ধকী কারবারের দোকান কিনে বেশি মাইনেতে কর্মচারি নিযুক্ত করে প্রত্যেক দোকানের নাম রাখলেন গোল্ডফিংগার। দোকানে সস্তা গয়না বিক্রি হয় আর পুরনো সোনা ন্যায্য দামে কেনা হয়। নিজে একটা স্লোগানও তৈরি করেছিলেন পুরনো লকেট দাদীমার বদলে কিনুন নতুন আংটি প্রেয়সীর। উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত দুই শ্রেণীর মানুষের বাসস্থানের সংযোগ স্থলে দোকান হওয়াতে ব্যবসা জমে উঠল। বেআইনি কাজ করেন না বলে পুলিশের সঙ্গে খাতির ছিল খুব। গোল্ডফিংগার নিজে লন্ডনে থাকলেও মাসে একবার করে সব দোকানে গিয়ে গতমাসের কেনা সমস্ত পুরনো সোনা নিয়ে আসতেন। বাকি কাজ তার ম্যানেজাররাই নিজের মত চালাত।
কর্নেল বন্ডের দিকে প্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, আপনি ভাবছেন লকেট, ক্রস এসব তো ছোটখাট জিনিস। ঠিকই, তবে নিয়মিত সপ্তাহ আধ ডজন করে ছোট সোনার জিনিস কিনলে মোট পরিমাণ ভালই দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অন্য স্বর্ণকারদের মত গোল্ডফিংগারকেও জানাতে হল তার কত সোনা আছে। জানা। গেছে তিনি নাকি বলেছিলেন একজন স্যাকরার ব্যবসা চালাতে ন্যূনতম পরিমাণ যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই মাত্র পঞ্চাশ আউন্স! সুতরাং তাকে বলা হল এটুকু সোনা আর সরকারকে দেবার দরকার নেই। যুদ্ধের সময়টুকু তিনি গা ঢাকা দিলেও যতগুলো সম্ভব দোকান খোলা রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন।
যুদ্ধ শেষ হলে টেমস নদীর মোহনার কাছে একটা সুন্দর বাড়ি কিনলেন, তার সঙ্গে মজবুত ট্রলার জাহাজ ও পুরনো সিলভার গেস্ট রোলস রয়েস গাড়ি। এই গাড়িটি আসলে লোহার পাতে মোড়া সুরক্ষিত গাড়ি। দক্ষিণ আমেরিকার এক গৃহযুদ্ধ বিক্ষুব্ধ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির জন্য তৈরি করা হলেও তিনি নিতে পারেননি কারণ গাড়ি নেওয়ার আগে তার মৃত্যু হয়েছিল। তারই মালিক বর্তমানে গোল্ডফিংগার।
নিজের বাড়ির কাছেই থ্যানেট অ্যালয় রিসার্চ নামে একটা কারখানা খুললেন। যুদ্ধের পর আর দেশে ফিরে যেতে চাননি, এমন একজন ধাতু বিশেষজ্ঞকে কারখানার ভার দিয়েছিলেন। লিভারল বন্দর থেকে ছ জন কোরিয়ানকেও রাখলেন। এরা কেউই সভ্যদেশের ভাষা জানতেন না বলে গুপ্ত কথা ফাঁস হয়ে যাবার ভয় ছিল না। তারপর গত দশ বছরে তার গতিবিধি সম্পর্কে এই টুকুই জানি বছরে একবার ভারতবর্ষে যেতেন ট্রলারে, আর গাড়ি করে সুইজারল্যান্ড। অ্যালয় কোম্পানির শাখা খুলেছিলেন জেনিভাতে সেগুলোও ভালই চলছে। এখন তিনি নিজে আর সোনা নিয়ে যান, এক কোরীয়ান ড্রাইভার গিয়ে নিয়ে আসে। গোল্ডফিংগার তেমন সাধুপুরুষ না হলেও আচার ব্যবহার ভাল, পুলিশের সঙ্গে সদ্ভাব আছে বলে গতিবিধির ওপর আমরা সেরকম নজর দিইনি, সারা দেশে ওর থেকেও বড় বড় জোচ্চোর আছে।
কর্নেল স্মিার্স ক্ষমাপ্রার্থীর মত করে বললেন, মিঃ বন্ড আপনার বিরক্তি লাগছে না তো? আসলে লোকটির চরিত্র : বোঝানোর জন্যই এসব বলছি। যাই হোক একটা দুর্ঘটনাই ভদ্রলোকের ওপর আমাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিল। ১৯৫৪ সালে গরমের সময় তার ট্রলার গুড উইনস-এর কাছে ভেঙে পড়লে সস্তা দরে সেটিকে বেচে দিলেন ডোভার ম্যালভেজ কোম্পানির কাছে। কোম্পানির লোকেরা জাহাজের খোল ভাঙতে গিয়ে কাঠের ভেতর এক ধরনের বাদামী রঙের গুড়ো দেখতে পায়। সেই গুড়ো পরীক্ষা করে জানা যায় সেটি আসলে সোনা। রাসায়নিক ফমূলা না দেখিয়ে কি করে বাদামী খুঁড়ো করা হয় সেটাই বলছি। হাইড্রোক্লোরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিডের মিশ্রণে সোনাকে গলিয়ে রিডিউসিং এজেন্টের সালফার ডাই অক্সাইড কিংবা অক্সালিক অ্যাসিডের সাহায্যে এটি বাদামী গুড়োতে পরিণত হয়। এই গুড়োকে হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে গলিয়ে আবার খাঁটি সোনা করা যাবে। প্রক্রিয়াটা খুবই সোজা, যদিও এর থেকে বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস বের হয়।
স্যালভেজ কোম্পানির কেউ গল্পছলে ঘটনাটি বলে কাস্টমস্-এর এক কর্মীকে। সেখান থেকে পুলিশও গোয়েন্দা মারফত আমাদের কাছে। রিপোর্টের সঙ্গে ভারত ভ্রমণের সময়কার মাল খালাসের কাগজপত্রও ছিল। তাতে লেখা সার তৈরির জন্য ব্যবহৃত খনিজ পদার্থের গুড়ো। আজকাল সব সারেতেই খনিজ পদার্থ ব্যবহার করা হয় বলে কেউ অবিশ্বাস করেনি। গোন্ডফিগার পুরনো সোনা শোধন করে খাঁটি সোনা তৈরি করে সেগুলিকে আবার বাদামী রঙের গুড়োয় পরিণত করে সার বলে ভারতবর্ষে পাঠাচ্ছেন।
