আমাকে বলা হয় ক্যাসিনোতে তোমার পেছনে না থাকার কথা। সে জন্যই লোকটা তোমাকে প্রায় খুন করে ফেলছিল। কারণ ম্যাথিস ও লিটারকে ব্যস্ত রাখাই ছিল আমার কর্তব্য। চুরি করি নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ সাজান।
আমি দেখলাম ওরা তোমার ওপর অকথ্য অত্যাচার করছে। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। ততদিনে আমি তোমাকে মন দিয়ে ফেলেছি। ওরা চেয়েছিল তোমার মুখ থেকে আরো তথ্য জানতে। আমি সরাসরি অস্বীকার করলাম। আমার হুকুমগুলো আসত প্যারিস থেকে। ওরা প্রথমে আমাকে ভয় দেখাল। পরে ছেড়ে দিল। তখন জানলাম পোল্যান্ডে আমার প্রেমিককে প্রাণ দিতে হল। ওদের কথায় কান দিলাম না। ওরা শেষবারের মত বলল ওদের কথামত না চললে ওর পেছনে স্মার্শকে সব সময় দেখতে পাব।
কালো তাপ্লিমারা লোকটা আমার চোখে পড়ে। ভাবলাম ওদের চোখে ধুলো দিয়ে ল্যহাত থেকে সাউথ আমেরিকা পালিয়ে যাব। ততদিনে আমার একটা সুন্দর বাচ্চা হবে। নতুন জীবন শুরু হবে আমাদের। ওদের চোখকে ফাঁকি দেবে কার সাধ্য। এখানেও হাজির। কবে এসে ও আমার প্রাণ নেবে সেজন্য বসে থাকা–আর তোমাকেও তো একই পথে ঠেলে দেওয়া। তার থেকে আত্মহত্যা অনেক সহজ ব্যাপার। আমি চললাম তোমার অনুমতি ছাড়াই কিন্তু সঙ্গে নিলাম তোমার ও আমার গোপন প্রেমের অমর স্মৃতি।
তোমার আমি কোন কাজেই আসতে পারলাম না। কেবল একটা বলতে পারি তা হল প্যারিসের ফোন নাম্বার আঁভলিদ ৫৫২০০। ৪৫০ চেয়ারিং ক্রস প্লেসের এক নিউজ এজেন্টের অফিস থেকে সব কিছু হত। তাই ওদের কাউকে আমি চিনতাম না। যাকে আমি একদিন ভালবেসেছিলাম তার জন্যই আমাকে এ পথে আসতে হল।
অনেক রাত হল। মাত্র দুটো দরজার ব্যবধান। কিন্তু আমাকে মনের জোর আনতে হবে। তুমি হয়ত আমার প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করবে, কিন্তু তোমার চোখের ঐ দৃষ্টি আমি মানতে পারব না। চিঠিটা এখানেই শেষ।
চিঠি পড়তে পড়তে যে কখন তার চোখে পানি এসে গিয়েছিল তা সে নিজেই জানে না। সার্ট আর ট্রাউজার পরে নিচে নেমে এল। লন্ডনে ডায়েল করতে করতে ভেসপারের চিঠির তথ্যগুলো সে এক এক করে সাজিয়ে নিচ্ছিল। গত চার সপ্তাহ ধরে কত অসঙ্গতি চোখে পড়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করেও তা উড়িয়ে দিয়েছিল।
ভেসপার তার কাছে এখন এক গুপ্তচর। ভালবাসা আর বেদনা মনের গোপন কুঠরীতে বন্ধ। দেশের ও সিক্রেট সার্ভিসের সে কতটা ক্ষতি করেছে সেটাই এখন বিচার্য!
হঠাৎ ম্যাথিসের কথা মনে পড়ল। ইউরোপে হাজার হাজার স্মার্শ রাজত্ব করছে। যাকে যাকে মনে হচ্ছে ওদের পদ্ধতির শত্রু, তাকেই ওরা নিষ্ঠুর ভাবে পথ থেকে সরিয়ে ফেলছে। এটার কি কোন যুক্তি আছে? বন্ড যে সব কথা বড় মুখ নিয়ে বলেছিল সেগুলোর অসারতা আজ তার সামনে প্রকাশ পেয়ে গেল। লজ্জায়, আফশোষে তার মাথা হেঁট হয়ে এল। এখনও সময় আছে। তার আক্রমণের প্রথম লক্ষ্য স্মাশ, সে যদি না থাকে এম ডবলিউ ডি চোখে অন্ধকার দেখবে। গুপ্তচর বৃত্তি করা। যদি সম্ভব না হয় যেখানেই থাক তোমাকে ঠিক খুঁজে নেব। তখন আর রক্ষে নেই। ওদের শাসনযন্ত্রের মূলেই আছে ভয়। মানুষ দিয়ে ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা। এরাই হল স্মার্শ। যে হাত সেই অস্ত্র চালাচ্ছে তাকে সরাসরি আক্রমণ করবে সে। বন্ড ধ্বংস করবে সেই শক্তিকে যা তাদের আজ গুপ্তচর হতে বাধ্য করেছে।
টেলিফোন বাজল। আমি জিরো জিরো সেভেন বলছি। অত্যন্ত জরুরী খবর। ৩০৩০ একজন ডাবল এজেন্ট ছিল। মেয়েটা আজ মারা গেছে। বন্ড লাইনটা কেটে দিল।
গোল্ড ফিংগার (পার্ট ১)
গোল্ড ফিংগার
প্রথম পর্ব
মদের পেয়ালা ও মদির স্মৃতি
জেমস্ বন্ড বর্তমানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর সমস্যা নিয়ে চিন্তা করছেন। ইতিমধ্যে পরপর বড় দু পেগ বুর্বে তিনি গলাধঃকরণ করেছেন। মায়ামি এয়ারপোর্টে বহির্যাত্রীদের লাউঞ্জে চিন্তান্বিত জেমস বন্ড অপেক্ষারত।
জেমস্ বন্ড আসলে ব্রিটিশ গুপ্তচর বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। অতএব নরহত্যা করার সাংকেতিক লাইসেন্সও তাঁর আছে, সেটি হল 007, বোঝা যায় সুদুর্লভ ডাবল জিরো প্রতীক ব্রিটিশ সংস্থার সঙ্গেই সংযুক্ত। কিন্তু নরহত্যা তার পেশার অঙ্গ হলেও মন থেকে তিনি কোনও দিনই একে মানতে পারেননি। প্রয়োজনের তাগিদে কাজ-মিটিয়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে ভুলে থাকতে চান বিষয়টিকে। এ নিয়ে অনুতাপ করা তাঁর সাজে না, তাই কর্তব্য হিসেবে মেনে নেওয়াই ভাল। না হলে বিবেকের তাড়না তার পেশার এবং অবশ্যই আত্মার কাছে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।
একটি কথা কিন্তু বন্ড কিছুতেই ভুলতে পারছেন না–সেই মেক্সিকান কাপুজোটির মৃত্যুর ঘটনা। যে মানুষটা মাত্র চল্লিশ পেপোস বা প্রায় তেইশ টাকার বিনিময়ে অপর যে কোন লোককে খুন করতে পারে, তাকে মারা যে ঠিক হয়নি। একথা তিনি মনে করেন না, তবু তার এই ঘটনার মধ্যে যেন কিছু একটা বৈশিষ্ট্য ছিল। লোকটার চেহারাই তার চরিত্রকে প্রকাশ করে সারা জীবন সে যত মানুষের ক্ষতি করেছে, তাতে তার মৃত্যু দণ্ড অনেকদিন আগেই পাওয়া উচিৎ ছিল। যে বন্ডকে হত্যা করতে সে তার প্রথারহিত আরো কিছু বেশি টাকা নিয়েছিল, সেই বন্ডই তাকে চব্বিশ ঘণ্টা আগে শেষ করেছে। এত পাপী লোকটার প্রাণটাও যখন বেরিয়ে গেল তখন যেন খুব স্বাভাবিক মনে হল। চির প্রচলিত হাইতি দ্বীপের আদিবাসীদের মুখে শোনা প্রবাদকে সে অতিক্রম করতে পারল না। পাপী লোকটার প্রাণপাখি কত। সহজে তার ভোলা মুখ দিয়ে উড়ে গিয়ে শান্তি দিয়ে গেল।
