আসুন।
ধন্যবাদ, বন্ড সিগারেট নিল এবং নিজের লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরাল।
-ফ্রান্সে দেখা হয়েছিল আমাদের। ১৯৫১ সালের হোটেল রয়েল লে উফসস, ডুপন্টু আগ্রহের সঙ্গে বন্ডের দিকে। তাকালেন। সেই ক্যাসিনো রয়েলের কথা মনে পড়ছে? ফরাসি ভদ্রলোকটির সাথে আপনি সেদিন সেই বিরাট তাসের জুয়া খেলছিলেন। আমি আর ইথেল, অর্থাৎ আমার স্ত্রী, বসেছিলাম আপনার ঠিক পাশে।
বন্ড পৌঁছে গেল কয়েক বছর আগের সেই দিনটিতে। তারা ৪ ও ৫ নম্বরে বসেছিল, বন্ড ছিল ৬ নম্বর চেয়ারে। তাদেরকে ভাল মানুষ বলে মনে হয়েছিল। সেই দিন শত্রুপক্ষের দুদে গুপ্তচর ল্য শিফকে জুয়ায় সর্বস্ত করেছিল। সমস্ত দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সবুজ টেবিলের ওপর আলোর বন্যা, গোলাপী হাতগুলো কাঁকড়ার পঁাড়ার মত এগিয়ে আসছে, নাকে এসে লাগছে সিগারেটের ধোয়া আর ঘামের কটু গন্ধ। কি অদ্ভুত এক রাত। বন্ড, ডুপন্টের দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ খুব মনে পড়ছে আমার। তবে দেরি হল বলে কিছু মনে করবেন না, কারণ তাস ছাড়া সে দিন কিছুই নজরে ছিল না আমার।
মিঃ ডুপন্টও একমুখ হেসে বললেন, এতে মনে করবার কিছু নেই, আর আপনিও আমাকে মাফ করুন উড়ে এসে জুড়ে বসবার জন্য। কিন্তু তার আগে আমাদের সাক্ষাতকে সেলিব্রেট করা দরকার, কি নেবেন আপনি? বলে একজন ওয়েট্রেসকে ডাকলেন।
ধন্যবাদ। বুবো অন্ দ্য রকস।
এবং এক পেয়ালা পানি মেশানোর জিম্পল হেগ।
মিঃ ডুপন্ট একমুখ হেসে সামনের দিকে ঝুঁকে বসে বললেন, আমি জানতাম এ আপনি ছাড়া আর কেউ নয়। আপনাকে বসে থাকতে দেখেই চিনেছিলাম। তখন আমি নিজেকে বললাম, জুনিয়াস, মুখ চিনতে তো তুমি ভুল কর না। তবু নিশ্চিত হয়ে নিলাম। ঐ ট্রান্স আমেরিকান প্লেনের আমি যাত্রী ছিলাম। যখন মাইক্রোফোনে জানলাম যে প্লেনটা আজ ছাড়বে না তখন আপনার মুখের ভাব লক্ষ্য করলাম, বুঝলাম ঐ প্লেনের যাত্রী আপনিও। তাই দৌড়ে গিয়ে কাউন্টার যাত্রী তালিকা জানতে চাইলাম আর বলা বাহুল্য সেখানে লেখা জে বন্ড।
যেন নিজের চতুরতায় পরিতৃপ্ত মিঃ ডুপন্ট। পানীয় এসে পড়ল, নিজের গ্লাস তুলে ধরে তিনি বসলেন আপনার সুস্বাস্থ্যের উদ্দেশ্যে স্যার। আমার ভাগ্য ভাল যে আজ আপনার দেখা পেয়েছি।
বন্ড একটু হেসে গেলাসে চুমুক দিল। অবাক ঝুঁকে বসলেন মিঃ ডুপন্ট, চারপাশটা দেখে নিলেন সব ফাঁকা। তবু তিনি নিচু গলায় বললেন, আপনি হয়ত ভাবছেন, জুনিয়াস ডুপন্টের সঙ্গে আবার দেখা হয়ে ভালই লাগল।…কিন্তু আসল ব্যাপারটা কিঃ মিঃ ডুপন্ট দুই ভুরু তুলে তাকালেন, আরো ঝুঁকে বসলেন, কিছু মনে করবেন না, মিঃ বন্ড; অন্যের গোপনীয়…মানে ব্যাপারে নাক গলানো আমার অভ্যেস নয়। ক্যাসিনো রয়েলের সেই জুয়াখেলার পর আমি কানাঘুষো শুনেছিলাম যে আপনি একজন অসামান্য জুয়াড়ী নন, আপনি হচ্ছেন একধরনের…মানে…গোয়েন্দা গোছের মানুষ। অর্থাৎ কিনা, নানান গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তদন্ত করে থাকেন। কথাটা বলে ফেলে মিঃ ডুপন্ট অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে উদ্বিগ্ন চোখে বন্ডের দিকে তাকিয়ে কপালের ঘাম মুছতে লাগলেন রুমাল দিয়ে।
বন্ড তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল। তার নীল ধূসর চোখ কঠোর থেকে নরম হল, সেই সঙ্গে ফুটে উঠল ব্যাঙ্গ আর আত্মগ্লানি। বলল, সত্যিই সে সময় ঐ ধরনের ব্যাপার নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম, বীরত্ব টীরত্ব ফলাতে মজা লাগল আর কি। তবে আজকাল পৃথিবী শান্ত হয়ে এসেছে। ওসবের কাজকর্মও ফুরিয়েছে।
-নিশ্চয়, নিশ্চয়, মিঃ ডুপন্ট ডান হাতের সাহায্যে পুরো ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার মত ভঙ্গি করল। পরের প্রশ্নটা করলেন বটে তবে জানতেন উত্তরটা ডাহা মিথ্যে হবে, তা এখন নিশ্চয় আপনি বেশ গুছিয়ে বসতে পেরেছেন? এক টুকরো পিতৃসুলভ হাসি হেসে বললেন, কোন লাইনে আছেন আপনি? অবশ্য আপনার যদি সেটা জানাতে আপত্তি না থাকে…
আমি আমদানি রপ্তানির ব্যবসা ধরেছি। ইউনিভার্সাল এ কাজ করি আমি। ওদের সঙ্গে আপনারও কারবার আছে বোধহয়?
মিঃ ডুপন্ট লুকোচুরি খেলাটা বেশ চালিয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন বন্ড তার পুরনো পেশাতেই আছে। বললেন, হুমম্, ইউনিভার্সাল। দাঁড়ান দাঁড়ান, আরো হ্যাঁ নিশ্চয় শুনেছি ওদের কথা। অবশ্য কারবার চালানোর সৌভাগ্য হয়নি কখনো। ভদ্রলোক চওড়া হাসি হাসলেন। আমেরিকার প্রতিটি আনাচে কানাচে আমার ব্যবসা ছাড়ানো আছে। কেমিক্যালস ছাড়া অন্য সব ব্যবসাতেই প্রায় নাক গলিয়েছি আমি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমাদের পরিবারের অনেকেই কেমিক্যালসের ব্যবসায় বিশ্ববিখ্যাত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মিঃ বন্ড ও লাইনটি আমাদের একেবারেই অপছন্দ।
বন্ড কোন মন্তব্য করল না কারণ বোঝাই যায় ভদ্রলোক নিজের পছন্দসই ব্যবসা নিয়েই যথেষ্ট সুখী। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে মিঃ ডুপন্টকে তাঁর বক্তব্য শেষ করার ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করল বন্ড। মিঃ ডুপন্টের প্রস্তাব খুব সাবধানে বিবেচনা করতে হবে কারণ ভদ্রলোককে দেখে শান্তশিষ্ট আমেরিকান টুরিস্ট মনে হলেও আড়ালে রীতিমত পোক্ত ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির এক মানুষ।
বন্ডের ইঙ্গিতটা মিঃ ডুপন্টের সতর্ক দৃষ্টি এড়াল না তাই নিজেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ওরে বাস! সাতটা বেজে গেল, আর আমি কিনা আপনাকে আসল কথা না বলে বকবক করে যাচ্ছি। শুনুন, মিঃ বন্ড, আমি আপতত এক জটিল সমস্যার সম্মুখীন এবং এর জন্য আপনার সাহায্যের প্রয়োজন। আজকের রাতটা যদি মিয়ামিতেই কাটান আর হাতে যদি আপনার সময় থাকে তাহলে একটা দিনের জন্য আমার অতিথি হয়ে থাকুন। কথা দিচ্ছি, সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কোনরকম ত্রুটি হবে না। আসলে এখানে গত বড়দিনের সময় আমি একটা হোটেল খুলেছি। জানেন নিশ্চয়ই? ব্যবসা ভালই চলছে, তো আপনি বলুন রাজি তো? হোটেলের সব থেকে সেরা কামরা আপনার জন্য, তাতে অন্য খদ্দের অখুশি হয় হোক। মিঃ ডুপন্ট মিনতি ভরা চোখে বলে উঠলেন কাজটা করে দিতে পারলে আমার অত্যন্ত উপকার হয়।
