মিঃ স্নোম্যান বন্ডকে বুঝিয়ে দিলেন, আপনি পিটার উইলসনের চোখের দিকে নজর রাখবেন, ধরতে চেষ্টা করবেন কার দিকে ও তাকাচ্ছে। যদি ধরতে পারেন, তা হলে বুঝতে চেষ্টা করবেন, সে কোন ইশারা করছে কি না। খুব শক্ত। ব্যাপার হলেও এ ছাড়া উপায় নেই। আরও শুনে রাখুন, শেষের দিকে আমি বেশ তাতিয়ে দেবার চেষ্টা করব পাল্লাদারকে। আপনি ধরেই নিতে পারেন, শেষ পর্যন্ত আমি আর সে ছাড়া কেউ বুঝবে না।
স্নোম্যানের কথায় বন্ড এটুকু বুঝল যে, যত দামেই হোক মরকত গোলকটা কেনবার নির্দেশ রয়েছে তার ওপর।
হঠাৎ সমস্ত ঘরটার মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল। বন্ড দেখল একটা কালো মখমলের ওপর একটা চমৎকার বাক্স বসানো হল। পরিচারক বাক্সটার চাবি খুলে ৪২ নম্বরের সেই মহার্ঘ বস্তুটি অতি সাবধানে কালো মখমলের ওপর বসিয়ে বাক্সটা নিয়ে চলে গেল। সেই পান্নার গোলকটা থেকে অলৌকিক এক সবুজ আগুনের আভা ছড়িয়ে পড়ল। চারদিকে, গোলকের গায়ের জড়োয়ার কাজ থেকে হরেক রঙের ঝিলিক। দর্শকদের মধ্যে থেকে একটা অস্ফুট শব্দ উঠল।
ক্যাটালগের পাতায় চোখ দিয়ে জেমস্ বন্ড দেখলেন তাতে লেখা আছে?
ভূ গোলক
কার্ল ফাবেয়ার্জে কর্তৃক ১৯১৭ সালে জনৈক রাশিয়ান ভদ্রলোকের জন্য প্রস্তুত। বর্তমানে তাঁহার দৌহিত্রীর সম্পত্তি। তার ৪২ ফাবেয়ার্জে-র কারুশিল্পের নিদর্শন।
ভূ গোলক।
সাইবেরিয়া অঞ্চলের অসাধারণ বৃহদাকার মরকতখণ্ড থেকে গোলাকারে খোদিত। পদ্মরাগ হীরা ও ঘোর রঙের মরকত-খচিত এই গোলকটি টেবল-ক্লক-এর প্রতিকল্প।
মিঃ উইলসন খুব আস্তে একবার হাতুড়ির ঘা মারলেন। ৪২ নম্বর, কার্ল ফাবেয়াজে-র কারুকৃতির অনন্যসাধারণ নিদর্শন। একটু থেমে বললেন, কুড়ি হাজার পাউন্ড দর পেয়েছি। আসলে কমপক্ষেও পঞ্চাশ হাজার দর পেয়েছে। এদিক-ওদিক থেকে ক্যাটালগের নিশানা উঠছে। একটু চুপ, তারপর একে একে একলক্ষ পাউন্ড দর উঠল।
সমস্ত ঘরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। সবকটা ক্যামেরার মুখ তখন একজনের দিকে ফেরানো। মিঃ স্নো-ম্যান বন্ডকে বুঝিয়ে দিলেন ও হচ্ছে সাবি কোম্পানির লোক। সম্ভবত মেট্রোপলিটান-এর সঙ্গে কথা বলে নির্দেশ অনুযায়ী দর। দিচ্ছে, এক লাখ পাউন্ডের দরটা বোধহয় ওই তরফের। এবার বোধহয় আমাকে আসরে নামতে হবে।
নিলামদারের ঘোষণা শোনা গেল ঐ এক লাখ কুড়ি হাজার।
মিঃ স্নোম্যান ক্যাটালগ নাড়ালেন। তিরিশ হাজার।
নিচু গলায় মিঃ স্নো ম্যান বন্ডকে বললেন, এবার বেশ ভাল করে লক্ষ্য রাখুন।
বন্ড চেয়ারে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রিপোর্টারদের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
নিলমাদার হাঁকলেন চল্লিশ হাজার পাউন্ড। মিঃ স্নো-ম্যান পাঁচটা আঙুল তুলে দেখালেন। শেষ পর্যন্ত একলাখ পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড।
দর্শকদের মধ্যে হাততালি উঠল। আবার মিঃ স্নো ম্যান পাঁচটা আঙুল তুললেন। একলাখ পঞ্চান্ন হাজার পাউন্ড।
জেমস বন্ড এবার ঘামতে শুরু করেছে। কোন কূল-কিনারা করতে পারছে না, অথচ ডাকাডাকি করার পালা প্রায় শেষ। এবার যেন সামান্য নড়াচড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ঘরের দেওয়ালের কাছাকাছি কালো স্যুট পরা একটা মোটাসোটা লোক কালো চশমা জোড়া চোখ থেকে খুলে নিল। ঐ চমশা পরা লোকটি যে কে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবে ঐ লোকটিই মনে হয় নিলামদারের সঙ্গে ইশারা করে রেখেছে। যতক্ষণ চশমা পরা থাকবে, দশ-দশ করে বাড়িয়ে। যাও। যখন খুলে ফেলা হবে বুঝতে হবে আর নয়।
বন্ড দেখল MIS-এর ক্যামেরাম্যান মুখিয়ে রয়েছে। ফ্ল্যাশ-এর আলো ঝলকে উঠল। নিজের আসনে ফিরে গিয়ে বন্ড ফিসফিস করে মিঃ স্নো ম্যানকে বলল, পেয়ে গেছি। কাল আবার আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব। অনেক ধন্যবাদ। মিঃ স্নো ম্যান শুধু ঘাড় নাড়লেন। চোখ দুটো নিলামদারের দিকেই ফেরানো রইল।
নিলামদার হাতুড়ি ঠুকে বলে চলেছে এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার পাউন্ড দর উঠেছে। হাতুড়িটা ধীরে ধীরে নেমে এল, আপনিই পেলেন স্যার।
দর্শকরা সব হাততালি দিয়ে উঠে দাঁড়াল। শিকার এখন চেয়ারের খাঁচায় বন্দী। চোখে আবার সে কালো চশমাটা পরে নিয়েছে। বন্ডও চোখে কালো চশমাটা পরে নিল। লোকটার পিছনের চুলগুলি বেশ বড়। ঘাড়ের কাছে ছোট্ট কুঁজের মত একটু উঁচু হাড়। হাড়ের গণ্ডগোল আছে বোধহয়। হঠাৎ মনে পড়ে গেল লোকটা হল পিটার ম্যালিনোসৃকি-রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতাবাসের কর্মী হিসাবে ওর পরিচয় হল এগ্রিকালচারাল অ্যাটাশে, অর্থাৎ রাষ্ট্রদূতের কৃষি বিষয়ক সহকারী। ব্যাপার তা হলে এই।
বাইরে এসে লোকটি খুব তাড়াতাড়ি কভুইট স্ট্রীটের দিকে হাঁটতে শুরু করে দিল। একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়েছিল, তার মীটারের ফ্ল্যাগ ডাউন করা, ইঞ্জিন চালু। ধীরে সুস্থে তাইতে চড়ে বসে বন্ড শুধু বলল, ঐ লোকটা। তাড়াহুড়ো করবার দরকার নেই।
ড্রাইভার জবাব দিল ইয়েস, স্যার।
বন্ড স্ট্রীটের মোড়ে লোকটা ট্যাক্সি নিলে। ট্যাক্সির পিছনের লাল আলোটা নজর এড়াবে না। এবার শুধু দেখতে হবে, কেন্সিংটন প্যালেস গার্ডেন্স-এ যাবার সেই বিশেষ রাস্তায় ঢোকে কি না, যে রাস্তায় সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। যদি ঢোকে তা হলেই কোন গণ্ডগোল থাকে না। এই বিশেষ প্রবেশ পথের বাঁ দিকের প্রথম বাড়িটাই হল সোভিয়েট রাষ্ট্রদূতাবাস। আজ রাতের জন্য যে দু জন পুলিশ প্রহরীকে নিয়ম মাফিক এমবাসি গার্ড হিসাবে মোতায়েন রাখা হয়েছে সেখানে, তারা বাছাই করা লোক। তাদের ওপর ভার দেওয়া আছে সামনের ট্যাক্সির আরোহী সত্যিই সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতাবাসে ঢোকে কিনা।
