বলল, গতরাত্রে আগুনে তোমার কারবারের ক্ষতি হল বলে দুঃখিত, আরো দুঃখের বিষয় এই যে, গুদামে সব মাল জমা ছিল, সেগুলো বোধহয় ইনসিওর করা নয়।
কে? কে কথা বলছেন?
-আমি ইংল্যান্ড থেকে আসছি। তোমার চালান দেওয়া হিরোইন আমার দেশের বেশ কয়েকজন তরুণ তরুণীর প্রাণ নিয়েছে, দৈহিক ও মানসিক ক্ষতি করেছে আরো অনেকের। তোমার বন্ধু স্যান্টোস আর কোনদিন কূটনৈতিক বার্তা নিয়ে ইংল্যান্ডে আসবে না। আজ রাতেই শোয়ার জেলে ঢুকবে। বন্ড নামে যে লোকটি তোমার সঙ্গে দেখা করেছিল সেও রেহাই পাবে না কারণ পুলিশ ইতিমধ্যেই তার পিছু নিয়েছে।
লাইনের ওপার থেকে ভয়ার্ত শব্দ ভেসে এল।
বন্ড আবার বলল, ঠিক আছে এবার ছেড়ে দেওয়া হল কিন্তু ভবিষ্যতে এ পথ আর মাড়িও না। সারের কারবার নিয়েই খুশি থাক। ফোন নামিয়ে রাখল বন্ড।
ব্ল্যাকওয়েল ধরতে না পারলেও মেক্সিকান বড়কর্তাটি বন্ডের ধাপ্পা ধরে ফেলেছিল। সাবধান হয়ে অন্য হোটেলে গিয়ে উঠলেও সেই রাত্রেই যখন হোটেলে ফিরছিল তখন রাস্তার পাশে দাঁড়ান নোংরা সুট পরা মাথায় বেঢপ টুপি, মুখে সিগারেট, টুথপিক। দেখলে বোঝা যায় গাঁজাখোর। এসে বন্ডের সামনে দাঁড়াল। এবং প্রথমেই তার কথা– মেয়ে মানুষ চাই নাকি?
-না।
–শ্যামলা রঙের দেশী মেয়ে। দারুণ জিনিস।
–দরকার নেই।
–তাহলে খারাপ ফটো নিন?
বলেই এমন ভান করল যেন ছবি বার করছে। কিন্তু বন্ড এই ভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত। তাই পর মুহূর্তের যখন লম্বা রূপালি ছোরাটা তার কণ্ঠনালীর কাছে, তখন বন্ড সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
চিরাচরিত নিয়মে ডান হাত আড়াআড়িভাবে ঘুরে গেল, সেই সঙ্গে শরীরও। দু জনের বাহু দু জনের শরীরের মাঝখানে ধাক্কা খেল। লোকটির ছোরা পড়ে গেল আর বন্ডের বাঁ হাতের আঘাতে তার চিবুক সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। বন্ড আবার ভয়ঙ্কর আঘাত হানল লোকটির চিবুকের নিচে। সেই ধাক্কায় সে মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে পড়ল, কিন্তু টলতে টলতে মাটিতে পড়বার আগেই অন্তিম আঘাত হানল কণ্ঠনালীর ওপর–এই সেই মারা যা কম্যান্ডোরা ব্রহ্মাস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। এর ফলে নিশ্চিত মৃত্যু যা মেক্সিকানটির কপালে জুটেছে।
বন্ড কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভূলুঠিত দেহটার দিকে তাকাল। রাস্তায় কেউ নেই, শুধু দু একটা গাড়ি বেরিয়ে গেল। তাদের লড়াই করতে কেউ দেখতে পায়নি ছায়ার ভিতরে থাকার জন্য। বন্ড লোকটির পাশে বসে তাকে নিরীক্ষণ করতে লাগল। নাড়ির স্পন্দন বন্ধ, ঝকঝকে চোখ ঝাপসা, আর আত্মা ইহলোক ছেড়ে পরলোকে।
বন্ড মৃতদেহটাকে ঘন ছায়ার ভিতরে একটা দেওয়ালের গায়ে বসিয়ে দিয়ে নিজে ঠিক হয়ে হোটেলের দিকে রওনা। হল।
পরদিন ভোর বেলায় উঠে বন্ড প্রথম প্লেনেই চড়ে মেক্সিকোর বাইরে চলে গেল। প্রথমে ক্যারাকাস সেখান থেকে মায়ামি এবং মায়ামি হয়ে নিউইয়র্ক।
ইতিমধ্যে লাউড স্পীকারে শোনা গেল যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য তাদের প্লেন ছাড়বে পরদিন সকাল আটটায়। তাই যাত্রীদের আজ রাত্রের মত হোটেলে থাকতে হবে।
বন্ড চিন্তায় পড়ে গেল। আজ রাতটা মায়ামিতে কাটাবে না অন্য প্লেন ধরবে। বরফ সহ বাকি পানীয়টুকু গলায় উজাড় করে ঠিক করল মায়ামিতেই থাকবে আর সুরা পান করবে। বেশ কয়েক বছর মাতাল হওয়া যায়নি। এই রাতটা উপরি পাওয়ার মত তার হাতে এসে পড়েছে, যেটাকে পুরোপুরি উপভোগ করতে হবে।
কিন্তু ঐ মেক্সিকান কাপুজোটা তাকে কেন মারতে এসেছিল, সারা পৃথিবী জুড়ে চিরকাল এই হত্যার খেলা চলছে, চলবে। একজন আরেকজনকে গাড়ি চাপা দিচ্ছে, অন্যের শরীরে মারাত্মক জীবাণু সংক্রামিত করছে। একটা হাইড্রোজেন বোমা তৈরির জন্য কতজন লোক দায়ী? যে মজুরটি খনির ভেতর থেকে ইউরোনিয়াম খুঁড়ে বার করছে, তার থেকে শুরু করে সেই খনির শেয়ার হোল্ডাররা পর্যন্ত প্রত্যেকের আংশিক দায়িত্ব আছে। পৃথিবীতে কি এমন কোন মানুষ আছে যার ওপর কখনও কোনও মৃত্যুর অন্তত আংশিক দায়িত্ব বর্তায়নি?
বন্ড ভাবল ঢের হয়েছে, এবার আজে বাজে চিন্তা রেখে কঠোর জীবন যাপনে ক্লান্ত শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন–যার জন্য দরকার সহজ, সুন্দর বিলাসবহুল উপভোগ্য জীবন।
কার যেন পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বন্ড মুখ তুলে চাইল। একজন পরিচ্ছন্ন সম্ভ্রান্ত চেহারার প্রৌঢ়। কিন্তু মুখের ভাব বিব্রত! বললেন, মাফ করবেন। আপনি নিশ্চয়ই মিঃ বন্ড, তাই না? মিঃ…ইয়ে…জেমস বন্ড?
.
জীবনের স্বাদ
নিজের পরিচয় জানাজানি হোক এটা কোন গুপ্তচরেরই কাম্য নয়। সুতরাং বন্ড, আজ্ঞে হ্যাঁ, বলল নিতান্ত দায়মারা ভাবে।
-আরে, কি আশ্চর্য যোগাযোগ! ভদ্রলোক করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে বন্ড হাতটায় চাপ দিয়েই ছেড়ে দিল। ভদ্রলোক বললেন, আমার নাম ডুপন্টু। আপনার হয়ত মনে নেই, কিন্তু তার আগেও আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে। বসতে পারি?
স্মৃতির পাতা ওলটাতে লাগল বন্ড হা…ভদ্রলোকের চেহারা, ভদ্রলোকের নাম কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছে।
মিঃ ডুপন্ট সামনের চেয়ারটায় বসে পকেট থেকে সিগারেট ও সোনার লাইটার বের করলেন, বন্ড তাকে লক্ষ্য করতে লাগল, ভদ্রলোকের চেহারা ও চরিত্রে কোন পার্থক্য নেই। তাদের ইতি পূর্বে দেখা হয়েছে কিন্তু কোথায় তা একেবারেই মনে পড়ছে না।
