সাড়ে ন টার সময় বন্ড নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইচ্ছা করেই যেন পথ হারিয়ে ফেলল, হোটেলের ভূগোলটা ভালভাবে পরখ করার জন্য। শেষে একই পরিচারিকার সঙ্গে দু বার দেখা হয়ে যাওয়ায় ভালমানুষের মত রাস্তা জেনে নিয়ে লিফটে করে নিচে নেমে এল। খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে সোজা চলে গেল বাগানে। যেকানে মিঃ ডুপন্ট তাকে চাবি দিলেন। তারপর তারা ধীরে ধীরে কাবানা ক্লাবের ছাদের দিকে রওনা দিলেন।
মিঃ গোল্ডফিংগারকে দেখে বন্ড চমকে গিয়েছিল। সে ছাদের এক কোণে ঠ্যাং তুলে শুয়েছিল। পরনে একটা হলদে মার্টিনের জাঙ্গিয়া, চোখে কাল চশমা, থুতনির নিচে অদ্ভুত একজোড়া টিনের পাখনা যেটা তার গলায় আটকান। সেখান থেকে দুই কাঁধের ওপর জড়িয়ে গেছে। তারপর একটু বেঁকে গিয়েছে ওপর দিকে।
বন্ড জিজ্ঞাসা করল গলায় ওটা কী?
-আপনি দেখেননি কখনও এর আগে। মিঃ ডুপন্ট বিস্মিত হয়ে বললেন ওটি সূৰ্য্যস্নানে সাহায্য করে। পাখনাটার পালিশ করা টিনে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে পৌঁছয় চিবুকের নিচে আর কানের পিছনে যে সব জায়গায় এমনিতে সূর্যের আলো লাগে না।
-বটে, বটে বলল বন্ড।
সেই লোকটির কাছে এসে মিঃ ডুপন্ট চড়া গলায় ডাকলেন–ও মশাই!
শায়িত লোকটি একটুও নড়ল না।
মিঃ ডুপন্ট স্বাভাবিক গলায় বললেন, লোকটা কানে ভীষণ কম শোনে। এবার তারা পায়ের কাছে গিয়ে আবার হাঁক দিলেন।
এবার গোল্ডফিংগার তাড়াতাড়ি করে উঠে বসলেন। চোখের চশমা খুলে জিজ্ঞাসা করলেন, আরে, কি ব্যাপার! গলা থেকে টিনের পাখনা খুলে উড়ে দাঁড়ালেন। শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বন্ডের দিকে তাকালেন।
–মিঃ বন্ডের সঙ্গে আলাপ করুন। মিঃ জেমস বন্ড আমার বন্ধু, নিউইয়র্ক থেকে আসছে। আপনার দেশের লোক। এখানে এসেছে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে।
মিঃ গোল্ডফিংগার হাত বাড়িয়ে দিলেন, আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুশি হলাম মিঃ বন্ড।
বন্ড হাত মেলাল, কঠিন শুকনো হাত এক মুহূর্তের জন্য মিঃ গোল্ডফিংগারের স্বচ্ছ নীল চোখ খুলে গিয়ে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলল বন্ডের উপর। যেন মনে হল হাড় চামড়া ভেদ করে সেই দৃষ্টি খুলির শেষপ্রান্তে গিয়ে পড়ল। তারপরেই এক-রে যন্ত্রের লেন্সের ওপর ঢাকনা দেওয়ার মতন চোখের পাতা মেলে এল। আর বন্ডের ছবিটা গোল্ডফিংগার তার স্মৃতির মণিকোঠায় এক কোণে রেখে দিলেন।
-আজ আর তাহলে খেলা হচ্ছে না, ভোতা বর্ণহীন গলায় প্রশ্ন নয় যেন মন্তব্য করা হল।
-খেলা হবে না মানে? মিঃ ডুপন্ট গর্জে উঠলেন। আপনি কি ভেবেছেন, আমায় গো হারান হারিয়ে গঁাট হয়ে বসে থাকবেন? ও টাকা উসুল না করে আমি এ হোটেল ছেড়ে এক পা নড়ছি না।
মিঃ ডুপন্ট মেজাজের মাথায় হাসলেন, স্যামকে বলেছি টেবিল লাগাতে। জেমস্ তাসখেলা না জানলেও শিখতে তো তেমন আপত্তি নেই, কি বল? বন্ডের দিকে ঘুরে বললেন, খবরে কাগজ নিয়ে বসে থাকতে খারাপ লাগবে না তো?
একটু বিশ্রাম করতে পারলে আমি বেঁচে যাই। ভীষণ ঘোরাঘুরি করতে হচ্ছে তো! বন্ড বলল।
আবার গোল্ডফিংগারের দুই চোখ অন্তভেদী দৃষ্টি ফেলল বন্ডের ওপর। তারপর বললেন, আমি বরং গায়ে কিছু জামাকাপড় পড়ে নিই। ভেবেছিলাম বিকেল বেলা গলফ খেলার কোচিং নেব। কিন্তু তাস খেলা আমার সবচেয়ে বড় নেশা। বন্ডের দিকে অনুসন্ধিৎ সুদৃষ্টি ফেলে বললেন, আপনি গল্ফ খেলেন, মিঃ বন্ড?
বন্ড গলা চড়িয়ে বলল যাতে শুনতে পান ইংল্যান্ডে থাকাকালীন খেলতাম মাঝে মাঝে।
কোন মাঠে খেলেন?
–হান্টারকোব্ব।
-বাঃ সুন্দর ছোট মাঠটা। আমি সম্প্রতি স্যান্ডউইচ শহরের রয়্যাল সোটা মার্কস ক্লাবে যোগ দিয়েছি। ওখানে কাছাকাছি আমার একটা ব্যবসা আছে। ক্লাবটা চেনেন?
খেলেছি ওখানে।
–কত হ্যান্ডিক্যাপ আপনার
—নয়।
–কি আশ্চর্য যোগাযোগ। আমারও তাই। আপনার সঙ্গে খেলতে হবে একদিন। মিঃ গোল্ডফিংগার নিচু হয়ে টিনের পাখনাটা তুলে নিলেন। মিঃ ডুপন্টকে বললেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি। বলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
বন্ডের বেশ মজা লাগল। এই সংক্ষিপ্ত ভদ্রতাটুকু করা হল নিতান্তই অভ্যস্ত ভঙ্গিতে। বন্ড মরল কি বাচল তাতে গোল্ডফিংগারের কিছু এসে যায় না। যেহেতু বন্ড সশরীরে এখানে এসে গেছে যখন, তখন সৌজন্যবশত দু একটা কথা বলতে ক্ষতি কি?
মিঃ ডুপন্ট সাদা কোট পরা এক পরিচারককে কি সব নির্দেশ দিলেন। অন্য দু জন বেয়ারা তাসের টেবিল লাগাতে শুরু করেছে। বন্ড ছাদের রেলিঙে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিঃ গোল্ডফিংগারের কথাই ভাবছিল।
ভদ্রলোক বন্ডের মনে রেখাপাত করেছে, কারণ এরকম উত্তেজনাবিহীন মানুষ কমই দেখা যায়। ভদ্রলোকের প্রতিটি চালচলন, অভিব্যক্তি একেবারে মাপা। বোঝাই যায় মস্তিষ্ক কতদূর শান্ত। কোন ব্যাপারে সামান্যতম শক্তি অপচয় হয় না। তবু যেন এই চঞ্চলতার মধ্যে কি একটা সতর্ক অবরুদ্ধ শক্তি লুকান আছে।
গোল্ডফিংগারকে দেখে মনে হয় সবকিছুর মধ্যে কেমন যেন বেখাপ্পা ভাব। দৈর্ঘ পাঁচ ফুটের বেশি নয়। থ্যাবড়া চাষাড়ে পা। আর কাঁধের ওপর বসান বিরাট মাথা। কোন অঙ্গই যেন তার নিজের নয়, বিভিন্ন জনের। হয়ত তাই কুশ্রীতা ঢাকবার জন্য রোদে পোড়বার এত উৎসাহ। বন্ড মনে মনে ভাবল গায়ের রঙ যদি সাদা ফ্যাকাসে হয় তবে ভয়াবহ দেখাবে। চুলের পাহাড়ের নিচে মুখও অদ্ভুত, চাঁদের মত গড়ন হলেও আকৃতি মোটেই চাঁদের মত নয়। সব মিলিয়ে এক বিচিত্র মিশ্রণ এই গোল্ডফিংগার।
