বন্ড হাসল। হাতের ওপর থেকে মেয়েটির হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, আমি দুঃখিত। এ কাজের জন্য আমায় টাকা দেওয়া হয়েছে। অতএব কাজ না শেষ করে উপায় নেই। তাছাড়া গোল্ডফিংগারকে শায়েস্তা করার ইচ্ছে আমার খুব, একচোট উচিত শিক্ষা হওয়া উচিত, বুঝতে পেরেছ?
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে বন্ড দূরবীন দিয়ে দেখল গোল্ডফিংগারের মুখ। বন্ড গলা পরিষ্কার করে– মাইক্রোফোনের সুইচ অন করল।
ট্রান্সমিটার চালু হয়েছে বুঝতে পেরে গোল্ডফিংগার আকাশের দিকে তাকাল যেন আশীর্বাদ চেয়ে নিচ্ছে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে।
বন্ড কঠিন গলায় আস্তে বলল, শোনো-জেমস্ বন্ড কথা বলছি। মনে পড়ছে। খেলা শেষ তোমার। পুরো ব্যাপারটা এখন আমার হাতে। তুমি যদি আমার কথামত চল তাহলে এই কারসাজির খবর পুলিশ ও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে দেব না। আমার কথা বুঝে থাকলে একবার মাথা নাড়।
গোল্ডফিংগার কথামত ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। হাতের তাসগুলো সোজা করে টেবিলের ওপর বিছিয়ে দাও। সঙ্গে সঙ্গে তাসগুলো ছড়িয়ে পড়ল টেবিলের ওপর।
চেকবই থেকে পঞ্চাশ হাজার ডলারের চেক কেটে ডুডন্টকে দাও। পঁয়ত্রিশ ডুপন্টের, আমার দশ, বাকি পাঁচ মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার জন্য।
বন্ড দেখল তার আদেশ মত কাজ হচ্ছে। আবার কিছু কাজ বলল, এবার যা বলছি বইয়ের পেছনে লিখে নাও। আমার জন্য সিলভার মেটিওর ট্রেনে একটা কামরা বুক করে তাতে স্যান্ডউইচ ও পানীয়ের ব্যবস্থা রাখবে। আর হ্যাঁ কোনরকম ঝামেলা পাকাবার চেষ্টা করবে না, তাহলে কীর্তিকলাপের পুরো রিপোর্ট চলে যাবে পুলিশের হাতে। গোল্ডফিংগারকে ঘামতে দেখা গেল।
-ঠিক আছে। এবার চেকটা ডুপন্টকে দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নাও। বন্ড দেখল গোল্ডফিংগার শান্ত হয়ে ডুপন্টকে কিছু বলল।
–একটু দাঁড়াও, কাজ শেষ হয়নি। এবার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তার নাম জিজ্ঞাসা করল।
জিল মাস্টারটন।
গোল্ডফিংগার পা বাড়াতে আবার তীক্ষ্ণ স্বর ভেসে এল দাঁড়াও সে থমকে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ব্যালকনির দিকে তাকাল। যেন নিঃশব্দে বলে উঠল আজকের ঘটনা আমি ভুলব না মিঃ বন্ড।
বন্ড নরম সুরে বলে উঠল, একটা কথা। আমি জামিন হিসাবে মিস্ মাস্টারটনকে নিউইয়র্ক নিয়ে যাচ্ছি। তার পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবে। আর হ্যাঁ ট্রেনের কামরাটা যেন বেশ বড় হয়।
.
রাতের বেলার কাজ
এক সপ্তাহ পরে বন্ডকে দেখা গেল লন্ডনে ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের সদর দপ্তরের জানালায়। পূর্ণিমার রাতে লন্ডন শহর ঘুমিয়ে কাদা। বিগ বেন ঘড়িতে রাত তিনটের ঘণ্টা। এই সময় অন্ধকার ঘরে ফোন বেজে উঠল। বন্ড রিসিভারটা তুলে বলল, ডিউটি অফিসার কথা বলছি।
-স্টেশন H থেকে ফোন এসেছে স্যার।
–লাইন দিন।
সঙ্গে সঙ্গে স্টেশন H, অর্থাৎ হংকং এর ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের সঙ্গে বেতার যোগাযোগ করতে একটা সরু গলা পাওয়া গেল, ইউনিভার্সাল এক্সপোর্ট?।
-বলছি।
এবার লন্ডন অফিসের অপারেটরের গম্ভীর গলা, হংকং এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। দয়া করে জোরে কথা বলুন।
বন্ড অধীর হয়ে বলে উঠল, আপনি লাইন খালি করে দিন।
আবার সরু গলার একই কথার পুনরাবৃত্তি জোরে কথা বলুন।
এবার আরেকজনের গলা, হ্যালো! ইউনিভার্সাল এক্সপোর্ট
–হ্যাঁ।
– জিকসন কথা বলছি। শুনতে পাচ্ছেন।
— পাচ্ছি।
–জাহাজে আম পাঠানোর বিষয়ে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি জানেন?
-জানি, এখানেই আছে। বন্ড আসল ব্যাপারটা জানে। এটা সাংঙ্কেতিক কথাবার্তা। আসলে কিছুদিন আগে তিনটি চৈনিক স্পাই জাহাজ ব্রিটিশ পণ্যবাহী জাহাজ থামিয়ে খুঁজে দেখছিল কোন ব্যক্তিকে–জাহাজে পাচার করা হচ্ছে কিনা, যারা চীন থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। এই স্পাই জাহাজগুলিকে অবিলম্বে ধ্বংস করা দরকার।
দশ তারিখের মধ্যে পাওনা মেটাতে হবে। অর্থাৎ ঐ দশ দিনের মধ্যে ধ্বংস না করতে পারলে হয় জাহাজগুলো সরে যাবে নয়ত সুরক্ষা ব্যবস্থা দ্বিগুণ করে নেবে।
বন্ডের সংক্ষিপ্ত জবাব, ঠিক আছে।
-ধন্যবাদ। গুডবাই।
-বাই বলে কালো রঙের ফোনটি নামিয়ে রেখে সবুজ রঙের রিসিভার তুলে Q বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করল। লিস্পেট মাইন অর্থাৎ যেটি দিয়ে জাহাজ ধ্বংস করা হবে সেটি যাতে সকালবেলা BOAC-র প্লেনে যায় তার দায়িত্ব দেওয়া হল ঐ বিভাগকে।
সিগারেট ধরিয়ে গা এলিয়ে দিল বন্ড। মন চলে গেল হংকং-এর গুপ্তচর বিভাগের স্পাই ২৭৯ ডিকসন এর কাছে। এতক্ষণে সে নিশ্চয়ই জেনে গেছে মাইন পৌঁছে যাবে।
বন্ড মনে মনে হাসল। স্টেশন H ভিমরুলের চাকে ঢিল মেরেছে। ওদের সমস্যা ওরাই মেটাক বন্ড এই ঝামেলায়। নাক গলাবেন না। কিন্তু নিরুপায়। বড়কর্তা M শত্রুপক্ষকে তাদের অস্তিত্বের কথা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে চান।
তিন তিনেক আগে বন্ডকে নাইট ডিউটি দেওয়া হয়েছে শুনে M-এর সঙ্গে তর্ক বাধিয়ে দিয়ে ছিল। কি? না, দীর্ঘ ছ বছর ডাবু জিরো বিভাগের কাজ করে অফিসের কাজ সব ভুলে গেছে অতএব নাইট ডিউটির মত গুরু দায়িত্ব তার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়।
–M পরিষ্কার জানিয়ে দেয় শিখে নিতে সময় লাগবে না, তবে কোন অসুবিধা হলে অন্য ডিউটি অফিসাররা সাহায্য করবে। প্রয়োজন হলে তিনি নিজে। (মনে মনে পরিস্থিতি চিন্তা করে হাসল বন্ড। কোন ব্যক্তি বিপদে পড়েছে তার জন্য রাত দুপুরে তাকে টেনে তুলে M সে খবর জানাচ্ছে)। তাছাড়া আমি ঠিক করেছি উচ্চপদস্থ অফিসারদের কিছুদিন অফিসের কাজ করতে হবে। শীতল দৃষ্টিতে বন্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, অর্থদপ্তরের ধারণা ডাবল জিরো বিভাগ এখন অচল, তাই ওটা তুলে দেওয়া উচিত। ওদের সঙ্গে তর্ক করে জানিয়ে দিলাম ধারণাটা ভুল। যাগগে; ছাড় ওসব কথা, এখন যখন লন্ডনেই আছ তখন বাড়তি কিছু কাজ করলে মন্দ হবে না। আর হাত পা গুলোও সচল থাকবে।
