কত পরিবর্তন ঘটে গেল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। এক জনৈক মেক্সিকান এখন তার নাম-ধাম-অস্তিত্ব ছেড়ে শুধু মাত্র এক বস্তু পিণ্ডতে পরিণত হল।
বন্ডের হাতে রয়েছে সেই মরণকারী অস্ত্রটি, ডান হাতের তালুটি যেখানে লাল হয়ে ফুলে গেছে, বন্ড সেই দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। মেক্সিকো থেকে সে পালিয়ে এসেছে প্লেনে করে, তবু ব্যথাটা কমেনি, ক্রমাগত মালিশ করে করে রক্ত চলাচল বন্ধ হতে দেয়নি বন্ড। তার হাত থেমে থাকলে তো চলবে না, কখন আবার এই অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে সেই কথা ভেবে বন্ড নিজের মনেই তিক্ত হাসি হেসে উঠল।
এয়ারপেন্ট থেকে ঘোষকের গলা ভেসে এল ন্যাশনাল এয়ার লাইন্সের আন্ডারে নিউইয়র্কের লা গার্ডিয়া এয়ারপোের্টগামী ফ্লাইট, NA 106-এবার ছেড়ে যাবে। যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে তারা যেন সাত নম্বর গেট থেকে প্লেনে উঠে পড়েন।
বন্ডের ঘড়িতে প্লেন ছাড়তে তখনও অন্তত দশ মিনিট দেরি। বন্ডের প্রিয় বুর্বোর অর্ডার দিলেন তিনি একজন ওয়েট্রেসকে ডেকে।
কাপুঙ্গোটিতে মেরে বন্ডের হাত যেন এক নোংরা কাজের থেকে নিস্তার পেল, এর জন্য অবশ্য বন্ড হেডকোয়ার্টার্সের চার দেওয়ালের বাইরে আসতে পেরেছিলেন কিছু দিনের জন্য।
বন্ড আবার স্মৃতিচারণ শুরু করলেন মেক্সিকানে জনৈক ব্যক্তির কয়েকটি পেপি ফুলের ক্ষেত ছিল, সেই ফুল ছিল আফিঙের সব চেয়ে বড় উৎস। ফুল থেকে বের করা আফিঙ মাদ্রে দ্য ক্যাকাত্ত নামক ছোেট রেস্তোরাঁর ওয়েটারদের মাধ্যমে তাড়াতাড়ি, বেশ সস্তায় খদ্দেরদের কাছে বিক্রি হয়ে যেত। এই রেস্তোরাঁয় আফিঙের কেনাবেচা চলত পানীয়ের সঙ্গে সঙ্গে। অবশ্য সরাসরি না হয়ে সংকেতেই সেটা বেশি হত।
ব্যবসা যখন এইভাবে চলছিল, তখন একদিন রাষ্ট্রসংঘ হিরোইন বিক্রি ও মাদক দ্রব্যের চোরাচালানের বিরুদ্ধে ইস্তাহার বার করল। ইংল্যান্ডের সর্বত্র একটা হৈ চৈ পড়ে গেল। শুধু মাদকসেবীরাই নয়, ডাক্তাররা পর্যন্ত তাদের চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটার আশংকায় বিচলিত হলেন। সুবিধে বুঝে চোরাপথে হিরোইন আসতে লাগল ইংল্যান্ডে, উৎস ছিল মূলতঃ চীন, তুরস্ক, ইটালী।
ব্ল্যাকওয়েল ছিলেন মেক্সিকো সিটির এক ব্যবসায়ী। এই অমায়িক ভদ্রলোকের বোন হিরোইনের নেশায় আক্রান্ত হলে তিনি তার দুর্ভাগ্যের বিষয় চিন্তিত হলেন। বোন তাঁকে জানাল হিরোইন না পেলে তার পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয়। ব্ল্যাকওয়েল তার কথায় বিশ্বাস করে মেক্সিকোর বেআইনি মাদকদ্রব্যের চোরা কারবার সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। যথা সময়ে বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি পৌঁছলেন মাদ্রে দ্য ক্যাকাওয়ে এবং সেখান থেকে পরি ক্ষেতের মালিক মেক্সিকান বড় কর্তাটির কাছে। ব্ল্যাকওয়েল চোরা ব্যবসার বিপুল পরিমাণ লাভের কথা। জানতে পেরে ঠিক কররেন নেশাখোরদের সাহায্য করবেন এবং সেই সঙ্গে নিজের পকেটটাও ভারি করবেন। মেক্সিকান বড় কর্তাটিকে ব্ল্যাকওয়েল বোঝালেন তার যেহেতু সারের কারবার, গুদাম এবং সয়েল টেস্টিং ও গবেষণার জন্য কিছু কর্মচারি আছে তাই ব্যবসার আড়ালে চোরা কারবার করতে কোন অসুবিধা হবে না। সেই মত মাল ইংল্যান্ডে পৌঁছনোর ব্যবস্থা হয়ে গেল। মেক্সিকান সরকারের কূটনৈতিক বার্তাবাহক যে মাসে একবার করে লন্ডনে যেত তার হাত দিয়ে বাড়তি একটা সুটকেস পাঠান হল। যার জন্য তার পারিশ্রমিক এক হাজার পাউন্ড প্রতিবার। কিন্তু শোয়ার নামে যে ব্যক্তিটির হাতে সুটকেস পৌঁছত তার আসল দাম কুড়ি হাজার পাউন্ড।
শোয়ার লোকটির চরিত্র ভাল ছিল না। সে জানত আমেরিকার বিপথে যাওয়া ছেলে মেয়েরা বছরে কোটি কোটি টাকার হিরোইন ওড়ায়, অতএব ইংল্যান্ডের ছেলে মেয়েদের পক্ষে এটা অসম্ভব কিছু নয়। শোয়ারের শাকরেরা হিরোইনের সঙ্গে স্টমাক পাউডার দ্বিগুণ করে মিশিয়ে বিভিন্ন আড্ডায় পাঠাতে শুরু করল।
গুপ্ত অপরাধী অনুসন্ধানকারী স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা দল গোস্ট স্কোয়াড বা প্রেত বাহিনী শেষ পর্যন্ত শোয়ারকে খুঁজে বার করল। কিন্তু তার আগেই শোয়ার হয়েছে প্রচুর অর্থের মালিক বহু তরুণ তরুণীর সর্বনাশ করে। তাকে গ্রেফতার করা হল না কারণ চোরাই হিরোইনের মূল উৎস সেই জানে। তাই শোয়ারের গতিবিধির ওপর নজর রাখতেই মেক্সিকান বার্তাবহটির সন্ধান পাওয়া গেল। কিন্তু দুঃখের বিষয় একটি বিদেশী রাষ্ট্র ব্যাপারটিকে সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে জড়িত। তাই গোয়েন্দার বদলে ডাক পড়ল ব্রিটিশ গুপ্তচরবাহিনীর। হিরোইনের উৎস সন্ধান ও চোরাই চালকের মূল ঘাঁটি ধ্বংস করবার ভার পড়ল জেমস বন্ড-এর উপর।
বন্ড প্লেনে করে পৌঁছল মেক্সিকো। সেখান থেকে মাদ্রে দ্য ক্যাকাও। তারপর হিরোইন কেনবার অজুহাতে দেখা করল মেক্সিকান বড় কর্তাটির সঙ্গে। তিনি বন্ডের সাথে আলাপ করে বললেন ব্ল্যাকওয়েলের কাছে যেতে। ব্ল্যাকওয়েলের জীবনের ইতিহাস না জেনেও বন্ড বুঝতে পারল সে পেশাদার নয়। তাছাড়া ইংল্যান্ডে হিরোইন নিষিদ্ধ করা সম্পর্কে তার ইচ্ছা আন্তরিক। একদিন গভীর রাতে ব্ল্যাকওয়েলের গুদামে আগুন বোমা থার্মিট রেখে এল।
মাইল খানেক দূরে কফি হাউজে বসে বিস্ফোরণের তীব্রতা, দমকলের ছোটাছুটি দেখতে লাগল। পরের দিন সকালে ফোনে রুমাল চাপা দিয়ে ব্ল্যাকওয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
