বন্ড যখন রিজেন্ট স্ট্রীটের সেই আলাদিনের গুহা থেকে বেরিয়ে এল ঝলমলে সোনা, রেশমি ঝিকিমিকিতে চোখ দুটো তার তখনও ধাধিয়ে আছে। বাকি দিনটা তার কাটল দপ্তরে গিয়ে খুঁটিনাটি সব কাজের ব্যবস্থা করতে এক গাদা লোকের মধ্যে বেছে বেছে এমন একজনের ফটো নিতে হবে যার মুখ চেনা নেই, পরিচয় জানা নেই, শুধু এইটুকুই জানা যে, সে লন্ডনের একজন সোভিয়েট গুপ্তচর।
পরের দিন বন্ড একটা ছুতো করে কমুনিকেশনস সেশনে গিয়ে ঘোরা ফেরা করতে করতে চারদিকে চোখ। বোলাতে লাগল। একটা ছোট ঘরে মিস্ মারিয়া ফ্রয়েডেনস্টাইন দু জন সহকারীকে নিয়ে পার্পল সাইফার-এ খবর পাঠাবার যন্ত্রপাতি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। পাঠানো খবরের একটা ফাইল হাতে তুলে নিল–তারপর লেখাটার ওপর চোখ বোলাতে লাগল। আর আধঘণ্টা পরেই ওয়াশিংটনে CIA-র ছোটখাটো কোনও কেরানি বেছে-বুছে ঠিক গেঁথে তুলবে সাঙ্কেতিক লিপিটা, আর পাঠোদ্ধার না করেই কর্তাব্যক্তির হাতে তুলে দেবে এবং সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে মস্কোতে KGB-র দপ্তরে।
একটা চরম প্রতারণা ঘটে চলেছে তার চোখের সামনে, হাত বাড়ালে স্পর্শ করা যায়। মারিয়া ফ্রয়েডেস্টাইন বন্ডের দিকে চেয়ে একটু মিষ্টি করে হাসল। তার ঝালর লাগানো সাদা ব্লাউজের তলায় লুকিয়ে রয়েছে একটা মারাত্মক রহস্যের কালো অন্ধকার। বন্ডের গায়ের চামড়া শিরশির করে উঠল। এ ধরনের মেয়ে ভালবাসা পায় না, এদের বন্ধু জোটে না, এদের সমাজের ওপরে ভীষণ রাগ থাকে। ঐ গুরুভার বুকের তলায় একটা ষড়যন্ত্রের রহস্য লুকিয়ে রাখার বাহাদুরিটুকু হয়ত ওর জীবনের একমাত্র সুখের উপকরণ। তার মনের তৃপ্তি এই যে আক্রোশ মিটিয়ে প্রতিশোধ নেওয়া যাচ্ছে এই দুনিয়ার ওপর যে দুনিয়ার কাছ থেকে ঘৃণা আর অবহেলা ছাড়া আর কিছুই সে পায়নি। এদের মত মানুষের। মনের ঘটনাটা সাধারণত এই রকমই হয়–সমাজের কালাপাহাড়। আজ রাতেই মেয়েটি বড়লোক হয়ে যাচ্ছে। এই অর্থের জন্যই হয়ত ওর চরিত্রটা বদলে যাবে। এদিকে M বলেছেন, পার্পল সাইফার-এ আরও কড়া মশলা মেশাবেন, ভাওতার মাত্রাটা চড়িয়ে দেবেন। কপাল ঠুকে জুয়া খেলা। একটা কোন ভুয়া খবর যা যাচাই করে নেবার রাস্তা আছে, তা হলেই KGB-র ওরা শাকের তলায় আঁশের গন্ধ পাবে। এরকম একটা অপমানকর ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়া মানেই প্রতিবিধান এবং প্রতিশোধের আশু ব্যবস্থা। ওরা ধরে নেবে যে, মারিয়া ফ্রয়েডে স্টাইন ডবল এজেন্ট–বৃটিশ আর রাশিয়ান, উভয় পক্ষকেই ঠকাচ্ছে। তাকে যে তক্ষুণি পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলা হবে, সেটা অবধারিত। বন্ড বাড়ি। ফিরে কথাগুলো বসে বসে ভাবছিল। মেয়েটি গুপ্তচর বৃত্তির কুচক্রে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে, প্রাণের ঝুঁকি তার থাকবেই। খুব ভাগ্য এসব ব্যাপারে ওকে মাথা গলাতে হবে না। মেয়েটার ভাগ্য তো আর ওর হাতে নয়।
জর্জস্ট্রীটটা ট্যাক্সি আর বাড়িতে গাড়িতে ছেয়ে গেছে। ভিড়ের মধ্যে পথ করে সিঁড়ি বেয়ে দরজার দিকে এগোল। বন্ড। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিলাম ঘরে পৌঁছল বন্ড। নিজের জায়গাটা খুঁজে নিয়ে বসতে বসতে দেখল, ঠিক পাশের আসনেই মিঃ স্নো ম্যান হাঁটুর ওপর একটা প্যাড রেখে কি যেন সব হিসেব-নিকেশ করছেন। ঘরটা ভীষণ বড় সড়। ঘরের মাথার ওপরে বড় বড় দুটো ঝাড়বাতি ঝুলছে। দেওয়ালের ধার ঘেঁষে একটা মঞ্চ খাড়া করা হয়েছে। আর তারই ওপর একদল ক্যামেরাম্যান দাঁড়িয়ে আছে টেলিভিশন ক্যামেরা নিয়ে। MIx-এর ক্যামেরাম্যানও আছে ওখানে সানডে টাইমস -এর প্রেস কার্ড নিয়ে। প্রায় শ খানেক ব্যবসায়ী আর দর্শক উৎসুক হয়ে বসে রয়েছে ছোট ছোট সোনালি চেয়ারে। নিলামদার খুব শান্ত গম্ভীর গলায় কথা বলছেন, সকলেই তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। পরনে নিখুঁত ডিনার জ্যাকেট। কথায় কোন নাটকীয় ঝোঁক নেই।
পনের হাজার পাউন্ড। ষোল হাজার। একটা ক্যাটালগ যেন চট করে একবার উঁচু হয়ে উঠল। একে একে কুড়ি হাজার দর উঠল। বন্ড ক্যাটালগের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে জিজ্ঞেস করল কি বিক্রি করছে?
মিঃ স্নো ম্যান বললেন, ৪০ নম্বরের মালটা। পরিচারকের হাতে কালো মখমলে ঢাকা ট্রেতে যে হীরের। নেকলেসটা রয়েছে ঐটা। পঁচিশ পর্যন্ত উঠতে পারে। সত্যিই সেটা পঁচিশ হাজারের বেশি উঠল না।
স্নো ম্যান বললেন, আর একটা মাল আছে তারপরই আসল নাটকের শুরু।
ইতিমধ্যেই একজন পরিচারক মখমল ঢাকা ট্রের ওপর খুব সন্তর্পণে চুনি আর হীরের তৈরি কি সব সাজিয়ে দিয়েছে। বন্ড ক্যাটালগ দেখল, ৪১ নম্বর মাল, চটকদার ভাষায় বিবরণ দেওয়া হয়েছে : একজোড়া অতি চমৎকার এবং উত্তম শ্রেণীর চুনি এবং হীরার ব্রেসলেট। প্রত্যেকটির সামনের দিকে একটি বৃহৎ এবং দুটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র চুনির ডিম্বাকৃতি নক্সা আছে। তার চারদিকে বেষ্টন করে আছে চতুষ্কোণ হীরার পাড়। নক্সাগুলো সোনা বাঁধানো বড় বড় এক চুনিকে কেন্দ্র করে অপরূপ ভঙ্গিমায় লীয়ায়িত হয়ে উঠেছে।
পারিবারিক ইতিবৃত্ত অনুসারে এই অলঙ্কারগুলি মিসেস ফিটজহার্বার্ট-এর (১৭৫৬-১৮৩৭) সম্পত্তি ছিল। মিসেস ফিটজহার্বার্ট সম্ভবত অলঙ্কার দুটি তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রীকে দান করেছিলেন।
আবার ডাক শুরু হল। বন্ড ধীরে ধীরে উঠে চেয়ারের মাঝ বরাবর যাতায়াতের পথ ঘরে ঘরের পিছন দিকটায় এসে দাঁড়াল। এখানে অনেক লোকের ভিড়। সোভিয়েট দূতাবাসের ২০০ জন কর্মীর ফটো গুপ্তভাবে সংগ্রহ করা আছে। ওদের দপ্তরে, সেগুলো খুঁটিয়ে দেখে রেখেছে বন্ড; সে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল চেনা মুখ পায় কিনা। অনেকের চোখেই কালো চশমা। বোঝার উপায় নেই। চেয়ারে ফিরে গেল বন্ড। আসল জিনিসের ডাক শুরু না-হলে বোধহয় লোকটাকে চেনবার সুযোগ পাওয়া যাবে না।
