বন্ড মনস্থির করেই ফেলেছিল ব্ল্যাকমেল, গুণ্ডামি, নারী–যে সমস্যা নিয়েই হোক না কেন ডুপন্টের প্রস্তাবে সে রাজি হবে। তার বদলে সে পাবে এক টুকরো আনন্দোচ্ছল জীবন।
বন্ড বিনয়ের সঙ্গে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মিঃ ডুপন্ট বাধা দিলেন, দয়া করে না বলবেন না মিঃ বন্ড। আর বিশ্বাস করুন, আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হব। এরপর ওয়েট্রেসকে ডেকে টাকা মিটিয়ে দিলেন পানীয়ের। অন্যান্য অনেক বড়লোকের মত ইনিও নিজের টাকা জাহির করা বা কত টিপস দিলেন সেটা জাহির করা অসভ্যতা বলে মনে করেন সেটা তার পেছন ফিরে বিল মেটান দেখেই বোঝা গেল। তারপর টাকাটা পকেটে রেখে দিয়ে বন্ডের বাঁ হাতে হাত রাখলেন। কিন্তু পরক্ষণেই হাত সরিয়ে নিলেন বন্ডের ঠিক ভাল লাগছে না দেখে। দু জনে সিঁড়ি বেয়ে নিচে হলঘরে চলে এলেন এবার।
-আচ্ছা এবার আপনার প্লেনের রিজার্ভেশন-এর ব্যাপারটা ঠিক করে নেওয়া যাক, বলে ডুপন্ট টিকিট কাউন্টারের দিকে এগোলেন। সংক্ষিপ্ত কথায় কাজ সারা হতে বোঝাই গেল তাঁর নিজস্ব আমেরিকান দুনিয়ায় কতদূর প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা।
বাইরে বেরোতেই চকে এক ক্রাইস লার ইরিপরিয়াল এসে দাঁড়াতেই ইউনিফর্ম পরা এক সোফার চটপট গাড়ির দরজা খুলে ধরল। বন্ড দেখল গাড়ির ভেতরটা বেশ ঠাণ্ডা। সে জমিয়ে বসল। ট্রান্স আমেরিকার এক কর্মচারি বন্ডের সুটকেস সোফারের হাতে তুলে দিয়ে সেলাম করে চলে গেল। মিঃ ডুপন্ট সোফারকে সমুদ্রতীরের নাম করা রেস্তোরাঁ বিলস্ অন দ্য বীচ এ নিয়ে যেতে বললেন। সঙ্গে সঙ্গে বিশাল গাড়িটি রাস্তায় এসে গন্তব্যস্থলের দিকে এগোল।
মিঃ ডুপন্ট হেলান দিয়ে বসে বললেন, পাথুরে কাঁকড়া খেতে আপনার ভাল লাগে মিঃ বন্ড? খেয়েছেন তো?
বন্ড জানাল তার স্বাদ সে পেয়েছে এবং খেতে ভালই লাগে।
গাড়ি দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলল, আর মিঃ ডুপন্ট বকবক করতে লাগলেন রেস্তোরাঁ সম্পর্কে, পাথুরে কাঁকড়া ও আলাস্কা কাঁকড়ার তুলনামূলক গুণাবলী সম্পর্কে।
রেস্তোরাঁর ওপর গোলাপী নিয়নের অক্ষরে লেখা–বিলস্ অন্য দ্য বীচ। বন্ড গাড়ি থেকে বেরোতে গিয়ে শুনল মিঃ ডুপন্ট-এর সঙ্গে সোফারের কথোপকথনে কিছু অংশ। আলোহা সুইট-টি এই ভদ্রলোকের জন্য রিজার্ভ করে রাখ।…যদি কোন অসুবিধে হয়, ম্যানেজারকে বল আমাকে ফোন করতে।
সিঁড়ি দিয়ে এসে ভেতরে একটা বড় সাদা রঙ করা ঘরে এসে পৌঁছল বন্ড। জানালায় গোলাপী মসলিন পর্দা। অনেক স্ত্রী-পুরুষ এখানে, যাঁদের গায়ের রঙ বাদামী, পোশাক ঝকঝকে চটকদার, চোখে জড়োয় কাজ করা চশমা, হাতে সোনার চুড়ি।
রেস্তোরাঁর ইটালিয়ান মালিক বিল শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এসে বলল, আরে মিঃ ভুঃ পন্ট! কি সৌভাগ্য আমার, স্যার! আজ রাতে ভিড়টা একটু বেশি, তবে আপনাদের জায়গা করে দিচ্ছি। মাথার ওপর একটা মেনু কার্ড নিয়ে একেবেঁকে চলে এলেন শ্রেষ্ঠ টেবিলটির দিকে। দুটো চেয়ার টেনে তাদের বসতে বলে বেয়ারা ও ওয়েটারকে ডেকে, মেনু কার্ড রেখে সৌজন্য বিনিময় করে চলে গেলেন।
মিঃ ডুপন্ট বন্ডকে বললেন, খাবার পছন্দের ব্যাপারটা আমার ওপরেই ছেড়ে দিন। পছন্দ না হলে খাবার ফেরত পাঠিয়ে দেব। হেড বেয়ারাকে অর্ডার দিলেন টাটকা পাথুরে কাঁকড়া সঙ্গে গলানো মাখন আর মোটা টোস্ট।
মিঃ ডুপন্ট মৌজ করে সিগারেট বার করলেন। চারপাশে দৃষ্টি বোলালেন, দু একজনের দিকে হাত নাড়লেন হাসি মুখে। তারপর বন্ডের কাছে ঘেঁষে এসে বললেন, বড় আওয়াজ হচ্ছে, কিন্তু কোন উপায় নেই। কুণ্ঠিত গলায় বললেন, কাঁকড়া খাওয়ার জন্যই এখানে আসতে হয়। অদ্ভুত ভাল কাঁকড়া রান্না করে এরা। আশা করি আপনার এলার্জি-ট্যালার্জি নেই। একবার একটি মেয়েকে কাঁকড়া খাইয়ে খুব লজ্জায় পড়ে গেছিলাম, তার ঠোঁটটা সাইকেলের চাকার মত ফুলে গেছিল।
মিঃ ডুপন্টের আচরণ দেখে বন্ড বুঝতে পারল তার ধারণা তিনি বন্ডকে ম্যানেজ করে ফেলেছেন তাই এত কর্তৃত্ব দেখাচ্ছেন। এয়ারপোর্টের সেই লাজুক ব্যক্তির সঙ্গে কোন মিলই খুঁজে পাওয়া যায় না। এতক্ষণে বোধহয় নিশ্চয়ই জানা যাবে ভদ্রলোক কি চান বন্ডের কাছ থেকে।
বন্ড জানাল যে তার এলার্জি নেই। শুনে ভদ্রলোক নিশ্চিত বোধ করলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ, মিঃ ডুপন্ট লাইটারের আওয়াজ করতে গিয়েও করলেন না। টেবিলের ওপর দু-হাত রেখে বললেন, রামি খেলেছেন কখনো, মিঃ বন্ড?
-হ্যাঁ বেশ ভাল খেলা। আমার ভালই লাগে।
–খেলাটা যদি দুজনের মধ্যে হয়?
—খেলেছি কিন্তু তাতে মজা নেই। হার জিৎ তেমন হয় না। খেলাটা একঘেয়ে লাগে।
মিঃ ডুপন্ট ও মাথা নেড়ে সায় দিলেন। জিন রাখি বা ওকালাহোমা-র মত খেলা নয় ঠিকই তবে সময় কেটে যায়। অনেকগুলো তাস নিয়ে খেললেও শেষ পর্যন্ত সমান সমানই দাঁড়ায়। ওয়াইন ওয়েটার নির্দেশমত দু পেগ মার্টিনি আনলে মিঃ ডুপন্ট তাকে আরও দু গ্লাস আনতে বলল।
দুজনে গ্লাসে চুমুক দিয়ে আবার কথা শুরু করল। মিঃ ডুপন্ট বললেন, আমি যদি আপনাকে বলি মিঃ বন্ড, যে আমি একজনের সঙ্গে রামি খেলে এক সপ্তাহে পঁচিশ হাজার ডলার হেরেছি, তাহলে আপনার বক্তব্য কি? বন্ড কিছু বলার আগেই মিঃ ডুপন্ট বলে উঠলেন–মনে রাখবেন আমি একজন ভাল তাস খেলোয়াড়, রিজেন্সি ক্লাবের মেম্বার। বাঘা বাঘা লোকেদের সঙ্গে খেলেছি যেমন চার্লি গোরেন, জনি ক্রফোর্ড। সুতরাং তাসের টেবিলে বোকামি করবার পাত্র আমি নই। বলে সন্ধানী দৃষ্টিতে বন্ডের দিকে তাকালেন।
