–যদি একই লোকের সঙ্গে আপনি সমানে খেলে থাকেন তাহলে জোচ্চুরি করা হয়েছে আপনার সঙ্গে।
— ঠিক-তাই বলে মিঃ ডুপন্ট সজোরে টেবিলে চাপড়ালেন। পরপর চারদিন হারবার পর আমার এই কথাটাই মাথায় এসেছিল, যে নির্ঘাৎ আমাকে ঠকান হচ্ছে। অতএব একবার যদি তাকে বার করতে পারি কি করে জোচ্চুরি করে তবে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে মায়ামি শহর থেকে বার করে দেব।
পরের দিন থেকে দ্বিগুণ বাজি ধরতে শুরু করলাম। প্রতিটি তাস, প্রতিটি চালচলন লক্ষ্য করলাম কিন্তু কিছুই ধরতে পারলাম না। ইশারা নেই, ইঙ্গিত নেই, যখন ইচ্ছে তাসের প্যাকেট বদলাচ্ছি, আমার হাত দেখাও সম্ভব নয় উল্টোদিকে বসতাম বলে। আশে পাশেও কেউ নেই যে ইশারায় জানিয়ে দেবে। আজ সকালে এমনকি বিকেলেও হেরেছি আমি। বন্ড তাঁর খেলোয়াড়ী মনোবৃত্তির অভাব আছে মনে করবে বলে বলল, শেষে খেলটার ওপর চটে গেলেও আচরণে তা প্রকাশ পেতে দিইনি। ভদ্রভাবে সব টাকা মিটিয়ে দিয়ে ভদ্রলোকের কাছ থেকে পালাবার জন্য এয়ারপোর্টে গিয়ে নিউইয়র্কগামী প্লেনের টিকিট কেটে ফেললাম। ভাবতে পারেন। মিঃ ডুপন্ট শূন্যে দু হাত ছুঁড়ে বলে উঠলেন–স্রেফ পালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পঁচিশ হাজারকে লাখে পৌঁছতে দেখে, লোকটি আমায় ঠকাচ্ছে বুঝলেও অসহ্য লাগছিল কোন উপায় নেই দেখে। ভাবতে পারেন, আমি শ্ৰীযুক্ত জুনিয়াস ডুপন্ট ল্যাজ গুটিয়ে পালাচ্ছি।
বন্ড সহানুভূতি সূচক শব্দ করল। আরেক প্রস্থ পানীয় এল। এবার তার আগ্রহ জাগছে কারণ তাস খেলায় তার নেশা আছে। ডুপন্টের কথাগুলো তার চোখে ছবির মত ভেসে উঠল। মিঃ ডুপন্টকে ঠকান হচ্ছে সে বিষয়ে সন্দেহ। নেই। বন্ড বলল, পঁচিশ হাজার ডলার তো অনেক। পয়েন্ট পিছু কত বাজি ধরছিলেন আপনারা?
মিঃ ডুপন্ট হেসে বললেন, এক পয়েন্টে সিকি, তারপর আধ ডলার, সবশেষে এক ডলার। উঁচু বাজি সন্দেহ নেই। পয়েন্ট পিছু সিকি ডলার ধরলেও এক এক গেমে পাঁচশ ডলার আর এক ডলার ধরলে তো মারাত্মক ব্যাপার।
– এক দু বার আপনিও জিতেছেন নিশ্চয়?
-সে তো নিশ্চয়ই। কিন্তু যখনই আমি বিরাট পয়েন্টে হারাবার চেষ্টা করি তক্ষুনি যেন বুঝতে পেরে মিলে যাওয়া তাসগুলো সব ফেলে দেয়। ফলে জেতার অঙ্গ খুব সামান্য। একবারও ফাঁদে ফেলতে পারিনি, কিন্তু ওর ফাঁদে আমি ধরা পড়ে একরাশ পয়েন্ট হেরে গিয়েছি। মনে হয় আমার হাতের প্রত্যেকটা তাস ওর জানা।
-ঘরে কোন আয়না থাকে নাকি?
-আরে না! আমরা সর্বদা খোলা মাঠে বসে খেলি। ওর নাকি সূর্যস্নান খুব দরকার। তা করেছে বটে ব্যাটা রোদে পুড়ে পুড়ে লাল গলদা চিংড়ির মত চেহারা হয়ে গেছে। সকাল আর বিকেল ছাড়া খেলে না। রাত্রিবেলা খেললে নাকি ঘুম চটে যায়।
লোকটি কে বলুন তো? নাম কি?
গোল্ডফিংগার।
প্রথম নাম।
–অরিক। অর্থাৎ সোনালি, তাই না? লোকটা যে সোনালি সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। চুলগুলো পর্যন্ত লাল।
–কোন দেশের লোক?
আপনি হয়ত বিশ্বাস করবেন না, লোকটা আসলে ইংরেজ। আমেরিকার নাসো-তে থাকে। নাম শুনে ইহুদী মনে হয়। কিন্তু চেহারায় নয়। বয়স বিয়াল্লিশ, অবিবাহিত, পেশা দালালি। নাসো-র পাসপোর্টের সবকিছু লেখা আছে। তাস খেলা শুরু করার আগে ডিটেকটিভ দিয়ে ওর পাসপোর্ট দেখিয়ে নিয়েছিলাম।
-কিসের দালাল?
মিঃ ডুপন্ট শুকনো হাসি হেসে বললেন, সে কথা জিজ্ঞাসা করাতে ও ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল, সোজাসুজি প্রশ্ন করলে মুখে তালাচাবি, কিন্তু আজে বাজে ব্যাপারে অনর্গল বক্ক্ করে যাবে।
ভদ্রলোকের টাকা পয়সা কেমন?
–আরে! মিঃ ডুপন্ট প্রায় ফেটে পড়লেন, সেইটাই তো আসল ব্যাপার। অগাধ টাকা পয়সা লোকটার। আমার ব্যাংক মারফৎ নাসোতে খোঁজ নিয়েছি। বড়লোকের জায়গা নাসো। অলিতে গলিতে কোটিপতি। কিন্তু তাদের মধ্যের এ লোকটা এক নম্বর বা দুনম্বর। সব টাকা নাকি সোনার বাটে রাখে। কাগজের টাকায় বিশ্বাস নেই। এইজন্যই হয়ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধনকুবেরদের একজন হতে পেরেছে। ব্যবসা পদ্ধতিতেও নিশ্চয় কিছু সার বস্তু আছে। কিন্তু লোকটা যদি অতই বড়লোক তবে ঠকিয়ে পঁচিশ হাজার ডলার রোজগার করে কেন?
প্রশ্নের উত্তরের জন্য বন্ডকে ভাবতে হল না তার আগেই সাড়ম্বরে টেবিলে এসে গেল বিরাট প্লেট ভর্তি কাঁকড়া। রূপার বাটি ভর্তি গলান মাখন আর উঁচু এক থাক টোস্ট। সবশেষে এল গোলাপী শ্যাম্পেন।
মিঃ ডুপন্ট সহর্ষে, যত পারেন নিন, বলে নিজের প্লেটে কয়েক টুকরো কাঁকড়া ও গলানো মাখন নিয়ে খেতে শুরু করলেন। বন্ডও হাত চালাল এবং খেতে শুরু করল। গিলতে লাগল বলা যায় কারণ এমন উপাদেয় জিনিস সে জীবনে খায়নি।
পাথুরে কাঁকড়ার মাংস অতি নরম মিষ্টি। টোস্ট ও গলা মাখনের ধোঁয়াটে গন্ধ মাংসের সঙ্গে চমৎকার লাগছিল। বরফ-ঠাণ্ডা শ্যাম্পেনে মৃদু স্ট্রবেরীর গন্ধ। নিবিষ্ট মনে খেতে এত ব্যস্ত যে আর কোন কথাবার্তা হল না।
শেষ পর্যন্ত একটা ঢেকুর তুলে মিঃ ডুপন্ট হেলান দিয়ে বসলেন। মুখ লাল, সগর্বে বন্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, মিঃ বন্ড, পৃথিবীর আর কেউ বোধহয় আমাদের মত এত ভাল খাবার খায়নি কি বলেন?
বন্ড ভাবছিল প্রাচুর্যে ভরা সহজ জীবন চেয়েছিল সে। এখন কেমন লাগছে, কেমন লাগছে গান্ডে পিন্ডে গিলতে আর হাস্যকর মন্তব্য শুনতে? সহসা মনে হল আর যেন একত্রে খেতে না হয়। নিজের বিরক্তিতে নিজেই লজ্জা পেল বন্ড। যা চেয়েছিল তাই তো পেয়েছে। ভিতরের অতিভদ্র সত্তাটি একটাকে সহ্য করতে পারছে না। তার মনের ইচ্ছা কেবল পূর্ণ হয়নি জোর করে গুঁজে দেওয়া হয়েছে। বন্ড বলল, সে অবশ্য বলা মুশকিল, তবে খাওয়াটা সত্যিই ভাল।
