আর কি বলা যায়? বেঁটেদের ওপর একটু অবিশ্বাস আছে চিরকালের। ছোট থেকেই এদের মনে হীনমন্যতা জন্মায়। ফলে জীবন তারা বড় হতে চায়, অনেক বড়। যার ছোটবেলায় তাদের বিদ্রূপ করেছে তাদের থেকেও। উদাহরণ নেপোলিয়ন, হিটলার। পৃথিবীর সব গণ্ডগোলের মূলে আছে বেঁটে লোকেরা। বেঁটে হয়ে কুৎসিত মুখশ্রী নিয়ে অষ্টবক্র চেহারা নিয়ে গোল্ডফিংগারকে কি পরিমাণ অবদমন সহ্য করতে হয়েছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। অথচ ভদ্রলোকের প্রাণক্তি প্রবল। কোন্ পথে এ প্রাণশক্তি খরচ করেন গোল্ডফিংগার? টাকা রোজগার? ইন্দ্রিয়াশক্তিতে ক্ষমতালিপ্সয়? হয়ত সবদিকেই।
ভদ্রলোকের ইতিহাস কি? ইহুদী নয়–কিছুটা হয়ত রক্ত আছে। লাতিন আমেরিকান বা তার দক্ষিণের লোক নন। স্লাভ দেশীয়ও নন। হয়ত জার্মান-না না, নির্ঘাত বাল্ট অর্থাৎ রাশিয়ার বাল্টিক প্রদেশের মানুষ। হয়ত রাশিয়া থেকে। পালিয়ে এসেছেন। হয়ত সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল গোল্ডফিংগারকে কিংবা তার বাপ-মা বিপদের গন্ধ পেয়ে তাকে রাশিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তারপরে? কি করে পৃথিবীর বৃহত্তম ধনীদের একজন হলেন? ভদ্রলোকের পূর্ব ইতিহাস জানতে যথেষ্ট আগ্রহ হচ্ছে তবে, এখন তাসের জোচ্চুরি ধরতে পারলেই যথেষ্ট।
তৈরি? মিঃ ডুপন্ট গোল্ডফিংগারের প্রতি হাঁক দিলেন। গাড় নীল সুট আর গলা খোলা সাদা শার্ট পরিহিত গোল্ডফিংগার ছাদ বেয়ে এগিয়ে আসছেন। জামাকাপড় ভদ্ৰস্ত লাগলেও লাল রঙের ফুটবলের মত মাথাটা আর ঢাকা যায়নি। তার ওপর কানে একটা চামড়ার রঙের থিয়াবিং এইড।
মিঃ ডুপন্ট বসলেন হোটেলের দিকে পিছন করে। গোল্ডফিংগার তার সামনে। প্রথমবার তাস দেওয়ার পালা। গোল্ডফিংগারের উপর।
বন্ড ধীরে সুস্থে একটা চেয়ারে টেনে মিঃ ডুপন্টের পাশে এসে হেলান দিয়ে বসে কাগজের খেলার পাতাটা দেখবার ভান করল। আর চোখ রইল গোল্ডফিংগারের উপর।
বন্ড ধীরে সুস্থে একটা চেয়ারে টেনে মিঃ ডুপন্টের পাশে এসে হেলান দিয়ে বসে কাগজের খেলার পাতাটা দেখবার ভান করল। আর চোখ রইল গোল্ডফিংগারের তাসের ওপর।
বন্ড আগেই আন্দাজ করেছিল এবার নিশ্চিত হল-তাস দেওয়ার সময় কোন জোচ্চুরি হয় না। বেশ দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে তাস বাটছেন, বাঁ হাতে তাস ধরছেন সহজভাবে। কুখ্যাত জুয়াড়ী মেকানিস্ গ্রীপ অনুযায়ী বাঁ হাতের তিনটি আঙ্গুল তাসের লম্বা স্কিটার বিশেষ ভঙ্গিতে বেঁকে আঙ্গুল তাসের লম্বা দিকটায় বিশেষ ভঙ্গিতে বেঁকে থাকবে, তর্জনী তাসের মাথার একপাশে। অনায়াসে ফতে তাস বেটে দেওয়া যায়। কিন্তু সেভাবেও তাস ধরা হয়নি। হাতে আংটিও নেই তাসে দাগ দেওয়ার জন্য, স্টিকিং প্লাস্টারও নেই চিহ্নিত করার জন্য।
মিঃ ডুপন্ট বন্ডের দিকে ফিরে বললেন, পনের তাসের খেলা। প্রত্যেকে দুটো করে তাস টানবে আর একটা ফেলবে। বাকি সাধারণ রামির মতন।
তাস তুললে লক্ষ্য করল বন্ড মিলে যাওয়া তাস পরপর সাজালেন না, এমনকি বেমিল তাসগুলো একপাশে রাখলেন না–কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী সতর্ক হলে কিছুই তার নজর এড়াবে না। মিঃ ডুপন্টও দক্ষ ভঙ্গিতে তাস সাজালেন। ভাল তাসগুলিকে মাঝখানে রেখে।
খেলা শুরু হল। মিঃ ডুপন্ট প্রথম টানলেন, বাজে তাস উঠলেও মুখে তার চিহ্ন দেখা গেল না। সহজ ভাবেই খেলছেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে বার দুয়েক ভাল তাস পেলে তার খেলা হয়ে যাবে।
গোল্ডফিংগার সতর্ক হয়ে এত আস্তে খেলছেন যে অন্যেরা বিরক্ত বোধ করছে। তাস নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন, তারপর একটা কোনরকমে খেললেন।
তৃতীয়বার তাস টানবার পর দেখা গেল মিঃ ডুপন্ট পাঁচটা তাসের যে কোন কোট পেলেই গোল্ডফিংগারের কাছে। অনেক পয়েন্টে জিতে যেতে পারেন। হঠাৎ গোল্ডফিংগার সব মিলে যাওয়া তাস ফেলে দিল, শুধু কটা রেখে। ফল– মিঃ ডুপন্ট নিতান্ত অল্প পয়েন্টে জিতলেন।
মাইরী, আরেকটু হলেই ফেঁসে গিয়েছিলেন আপনি, মিঃ ডুপন্টের গলা বিরক্তি অথচ ধারাল গলায় বললেন। হঠাৎ হাত হাল্কা করে দিলেন যে?
গোল্ডফিংগার উদাস ভঙ্গিতে বলে উঠলেন–বিপদের গন্ধ পেয়ে আর কি। এরপর পয়েন্ট লিখে তাস ভেঁজে হেলান দিয়ে বসে কৌতূহলের দৃষ্টিতে বন্ডের দিকে চাইলেন।
ক দিন থাকছেন এখানে মিঃ বন্ড?
বন্ড হাসল, নামটা হচ্ছে বন্ড, B-O-N-D আমায় আজই রাত্রে নিউইয়র্ক ফিরতে হবে।
-আহা, মুখে আপসোসের ভঙ্গি করলেন। এবার আবার খেলা শুরু হল। বন্ডের চোখ কাগজে থাকলেও কান। রইল তাসের টেবিলে। ক্রমে দেখা গেল পুরো গেমটা জিতে নিলেন গোল্ডফিংগার। পয়েন্টের ব্যবধান দেড় হাজার অর্থাৎ জেতার মূল্য দেড় হাজার ডলার।
-এই আবার শুরু হল মিঃ ডুপন্টের হতাশ গলা শোনা গেল।
বন্ড কাগজ সরিয়ে নিস্পৃহভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, উনি কি প্রায় জেতেন নাকি?
-প্রায়ই মানে? মিঃ দুপন্টের গলায় বিতৃষ্ণা ঝড়ে পড়ল। প্রত্যেকবার।
গোল্ডফিংগার তাস দিতে শুরু করলেন। বন্ড বলল, আপনারা চেয়ার বদলে তো দেখতে পারেন। মাঝে মাঝে দেখা যায় এতে খেলোয়াড়দের কপাল খুলে যায়।
গোল্ডফিংগার থেমে গেল। বন্ডকে বললেন, দুঃখিত মিঃ বন্ড, চেয়ার পাল্টালে আর আমার পক্ষে খেলা সম্ভব নয়। আমার অ্যাগারোফোবিয়া নামে এক ব্যাধি আছে। খোলা মাঠ বা ফাঁকা জায়গা সহ্য করতে পারি না, তাই হোটেলের দিকে মুখ করেই বসি।
