ফ্রক কোট পরা সুঠাম চেহারার এক দারোয়ান এগিয়ে এসে বলল, বলুন স্যার।
—কর্নেল স্মিার্স আছেন?
-আপনি কমান্ডার বন্ড এইদিকে আসবেন দয়া করে। কর্নেল স্পিদার্সের ঘরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, বসুন, সিগারেট বন্ড রূপার কেস থেকে একটা সিনিয়র সার্ভিস সিগারেট তুলে ধরাল।
স্মিদার্সের নামের সঙ্গে চেহারার বেশ মিল। মসৃণ পালিশ করা গম্ভীর চালচলন।
একঘেয়েমি কাটাতে ভদ্রলোককে বন্ড বলল, আপনি সোনার ব্যাপারে জানাবেন আমায়?
-জানি, নির্দেশমত আপনাকে সব জানাতে হবে কিছু গোপন না করে। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যা বলব সবটাই অত্যন্ত গোপনীয়।
বন্ড কোন জবাব না দিয়ে কঠিন হয়ে বসে রইল। বন্ডের মুখ দেখে কলে বুঝতে পারলেন এভাবে বলাটা উচিত হয়নি। তাই শুধরে নিয়ে বললেন, আপনি অভিজ্ঞ মানুষ এ কথা বলার প্রয়োজন ছিল না।
বন্ড বলল, না, আপনি ভালই করেছেন। অন্যের গোপন কথা কেউ নিজের গোপন কথার মত অত গুরুত্ব দেয় না। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি বড় কর্তা ছাড়া কাউকে বলব না।
-নিশ্চয়ই। আমার কথায় কিছু মনে করেননি তার জন্য ধন্যবাদ। আসলে ব্যাংকের কাজে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয় তো বলে অন্য প্রসঙ্গে চলে এলেন। সোনার ব্যাপারে আসি। এ বিষয়ে হয়ত তেমন মাথা ঘামাননি? বলল কর্নেল।
-দেখলে চিনতে পারি এই টুকুই যা।
–ঠিক আছে। এখন আসল কথা হল পৃথিবীতে সব থেকে মূল্যবান ও বিক্রয় উপযোগী পদার্থ সোনা। এক টুকরো সোনার বদলে যে কোন জিনিস পেয়ে যাবেন।
স্মিদার্সের দুই চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে কথা বলতে বলতে। বন্ড চেয়ারে গা এলিয়ে দিল।
-কর্নেল স্মিার্স শাসানির ভঙ্গিতে পাইপটা তুলে ধরে বললেন, আরেকটা কথা। সোনাকে সনাক্ত করা যায় না, কারণ স্বর্ণ মুদ্রার ওপর নম্বর থাকে না, তাছাড়া সোনার বাটের টাকশালের ছাপ ফেঁচে তুলে দেওয়া যায় তাই-এর উৎস বা কোথায় কোথায় চোরা চালান হচ্ছে তা ধরা যায় না। যদি ইংল্যান্ডে কত সোনা আছে জানতে চাওয়া হয় তাহলে ভল্টের, টাকশালের, স্যাকরার দোকানের সমস্ত একসঙ্গে যোগ করে একটা মোটামুটি পরিমাণ বলতে পারি।
-দেশের কত সোনা আছে তার হদিশ পাবার জন্য এত ব্যস্ত কেন?
-বিদেশের বাজারে আমাদের আর্থিক সঙ্গতির মাপকাঠি এটাই। আমাদের দেশীয় মুদ্রার ভিত নির্ভর করে কতটা। সোনা আছে তার ওপরে। সোনা কমে গেলে টাকার দামও কমে যায়। তীক্ষ্ণ চোখে এবার বলে ওঠে কর্নেল–অতএব ইংল্যান্ড থেকে সোনা পাচার হচ্ছে কিনা তাই দেখা আমাদের প্রধান কর্তব্য। যদি এরকম কোন ছিদ্রপথ ধরতে পারি তখন স্বর্ণ সন্ধানী বাহিনীর কাছে খবর গেলে তারাই সোনা কোষাগারে ফিরিয়ে নিয়ে আসে, সেইসঙ্গে অপরাধীদেরও। এইবার হতাশ গলায় বলে উঠলেন–এই লোভনীয় জিনিসে পৃথিবীর শক্তিশালী, বুদ্ধিমান। অপরাধীরাও আকৃষ্ট হয়েছে। তাদেরকে ধরা অত্যন্ত শক্ত।
-কিন্তু এটা তো সাময়িক ব্যাপার। সোনার ঘাটতি বেশিদিন থাকবে কেন? দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সে সোনা। আসছে সেটাই তো ঘাটতি পূরণের পক্ষে যথেষ্ট। উৎপাদনের বেশি থাকলে চোরাকারবার তো সেরকম হয়ই না। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পেনিসিনিলন নিয়ে হয়েছিল।
কিন্তু মিঃ বন্ড ব্যাপারটা অত সহজ নয়। পৃথিবীতে প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ হাজার চারশ করে জনসংখ্যা বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সোনা জমানো লোকের সংখ্যা। কেউ সোনা পুঁতে রাখে বাগানে, মেঝেতে, কেউ দাঁত বাঁধাতে। ব্যবহার করে, কেউ চমশার ফ্রেমে লাগায়, আর কেউ গয়না বানায়। এরাই তো বাজার থেকে মণ মণ সোনা নিচ্ছে।
আজকাল সোনার তার, গোল্ড প্লেটিং অথবা অ্যামালগাম তৈরির জন্যও সোনা লাগে। সোনা জিনিসটার আশ্চর্য গুণ আছে তাই যত দিন যাচ্ছে নতুন নতুন ভাবে নানা জিনিসে ব্যবহার করা হচ্ছে। মন্দ দিকও আছে। এক তো ধাতুটা কঠিন নয়। শুধু নাড়াচাড়া করাতে প্রত্যেক বছর খানিকটা করে সোনা নষ্ট হয়। তাছাড়া, করুন মুখে স্মিার্স বললেন, শুধু দুদিনের জন্য সোনা জমিয়ে রাখে এমন লোকও আছে। যেন ভয় তাড়াবার মাদুলী। আজ আমাদের এমন অবস্থা, রাতারাতি দেশের চেহারা বদলে যেতে পারে, অর্থনীতি পাল্টে যেতে পারে। তাই টাকা পয়সা নয় সোনা জমিয়ে দুর্দিনের সঙ্কট মোকাবিলা করাই নিশ্চিন্ত পথ। এ কথা বললে কি বেশি বলা হবে। একপ্রান্ত থেকে সোনা বের করে তৎক্ষণাৎ তা চলে যাচ্ছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে মাটির ভিতরে, এই আতঙ্কগ্রস্ত লোকেদের জন্য।
কর্নেলের বক্তৃতা শুনে বন্ড হাসল। ভাবল ভদ্রলোকের শয়নে স্বপনে জাগরণে শুধু সোনা আর সোনা জিনিসটি আকর্ষনীয় বটে তবে সব তথ্য জেনে নেওয়া দরকার। এর আগে যখন হীরে স্মাগলারদের সন্ধানে নেমেছিল তখন হীরে সম্বন্ধে মানুষের মোহ ও কুসংস্কারের অনেক কিছু জেনেছিল। বন্ড প্রশ্ন করল, আর কি কি জানা দরকার, আমার এই সমস্যা সমাধানে নামতে হলে।
-আপনার একঘেয়ে রাগছে না তো?..তা আপনি এইমাত্র বলছিলেন না, খনি থেকে অজস্র সোনা বার হচ্ছে তাতেই খদ্দেরদের চাহিদা মিটে যাবে। তা কিন্তু নয়। সত্যি কথা হল পৃথিবীর সোনা শেষ হয়ে আসছে। হয়ত ভাবছেন কিছু অনাবিষ্কৃত খনি রয়ে গেছে। এটা ভুল। যদি কোথাও থেকে থাকে না হলে সমুদ্রতলে মাটির নিচে। বহুবছর ধরে। লোভী মানুষরা সোনার খোঁজে সারা পৃথিবী চষে ফেলেছে। আগে প্রাচীন মিশর ও মাইমিনিতে প্রচুর সোনা পাওয়া যেত। অ্যাজটেকের রাজা মন্টেজুমা আর ইংকাদের কাছেও ছিল অঢেল সোনা, রোমান সম্রাট ক্রোয়েসাস ও মিডাস মধ্যপ্রাচ্যের যাবতীয় সোনা দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাছাড়া রাইন উপত্যকা, পো মালাগা এবং গ্রানাডার সমতলভূমি থেকেও সোনা বার করা হয়েছিল।
